ঢাকার কাকরাইল-শান্তিনগর এলাকার কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স একসময় ছিল পরিচিত কেনাকাটার কেন্দ্র। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানে একসময় ১৯৮টি দোকান ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা কমতে কমতে বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে চালু ছিল মাত্র ২৫টি দোকান। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর বন্ধ হয়ে যায় বিপণিবিতানটি। মালিকেরা এখন ভবনটির ব্যবহার পরিবর্তন অথবা বিক্রির কথা ভাবছেন।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পতন ঢাকার পুরোনো শপিং কমপ্লেক্সগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা। রাজধানীর অন্তত আরও ১০টি পুরোনো শপিং কমপ্লেক্স একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। অনেক ব্যবসায়ী টানা তিন থেকে পাঁচ দিনেও কোনো বিক্রি করতে পারছেন না। আয় দিয়ে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও মূলধন ভেঙে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।
এটি শুধু কয়েকটি বিপণিবিতানের দুরবস্থার গল্প নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের ভোগব্যয়, মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিল্পোৎপাদন এবং খুচরা ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত রয়েছে। ক্রেতা কমে যাওয়ার পেছনে একদিকে রয়েছে মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে যাওয়া, অন্যদিকে রয়েছে কেনাকাটার অভ্যাসের পরিবর্তন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের চাপ।
মধ্যবিত্তের আয় আছে, কিন্তু কেনাকাটার সামর্থ্য কমছে
শপিং মলের ব্যবসা বোঝার জন্য শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখলে হবে না। দেখতে হবে মানুষের আয় কতটা বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং সব খরচের পর পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গৃহসজ্জা কিংবা বিনোদনের জন্য কত অর্থ অবশিষ্ট থাকছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছর আগের তুলনায় পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে একই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে মূল্যস্ফীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। চাল, ডাল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও বিদ্যুতের খরচ বাড়লে পরিবারগুলো সাধারণত প্রথমে ঐচ্ছিক ব্যয় কমায়। নতুন পোশাক কেনা পিছিয়ে দেয়, জুতা বদলানোর সময় বাড়ায়, প্রসাধনী বা ঘর সাজানোর পণ্য কম কেনে। উৎসবের কেনাকাটায়ও বাজেট সীমিত করে। এসব পণ্যের বড় অংশের ক্রেতা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার।
অর্থাৎ, শপিং মলে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ার পেছনে শুধু কেনাকাটার ইচ্ছা কমে যাওয়া নয়, কেনাকাটা করার আর্থিক সামর্থ্য কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যবিত্তের আর্থিক দুর্বলতা কতটা গভীর?
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার বা পিপিআরসির ২০২৫ সালের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় মধ্যবিত্তের একটি আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অংশের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ এমন এক অবস্থায় রয়েছেন, যেখানে তাঁরা দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও সামান্য আয়হানি বা ব্যয়বৃদ্ধিতে আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন।
পিপিআরসির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। অর্থাৎ, মাস শেষে গড়ে অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৭০ টাকা।
এই হিসাবের তাৎপর্য হলো, মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের হাতে বাড়তি কেনাকাটার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। মাসিক আয় দিয়ে নিয়মিত খরচ মেটানোর পর সঞ্চয় বা অতিরিক্ত ভোগব্যয়ের সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়ছে।
তবে এই গবেষণার ফল ঢাকার প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। এটি জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের আর্থিক ঝুঁকির একটি চিত্র। কিন্তু কেনাকাটার বাজারে এর প্রভাব বোঝার জন্য তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান যখন প্রায় শূন্য, তখন সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও পোশাক, জুতা বা প্রসাধনীর মতো পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমলে শপিং মলের ব্যবসায় কী প্রভাব পড়ে?
