চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সম্প্রসারণের পর এবার তাদের নজর এশিয়ার দুই উন্নত গাড়ির বাজার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে। তবে দুই দেশের ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া এক নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় আগ্রহ বাড়লেও জাপানে এখনো আস্থা তৈরি করতে পারেনি চীনা নির্মাতারা।
দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত কয়েক বছর আগেও অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতো। দেশটিতে দীর্ঘদিন চীনের গাড়িকে নিম্নমানের বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সাশ্রয়ী দাম, আধুনিক প্রযুক্তি ও সহজলভ্যতার কারণে সেই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
সিউলের বাসিন্দা ৪৮ বছর বয়সী কিম মিন-সনের অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ। গত জুলাইয়ে তিনি বিওয়াইডির ডলফিন মডেলের একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনেন। দাম ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ ডলার। কম দামে ভালো সুবিধা এবং দ্রুত গাড়ি হাতে পাওয়ার বিষয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করে।
প্রথমে তাঁর পছন্দ ছিল হুন্দাইয়ের ক্যাসপার ইভি। কিন্তু সেটি পেতে দুই বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হবে বলে তাঁকে জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বিওয়াইডি কেনেন। তাঁর সিদ্ধান্তে পরিচিত অনেকে বিস্মিত হন। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, চীনের গাড়ি কিনে তিনি নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছেন কি না।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বিওয়াইডির অগ্রগতি এখন বেশ দৃশ্যমান। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যারিসিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি দেশটিতে ২০ হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে। একই সময়ে টয়োটা ও তার বিলাসবহুল ব্র্যান্ড লেক্সাসের সম্মিলিত বিক্রিকেও ছাড়িয়ে গেছে বিওয়াইডি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় কেন বাড়ছে চীনা গাড়ির চাহিদা
বিশ্লেষকদের মতে, সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বাড়ার সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে চীনা নির্মাতারা। দেশটিতে চলতি বছর বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির প্রায় এক-চতুর্থাংশই বৈদ্যুতিক। জাপানে এই হার মাত্র ৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দক্ষিণ কোরিয়ায় পেট্রোলের দামও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে জ্বালানি খরচ কমানোর বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
হুন্দাই ও কিয়া তুলনামূলক বেশি দামের বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ৩০ হাজার ডলারের নিচে তাদের গাড়ির সংখ্যা সীমিত। এতে কম দামের গাড়ি খুঁজছেন এমন ক্রেতাদের জন্য বিওয়াইডির মতো চীনা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউজিন ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লি জে-ইলের মতে, বাজারের এই পরিস্থিতি বিওয়াইডির জন্য বিশেষভাবে অনুকূল।
অন্য চীনা নির্মাতারাও দক্ষিণ কোরিয়ায় জায়গা করার চেষ্টা করছে। জিলির অধীন জিকর জুন মাসে ৭এক্স এসইউভির অর্ডার নেওয়া শুরু করেছে। বছরের শেষ নাগাদ সর্বোচ্চ ১৪টি প্রদর্শনকেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। চেরি ২০২৭ সালে দেশটির বাজারে ঢুকতে পারে। এক্সপেং গত বছর স্থানীয় কার্যক্রম শুরু করেছে এবং এখন বিক্রয়কেন্দ্র গড়তে জনবল নিয়োগের চেষ্টা করছে।
এই অগ্রযাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব গাড়িশিল্পও। কোরিয়া অটোমোবাইল অ্যান্ড মোবিলিটি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জং দে-জিন দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য কর ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দেশটির নির্মাতারা এখন বেশ চাপে আছে।
জাপানে কেন কঠিন হচ্ছে চীনা গাড়ির বাজার
