এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ে নতুন করে হিসাব কষছেন বিনিয়োগকারীরা। এত দিন এআই অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র ও ক্লাউড সেবায় বিপুল ব্যয়কে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এখন শুধু কত টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে, তা নয়। সেই বিনিয়োগ থেকে কত আয় আসছে এবং নিজের ব্যবসা থেকে পরবর্তী বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করা যাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন ও ওরাকলের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ায় এই পরিবর্তন স্পষ্ট। যারা এআই খাতে বিনিয়োগ করেও নগদ অর্থের প্রবাহ ধরে রাখতে পারছে, তাদের প্রতি আস্থা বাড়ছে। বিপুল ব্যয়ে যাদের নগদ অর্থে চাপ পড়ছে, তারা শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখে।
বৃহস্পতিবার অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশের বেশি কমে যায়। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য এক দিনে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার কমেছে, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে এক দিনের সবচেয়ে বড় পতন। তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনের পর নিয়মিত লেনদেনের বাইরে অ্যামাজনের শেয়ারও ৬ শতাংশের বেশি কমে। মাইক্রোসফটের শেয়ার দিনশেষে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল শক্তিশালী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজার থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার তোলার পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে। নয় বছরেরও বেশি সময় পর বিনিয়োগযোগ্য মানের বন্ড বাজারে এত বড় অর্থ সংগ্রহে নামছে তারা।
নগদ অর্থের প্রবাহে এগিয়ে মাইক্রোসফট
বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাইক্রোসফট তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে আছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তারা ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অবাধ নগদ অর্থের প্রবাহ তৈরি করেছে। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে এটি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি।
অবাধ নগদ অর্থের প্রবাহ হলো পরিচালন ব্যয় ও প্রয়োজনীয় মূলধনি বিনিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থ। এই অর্থ দিয়ে নতুন বিনিয়োগ, ঋণ পরিশোধ, শেয়ার পুনঃক্রয় বা লভ্যাংশ দেওয়া যায়।
একই সময়ে কম্পিউটিং অবকাঠামো সম্প্রসারণে মাইক্রোসফট ব্যয় করেছে ৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এত বড় ব্যয়ের পরও নগদ অর্থের প্রবাহ ইতিবাচক থাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ক্লাউড সেবা অ্যাজুরের আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। চলতি প্রান্তিকে আরও দ্রুত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জ্যাকস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাজার কৌশলবিদ ব্রায়ান মালবেরির মতে, ক্লাউড ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও এআই সেবার চাহিদা বাড়লেও নগদ অর্থ তৈরির সক্ষমতায় মাইক্রোসফট অন্যদের চেয়ে এগিয়ে।
অ্যামাজনের বিপুল ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ
এআই অবকাঠামো নির্মাণে অ্যামাজনের বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই গতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ তৈরি করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মুখে পড়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া ১২ মাসে অ্যামাজনের নগদ অর্থের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। শুধু তৃতীয় প্রান্তিকেই মূলধনি ব্যয় হয়েছে ৭৭ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি।
প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালে ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। চলতি বছরেই মোট ব্যয় প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস আছে। উদ্বেগ কমাতে তিনি বলেছেন, অ্যামাজনের এআই ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি তিন অঙ্কের ঘরে। তাঁর বিশ্বাস, বর্তমান বিনিয়োগ ভবিষ্যতে নগদ অর্থ তৈরির সক্ষমতা অনেক বাড়াবে।
তবে জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জেসি কোহেনের মতে, আর্থিক ফলাফলের চেয়ে নগদ অর্থের চিত্রই বিনিয়োগকারীদের বেশি ভাবিয়েছে। বিপুল ঘাটতির পাশাপাশি চতুর্থ প্রান্তিকের তুলনামূলক দুর্বল পূর্বাভাসও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গুগলের মূল ব্যবসা নিয়েও প্রশ্ন
অ্যালফাবেটের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। গুগলের মূল সার্চ ব্যবসার প্রবৃদ্ধি কমছে, আবার এআই অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয় নগদ অর্থের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সার্চ বিজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার আয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই জানিয়েছেন, সার্চে অনুসন্ধানের সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু আয় বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এআই চ্যাটবট ও নতুন ডিজিটাল সহকারীরা কি ধীরে ধীরে গুগলের প্রচলিত সার্চের বাজার দখল করছে?
সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অ্যালফাবেট পরিচালন কার্যক্রম থেকে পাওয়া নগদ অর্থের ১২১ দশমিক ৪ শতাংশ মূলধনি ব্যয়ে ব্যবহার করেছে। মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে এই হার ৬৮ শতাংশ। এখানে লিজের ব্যয় হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। মূলধনি ব্যয় পরিচালন নগদের চেয়ে বেশি হলে ঘাটতি মেটাতে জমানো অর্থ বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই শতভাগের বেশি অনুপাত আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ভিজিবল আলফার গবেষণা বিভাগের প্রধান মেলিসা অটো বলেছেন, মাইক্রোসফট ও অ্যালফাবেটের ফলাফলে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। তাঁর মতে, মাইক্রোসফট নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের মধ্যেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। গুগলের বিপুল ব্যয় ও দুর্বল মূল ব্যবসা বিনিয়োগকারীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার ভয়
অ্যালফাবেটের বিপুল ব্যয়কে সবাই নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর মূলধনি বিনিয়োগে সর্বোচ্চ ২০৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে বলে ধারণা। এর সুফল গুগল ক্লাউডে দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এর আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৩০ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বিপুল বিনিয়োগের কারণে নগদ ঘাটতিও তৈরি হয়েছে। জুন প্রান্তিকে প্রথমবার নেতিবাচক নগদ প্রবাহের পর সেপ্টেম্বরে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার।
চেক ক্যাপিটালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ বিনিয়োগ কর্মকর্তা জেরেমি সাল্টজবার্গ মনে করেন, এআই প্রতিযোগিতায় টিকতে অ্যালফাবেটের বড় বিনিয়োগ দরকার। তাঁর মতে, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক এআই মডেল তৈরিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী বছর মূলধনি বিনিয়োগে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সামর্থ্য না থাকলে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই কঠিন হবে।
ঋণনির্ভর বিনিয়োগের নতুন হিসাব
প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নিজেদের আয় নয়, ঋণ ও শেয়ার বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ তুলছে। চলতি বছর গুগল ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। মেটা তুলেছে ৬২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বন্ড বিক্রি করে অ্যামাজন তুলেছে ৯৮ বিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফটও ঋণ সংগ্রহের পথে হাঁটছে, তবে এখনো অন্যদের চেয়ে কম।
মেটার সাম্প্রতিক ফলাফলও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আয় ও ইতিবাচক পূর্বাভাস থাকলেও এআইতে বিপুল ব্যয়ের কারণে নগদ প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ওরাকল ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। বুধবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। ওরাকল জানিয়েছে, বাইরের উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহে সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা আছে। ২০২৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে নগদ প্রবাহ ইতিবাচক হবে বলেও আশা করছে তারা।
এআই ব্যবসায় নতুন বাজার খুঁজছে মাইক্রোসফট
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা মনে করেন, এআই বাজার এখন পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে। আগে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন ও শক্তিশালী এআই মডেল পরীক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। এখন তারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক সম্মেলনে নাদেলা বলেন, শুধু নতুন প্রযুক্তির আকর্ষণ নয়, বড় গ্রাহকগোষ্ঠীর কাছে এআই সেবা পৌঁছানোই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা অনুযায়ী সঠিক দামে সেবা দেওয়া এবং বাজার বাড়াতে ধৈর্য ধরার কথাও জানান তিনি। এতে মাইক্রোসফটের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এত দিন ওপেনএআইয়ের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামোর বড় গ্রাহক ছিল। এখন বিভিন্ন খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদে এআই সেবা নিতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে এআই খাতে বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা নতুন পর্যায়ে ঢুকেছে। শুধু বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘোষণায় আস্থা ধরে রাখা কঠিন। বিনিয়োগের বিপরীতে আয়, নগদ প্রবাহ ও ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাই ঠিক করছে কে এগিয়ে থাকবে।