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনীতি-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে চলতি ২০২৫-২৬ এবং পরবর্তী ২০২৬-২৭ অর্থবছর—দুই বছরেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, বিনিয়োগের দুর্বলতা, রপ্তানির গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি খাতের সমস্যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমা মানেই দেশের মোট উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলে অর্থনীতি বাড়ছে, তবে আগের তুলনায় ধীরগতিতে। কিন্তু এই ধীরগতি যদি বিনিয়োগ, নতুন চাকরি, প্রকৃত আয় এবং ভোগব্যয়ের দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে খুচরা ব্যবসায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
শপিং মলের ক্ষেত্রে প্রভাবটি কয়েকটি ধাপে কাজ করে।
প্রথমত, ব্যবসায় বিনিয়োগ কম হলে নতুন কর্মসংস্থান ও আয় তৈরির গতি দুর্বল হয়। দ্বিতীয়ত, মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে ঐচ্ছিক ব্যয় সংকুচিত হয়। তৃতীয়ত, বিক্রি কমে গেলে দোকানিরা নতুন পণ্য কেনা, কর্মচারী নিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ কমিয়ে দেন। চতুর্থত, ব্যবসায়িক আয় কমে গেলে দোকানভাড়া ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রক্রিয়ায় অর্থনীতির দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত বিপণিবিতানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়।
তবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার থেকে সরাসরি হিসাব করে বলা যাবে না যে ঢাকার শপিং মলের বিক্রি ঠিক কত শতাংশ কমেছে। এর জন্য খুচরা বিক্রির ধারাবাহিক তথ্য, পরিবারের ভোগব্যয়, দোকানভিত্তিক বিক্রি এবং মলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রয়োজন। বর্তমানে পাওয়া তথ্য অর্থনৈতিক চাপের দিকটি দেখায়; কিন্তু শুধু জিডিপির হার দিয়ে শপিং মলের বিক্রির পতনের নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চাকরি হারানোর চাপ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ঘিরে সমস্যা, কারখানা বন্ধ, শ্রমিক অসন্তোষ, অর্থায়নের সংকট এবং রপ্তানি আদেশের ঘাটতি কর্মসংস্থানে চাপ সৃষ্টি করে। তবে সব চাকরি হারানোর ঘটনাকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একক ফল হিসেবে দেখলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।
কতজন চাকরি হারিয়েছেন?
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জাতীয় পোশাকশ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রায় ৭০টি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনায় প্রায় এক লাখ শ্রমিক ও কর্মকর্তা কাজ হারিয়েছেন। একই সময়ের একটি শ্রমবিষয়ক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ২৫টি শিল্প ও উৎপাদন খাতে ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, মজুরি বৃদ্ধি ও বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন মিলিয়ে ৫০১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল।
২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১১৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ৯৬ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। একই সময়ে ১২৮টি নতুন কারখানা চালু হয়ে ৭৪ হাজার ৮১ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ, এই হিসাব অনুযায়ী নতুন কারখানায় তৈরি হওয়া চাকরির চেয়ে বন্ধ কারখানায় হারানো চাকরি ২২ হাজারেরও বেশি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে একটি অভ্যন্তরীণ সরকারি জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আনুমানিক এক লাখ শ্রমিকের ওপর। একই সময়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রায় ৯৩৭টি নতুন কারখানা চালুর তথ্যও উঠে আসে।
এখানে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। এই তিনটি হিসাবের সময়সীমা ও তথ্যের ভিত্তি এক নয়। কোনোটি শ্রমিকনেতার বক্তব্য, কোনোটি পোশাকশিল্পের সংগঠনের তথ্য, আবার কোনোটি সরকারি জরিপের প্রতিবেদন। এগুলো যোগ করে মোট চাকরি হারানোর সংখ্যা বের করা যাবে না। তাতে একই ঘটনা একাধিকবার গণনা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একইভাবে, কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে কাজ হারানো সবাই স্থায়ীভাবে বেকার হয়ে গেছেন, এমন সিদ্ধান্তও এসব তথ্য থেকে নেওয়া যায় না।
তবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট: রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে শিল্প খাতের একটি অংশে কর্মসংস্থানের বড় ধাক্কা লেগেছে। নতুন কারখানা চালু হলেও সব ক্ষেত্রে হারানো চাকরির ক্ষতিপূরণ হয়নি।
