চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি দুর্নীতি দমন, দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার এবং নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে দল পরিচালনায় পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর আত্মশাসন অব্যাহত রাখতে নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)।
বেইজিংয়ে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সিপিসির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরো। এতে বক্তব্য দেন সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিং।
অধিবেশন শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, দলীয় আত্মশাসন আরও কার্যকর করতে নীতিগত দিকনির্দেশনা ও সাংগঠনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের পর থেকে পলিটব্যুরোর কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা হয়।
দলীয় শৃঙ্খলা ও আত্মশাসনে জোর
অধিবেশনে ‘পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর দলীয় আত্মশাসন অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নে’ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। দলটির মতে, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা একটি মার্কসবাদী রাজনৈতিক দলকে কীভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং কীভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, তা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন যুগে দলকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, বিকাশ ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটি নতুন ধারণা, চিন্তাধারা ও কৌশল তুলে ধরেছে। এর মধ্য দিয়ে দল গঠনে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে দলটির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নস্বার্থ রক্ষা, সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি দলের আদর্শিক অবস্থান ও সততা ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে শাস্তি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
দুর্নীতি মোকাবিলায় কঠোর শাস্তি, লক্ষ্যভিত্তিক সংশোধন এবং কার্যকর প্রতিরোধ—এই তিনটি ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সিপিসি।
অধিবেশনের বিবৃতিতে বলা হয়, এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কর্মকর্তারা দুর্নীতি করার সাহস, সুযোগ কিংবা ইচ্ছা—কোনোটিই না পান। দুর্নীতির তাৎক্ষণিক প্রকাশ এবং এর গভীর কারণ—উভয় দিক মোকাবিলায় ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
দলীয় বিধিবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করাকে কঠোর আত্মশাসনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দল ও রাষ্ট্রের তদারকি ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
দলীয় আত্মশাসন কার্যকর করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কঠোর ব্যবস্থাপনা এবং দলীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিপিসির লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারে দৃঢ়, পেশাগত দক্ষতায় যোগ্য, আচরণে সুশৃঙ্খল এবং নিয়মকানুন মেনে চলেন—এমন কর্মকর্তাদের নিয়ে শক্তিশালী দল গড়ে তোলা। এ জন্য বিভিন্ন স্তর ও খাতের দলীয় সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দলটির মৌলিক সাংগঠনিক নীতি হিসেবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দলের সব পর্যায়ে শৃঙ্খলা ও আচরণগত মান উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।
অধিবেশনে গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়নকে বর্তমান সময় ও আগামী দিনের জন্য পুরো দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বছরের শেষ দিকে দলের কর্মসূচির সব দিক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সিপিসির ২১তম কংগ্রেস
অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সিপিসির ২১তম জাতীয় কংগ্রেস ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সমাজতান্ত্রিক আধুনিকায়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এবং দ্বিতীয় শতবার্ষিকী লক্ষ্য অর্জনের নতুন যাত্রায় এই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসটি চীন ও সিপিসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করবে।
এ ছাড়া অধিবেশনে ঝাং শেংমিনকে সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরোর নতুন সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছে। গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের প্রতিবেদনও পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর আগের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তগুলোও বহাল রাখা হয়েছে।
অধিবেশন শেষে কেন্দ্রীয় কমিটি শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে দলের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করা এবং নতুন যুগে চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে তাঁর চিন্তাধারা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এই অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোতে দলীয় শৃঙ্খলা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ২১তম জাতীয় কংগ্রেসের আগে এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন দলটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।