জাপানে চীনা নির্মাতাদের পরিস্থিতি অনেক কঠিন। দেশটির গাড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ। জাপানি ক্রেতাদের বড় অংশ এখনো হাইব্রিড গাড়ির প্রতি আগ্রহী। এই প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছে টয়োটা। চীন ও জাপানের রাজনৈতিক টানাপোড়েনও একটি চ্যালেঞ্জ। ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে গত বছর থেকে বেইজিংয়ের প্রতি টোকিওর অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের চলতি বছরের জরিপে দেখা গেছে, জাপানের ৮৮ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ৭১ শতাংশ মানুষের চীনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তবে বিওয়াইডি অটো জাপানের এক মুখপাত্রের দাবি, কূটনৈতিক টানাপোড়েনে তাদের বিক্রি, প্রদর্শনকেন্দ্রে ক্রেতাদের উপস্থিতি বা অনুসন্ধানে বিশেষ প্রভাব পড়েনি।
২০২৩ সালে জাপানে গাড়ি বিক্রি শুরু করে বিওয়াইডি। এখন দেশটিতে তাদের ৭৫টির বেশি বিক্রয়কেন্দ্র আছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ১০০-তে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিক্রির পরিসংখ্যান এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে জাপানে চার হাজারেরও কম গাড়ি বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশটির মোট বাজারে তাদের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।
জাপানের ছোট গাড়ির বাজারেও ঢোকার চেষ্টা করছে বিওয়াইডি। স্থানীয়ভাবে ‘কেই’ নামে পরিচিত এই বাজার দীর্ঘদিন দেশীয় নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণে। গত জুলাইয়ে এই শ্রেণির একটি বক্স আকৃতির বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬৫০টির মতো। যদিও জাপানে তাদের সামগ্রিক বিক্রি প্রতিবছরই বাড়ছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আলভারেজ অ্যান্ড মার্সালের মার্ক ইয়ামাদার মতে, বর্তমান বাজার অংশের চেয়ে প্রতিবছর বিক্রি বাড়ানোর সক্ষমতাই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
চেরির সমর্থনপুষ্ট নতুন প্রতিষ্ঠান ইএমটিও ছোট গাড়ির বাজারে ঢুকতে চায়। প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কোজি ইয়ামামোতো জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে একটি কেই গাড়ি আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি মডেল আসবে। ২০৩০-এর দশকে জাপানেই গাড়ি উৎপাদন শুরু করতে চায় তারা। অন্যদিকে জিকর একটি বিলাসবহুল ভ্যান আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুরুতে ট্যাক্সি ও চালকসহ গাড়ি ভাড়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও মান নিয়ে সংশয়
জাপানে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণের অন্যতম বাধা ক্রেতাদের আস্থার সংকট। পুরোনো বৈদ্যুতিক গাড়িচালক ফুমিও কুয়াবারা ২০১০ সাল থেকে জাপানি বৈদ্যুতিক গাড়ি চালাচ্ছেন। আপাতত চীনের গাড়ি কেনার পরিকল্পনা নেই তাঁর। তাঁর আশঙ্কা, গাড়ির এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে মানের ঘাটতি থাকতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও তাঁর সংশয় আছে।
চীনা গাড়ির সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকিও জাপানে আলোচনায় এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা দাইশিরো ইয়ামাগিওয়া বলেছেন, বাইরে থেকে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাসহ নিরাপত্তাঝুঁকিগুলো জাপানের বিবেচনা করা দরকার।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, সরাসরি দেখে ও চালিয়ে অনেক ক্রেতার পুরোনো ধারণা বদলে যেতে পারে। সিউলের গাড়িচালক ও কনটেন্ট নির্মাতা লি সিয়ং-ডং আগে চীনা গাড়ি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতেন না। বিওয়াইডির ডলফিন চালানোর পর তাঁর মনোভাব বদলে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সাশ্রয়ী দাম, সহজলভ্যতা ও বাড়তি চাহিদা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের এগিয়ে দিচ্ছে। জাপানে শক্তিশালী স্থানীয় শিল্প, হাইব্রিডের জনপ্রিয়তা, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চীনের প্রতি সংশয় তাদের পথ কঠিন করেছে। তবুও তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। জাপানের ক্রেতাদের অনাস্থা কাটাতে পারলে ভবিষ্যতে সেখানেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।