চাকরি হারানোর সঙ্গে শপিং মলের সম্পর্ক
একজন পোশাকশ্রমিক বা কারখানার কর্মচারী চাকরি হারালে তাঁর পরিবারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে যায়। নিয়মিত আয় বন্ধ হলে প্রথমে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ঋণের কিস্তির মতো অপরিহার্য ব্যয় সামলাতে হয়। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী কিংবা পরিবারের জন্য বাড়তি কেনাকাটা তখন পিছিয়ে যায়।
একই প্রভাব পড়তে পারে ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, দোকানের বিক্রয়কর্মী, গুদামকর্মী ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষের ওপর। আয় কমে গেলে তাঁদের কেনাকাটাও কমে যায়। ফলে শপিং মলের ক্রেতা কমার সঙ্গে শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের সম্পর্ক তৈরি হয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে: বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের কতজন ঢাকায় বসবাস করেন, তাঁদের পরিবারের কতজন কোন ধরনের দোকানে কেনাকাটা করেন এবং চাকরি হারানোর কারণে খুচরা বিক্রি কতটা কমেছে—এসবের সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই এক লাখ চাকরি হারানোর তথ্যকে শপিং মলের বিক্রি কমার সরাসরি পরিমাপ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়
শিল্পকারখানা বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নন। কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন ঠিকাদার, খাবারের দোকান, ছোট পাইকার, প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান, গুদাম ও বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা হারাতে পারেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আয় কমলে স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতাও দুর্বল হয়।
২০২৬ সালের ২২ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শিল্প পুলিশ, পোশাকশিল্পের বিভিন্ন সংগঠন ও অন্যান্য সূত্রের তথ্য মিলিয়ে বলা হয়, দুই বছরে দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক খাতের ১০৮টি, নিটওয়্যার খাতের ৩৫টি, বস্ত্র খাতের আটটি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ১৯টি প্রতিষ্ঠান ছিল। বাকি ২৮৭টি ছিল পোশাকবহির্ভূত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, ঋণের চাপ এবং শ্রমিক অসন্তোষকে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, শিল্প খাতের সংকট একাধিক কারণে তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এর একটি অংশ হলেও জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার শপিং মলের জন্য এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য ক্রেতার একটি অংশের আয় ও চাকরির নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বেড়ে গেলে দোকানিরাও চাপে পড়েন। ক্রেতা কমে যাওয়া এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এই দ্বিমুখী চাপ ছোট ও মাঝারি বিপণিবিতানকে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
অনলাইন কেনাকাটা: পুরোনো শপিং মলের জন্য নতুন প্রতিযোগিতা
ঢাকার শপিং মলের সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো মানুষের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে যাওয়া। আগে পোশাক, জুতা, ঘড়ি, প্রসাধনী বা উপহার কিনতে সরাসরি দোকানে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিপণিব্যবস্থা এবং ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা ক্রেতাদের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪-২৫ সালের পরিবার ও ব্যক্তির তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারবিষয়ক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা কিনেছেন। ঢাকা বিভাগে এই হার ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। অনলাইনে কেনা পণ্যের মধ্যে পোশাক, জুতা ও ক্রীড়াসামগ্রী সবচেয়ে এগিয়ে। এই শ্রেণির পণ্য কেনার কথা জানিয়েছেন অনলাইন ক্রেতাদের ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। খাদ্য ও মুদিপণ্য কেনার হার ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং প্রসাধনী কেনার হার ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শপিং মলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি কেনা পণ্যের তালিকায় এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলো ঐতিহ্যগতভাবে পোশাক ও প্রসাধনীর দোকানসমৃদ্ধ বিপণিবিতানের প্রধান বিক্রয়পণ্য।
অনলাইনে কেনাকাটা কেন বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে?
প্রথমত, ক্রেতা ঘরে বসেই একাধিক বিক্রেতার দাম তুলনা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, যাতায়াত, যানজট ও পার্কিংয়ের ঝামেলা এড়ানো যায়। তৃতীয়ত, অনেক অনলাইন বিক্রেতার দোকানভাড়া ও প্রদর্শনীর খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় তাঁরা কিছু পণ্য কম দামে বিক্রি করতে পারেন। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছোট ব্যবসায়ীরাও বড় দোকান ছাড়াই ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন।
তবে অনলাইন কেনাকাটার প্রসারকে সরাসরি শপিং মল বন্ধ হওয়ার কারণ বলা যাবে না। জরিপের ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ হলো অনলাইনে কেনাকাটা করেছেন এমন মানুষের অনুপাত; এটি মোট খুচরা বিক্রির মধ্যে অনলাইন বিক্রির অংশ নয়। ফলে এই তথ্য দিয়ে অনলাইন ব্যবসার কারণে শপিং মলের বিক্রি ঠিক কতটা কমেছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
অনলাইনে কেনাকাটা বাড়লেও সরাসরি দোকানে পণ্য দেখে কেনার চাহিদা রয়েছে। একই জরিপে অনলাইনে কেনাকাটা না করা ব্যক্তিদের ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা পণ্য সরাসরি দেখে বা ছুঁয়ে কিনতে পছন্দ করেন।
অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা শুধু অনলাইন বনাম দোকানের নয়। যে বিপণিবিতান ক্রেতাকে নির্ভরযোগ্য পণ্য, সঠিক দাম, ভালো পরিবেশ এবং সুবিধাজনক কেনাকাটার অভিজ্ঞতা দিতে পারবে, তার টিকে থাকার সুযোগ বেশি থাকবে।
শুধু অর্থনৈতিক মন্দা নয়, পুরোনো শপিং মলের নিজস্ব সমস্যাও রয়েছে
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখায়, সব বিপণিবিতানের সংকটের ব্যাখ্যা শুধু জাতীয় অর্থনীতি দিয়ে দেওয়া যায় না। একটি মল দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা হারাতে পারে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, অবস্থান, পরিবেশ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের দুর্বলতার কারণেও।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পতন এক দিনে হয়নি। প্রায় এক দশক ধরে ক্রেতা কমার পেছনে শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণকালে যোগাযোগের অসুবিধা, ব্যবসায়ীদের অন্য বাজারে চলে যাওয়া, করোনাকালে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিক্রেতার বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্যকে বিদেশি পণ্য হিসেবে বিক্রির অভিযোগ ভূমিকা রেখেছে। বড় শপিং মল ও অনলাইন ব্যবসার প্রতিযোগিতাও এর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
এখানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেতার আস্থা হারানো: ক্রেতা যদি পণ্যের মান, উৎস বা দাম নিয়ে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা করেন, তাহলে তিনি অন্য দোকান বা বাজারে চলে যেতে পারেন। একবার ক্রেতা অন্যত্র অভ্যস্ত হয়ে গেলে আগের বাজারে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
যাতায়াতের সমস্যা: দোকান ভালো হলেও সেখানে পৌঁছাতে অসুবিধা হলে ক্রেতা বিকল্প বাজার বেছে নিতে পারেন। ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ক্রেতা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার উদাহরণ।
দোকানের বৈচিত্র্যের অভাব: একই বাজারে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সমাহার না থাকলে ক্রেতাকে একাধিক জায়গায় যেতে হয়। বড় বিপণিবিতানগুলো এ ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়।
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: বিপণিবিতানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, আলো, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, পার্কিং এবং দোকানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ক্রেতার অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলে। এসব সুবিধা বজায় রাখতে অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু দোকান বন্ধ হয়ে গেলে সেই অর্থের জোগানও কমে যায়।
অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সংকট দুর্বল বাজারকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে, কিন্তু প্রতিটি বিপণিবিতানের পতনের পেছনে তার নিজস্ব ইতিহাসও থাকে।
দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীর বেতন: আয় কমলেও ব্যয় কমে না
একটি শপিং মলের ব্যবসায়িক মডেলের মূল সমস্যা হলো, ক্রেতা ও বিক্রি কমলেও অনেক পরিচালন ব্যয় একই থাকে। দোকানির বিক্রি কমতে পারে, কিন্তু ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, সার্ভিস চার্জ এবং বিদ্যুতের বিল পুরোপুরি কমে না। ফলে লাভের জায়গা সংকুচিত হতে হতে একসময় লোকসান শুরু হয়।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির আর্থিক পরিস্থিতি এ সমস্যার একটি বাস্তব উদাহরণ। কমপ্লেক্সটির মাসিক পরিচালন ব্যয়—বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতনসহ—১৫ লাখ টাকার বেশি ছিল। কিন্তু সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে সর্বোচ্চ আয় হতো প্রায় ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
এখানে একটি সাধারণ হিসাব থেকেই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির মাসিক হিসাব
- মাসিক পরিচালন ব্যয়: ১৫ লাখ টাকার বেশি।
- সার্ভিস চার্জ থেকে আয়: ১–১ দশমিক ৫ লাখ টাকা।
- আনুমানিক মাসিক ঘাটতি: ১৩ দশমিক ৫–১৪ লাখ টাকা বা তার বেশি।
মালিকপক্ষের প্রকাশিত হিসাবের ভিত্তিতে এই পার্থক্য নির্ণয় করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ আর্থিক বিবরণী নয়; অন্য আয়, বকেয়া ও এককালীন ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।
এই ঘাটতি দীর্ঘদিন চললে মালিকদের অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, ঋণ নিতে হয় অথবা ভবনটির ব্যবহার পরিবর্তনের কথা ভাবতে হয়। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত মালিকেরা কমপ্লেক্সটি বন্ধ করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়: দোকানের বিক্রি কমে গেলে দোকানিরা সার্ভিস চার্জ দিতে সমস্যায় পড়েন। সার্ভিস চার্জ না পেলে মল কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তা ও কর্মচারীদের বেতন মেটাতে পারে না। ফলে পরিষেবার মান খারাপ হয়, আরও ক্রেতা চলে যান এবং দোকান বন্ধের প্রবণতা বাড়ে। এভাবে একটি বিপণিবিতান ক্রমশ লোকসানের চক্রে আটকে যেতে পারে।
সন্ধ্যার কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ায় নতুন চাপ
২০২৬ সালের আগস্টে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দোকান ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে এমন ব্যবসায়ীরা নতুন চাপে পড়েন, যাঁদের ক্রেতারা সাধারণত অফিস শেষে সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে আসেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির কারণে আগে থেকেই দুর্বল বিক্রির ওপর দোকান বন্ধের সময় এগিয়ে আনার প্রভাব পড়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ওই সময় বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এটি সব দোকানের বিক্রি একই হারে কমেছে—এমন জাতীয় পরিসংখ্যান নয়; এটি ব্যবসায়ীদের দেওয়া নির্দিষ্ট খাতের অনুমান। তবু এর তাৎপর্য রয়েছে।
মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা সাধারণত দিনের কাজ শেষে কেনাকাটা করেন। দোকান আগে বন্ধ হলে তাঁদের কেনাকাটার সময় কমে যায়। একই সঙ্গে দোকানিরা কম সময় ব্যবসা করেও ভাড়া, বেতন ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করেন।
তবে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে শুধু ২০২৬ সালের এই নির্দেশকে দায়ী করা যাবে না। কমপ্লেক্সটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বহু বছর ধরে ক্রেতা কমে আসছিল। বরং দোকান বন্ধের সময় কমানোকে দুর্বল খুচরা বাজারের ওপর নতুন একটি চাপ হিসেবে দেখা উচিত।
ঢাকার কোন বিপণিবিতানগুলো ঝুঁকিতে?
রাজধানীর অন্তত আরও ১০টি পুরোনো শপিং কমপ্লেক্স ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিপণিবিতানে ক্রেতা ও বিক্রি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
কনকর্ড টুইন টাওয়ার, শান্তিনগর: বিক্রি কমেছে, তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আপাতত বন্ধের সিদ্ধান্ত নেই।
মোল্লা টাওয়ার, রামপুরা: ব্যবসায়িক চাপের মুখে থাকা বিপণিবিতানগুলোর একটি হিসেবে দোকান মালিক সমিতি নাম উল্লেখ করেছে।
বিশাল সেন্টার, মগবাজার: ক্রেতা ও বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকা বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এগুলোকে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া মল হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। এগুলো ব্যবসায়িক ঝুঁকির মুখে রয়েছে; তবে সবগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সব শপিং মল কি একইভাবে সংকটে পড়ছে? উত্তর হলো, না। বড়, জনপ্রিয় এবং বহুমুখী বিপণিবিতান ক্রেতাকে বেশি পণ্য, বিনোদন, খাবার ও অন্যান্য সুবিধা দিতে পারে। অন্যদিকে, পুরোনো বা ছোট বিপণিবিতান যদি ক্রেতার আস্থা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং সহজ যাতায়াতের সুবিধা হারায়, তাহলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
ঢাকার পুরোনো শপিং মলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে শুধু ক্রেতার আয় বাড়ার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। জাতীয় অর্থনীতির উন্নতি প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিটি বিপণিবিতানকে নিজস্ব ব্যবসায়িক দুর্বলতাও কাটিয়ে উঠতে হবে।
প্রথমত, দোকান মালিক ও মল কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে পরিচালন ব্যয় পর্যালোচনা করতে হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়, নিরাপত্তা ও পরিষেবা বজায় রেখে ব্যয় কমানোর সুযোগ খুঁজতে হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দোকানের কারণে সার্ভিস চার্জ আদায় কমে গেলে বিকল্প আয় তৈরির পথও বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ক্রেতার আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। পণ্যের মান, উৎস, মূল্য এবং বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। নিম্নমানের পণ্যকে বিদেশি বা ব্র্যান্ডের পণ্য বলে বিক্রি করার অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, দোকানগুলোকে অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সমন্বয়ের পথও খুঁজতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের প্রদর্শনী, অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ, দোকান থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা পুরোনো দোকানগুলোর জন্য নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগ হতে পারে।
চতুর্থত, বিপণিবিতানের অবস্থান ও ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। শুধু পোশাক বিক্রির ওপর নির্ভর না করে খাবার, প্রয়োজনীয় পণ্য, সেবা কিংবা স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক ব্যবসার সমন্বয় তৈরি করা যেতে পারে—যদি সেই এলাকার বাজার বিশ্লেষণ তা সমর্থন করে।
পঞ্চমত, নীতিনির্ধারকদের শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা দুর্বল থাকলে খুচরা ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
শপিং মলের সংকট আসলে ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক কাঠামোর সংকট
ঢাকার শপিং মল বন্ধ হওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই। মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা, শিল্প খাতে চাকরি হারানোর চাপ, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অনলাইন কেনাকাটার প্রতিযোগিতা, পরিচালন ব্যয়ের ভার এবং পুরোনো বিপণিবিতানের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির অভিজ্ঞতা দেখায়, একসময় পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি বাজারও দীর্ঘদিন ক্রেতা হারাতে হারাতে আর্থিকভাবে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থান ও আয় দুর্বল হলে নতুন ক্রেতা তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বিপণিবিতানের সংকট এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতার সংকট একে অপরকে আরও গভীর করতে পারে।
তবে বর্তমান তথ্য থেকে বলা যাবে না যে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণেই ঢাকার শপিং মলগুলো বন্ধ হচ্ছে, অথবা অনলাইন কেনাকাটাই তাদের পতনের প্রধান কারণ। এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য আরও নির্দিষ্ট বিক্রয়, আয়, কর্মসংস্থান ও ভোগব্যয়ের তথ্য প্রয়োজন।
যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—শুধু নতুন বিপণিবিতান নির্মাণ করে খুচরা বাজারের উন্নতি নিশ্চিত করা যাবে না। মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য আয় থাকতে হবে, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে এবং পুরোনো বাজারগুলোকে ক্রেতার পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। তা না হলে, আজ যে বাজারে ক্রেতার আনাগোনা কমছে, আগামী দিনে তার জায়গায় অন্য কোনো ব্যবসা বা স্থাপনা গড়ে উঠতে পারে।












