চীনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাট ও কিউকিউতে একটি সাধারণ বাক্য লেখার কারণে কয়েকজন ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাক্যটির অর্থ, ‘ইদানীং শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট দিন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’ তবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নামের অক্ষরগুলো বাক্যটির মধ্যে বিশেষ ক্রমে থাকায় স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা এটিকে রাজনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে শনাক্ত করে থাকতে পারে।
চীনের অনলাইন সেন্সরশিপ নিয়ে কাজ করা চায়না ডিজিটাল টাইমস ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ ঘটনা তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাক্যটি পোস্ট করার পর কয়েকজন ব্যবহারকারী উইচ্যাটের মোমেন্টস ও কিউকিউ থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সাধারণ বাক্যেও রাজনৈতিক ইঙ্গিত খোঁজে সেন্সরশিপ
চীনা ভাষায় বাক্যটি হলো, ‘习惯了近来平平淡淡的日子।’ এর স্বাভাবিক অর্থ, ইদানীং শান্ত ও সাদামাটা দিনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু বাক্যটির অক্ষরগুলোর বিন্যাস এমনভাবে পড়া সম্ভব, যাতে শি জিনপিংয়ের নামের অংশবিশেষের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
চীনা ভাষায় ‘习惯’ শব্দের অর্থ অভ্যস্ত হওয়া। এখানে ‘习’ অক্ষরটি শি জিনপিংয়ের নামের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলে যায়। বাক্যটির অন্য অংশে ‘近’ ও ‘平’ অক্ষরও রয়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে এসব অক্ষর বিশেষ ক্রমে থাকলে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সেটিকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
বাক্যটির আরেকটি ব্যাখ্যাও সম্ভব। শব্দের বিভাজন বদলে পড়লে এর অর্থ দাঁড়াতে পারে, ‘শি ইদানীং শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট দিনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।’ এই পাঠকে কেউ কেউ নেতৃত্বের আত্মতুষ্টি বা নিষ্ক্রিয়তার প্রতি পরোক্ষ কটাক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তবে বাক্যটির এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
শি জিনপিংকে ঘিরে সাংকেতিক শব্দের বিস্তার
চীনের অনলাইন পরিসরে শি জিনপিংকে পরোক্ষভাবে বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ, অক্ষর ও প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গেমে চরিত্রের চেহারা বদলানোর উপকরণ বোঝাতে ব্যবহৃত ‘স্কিনস’ শব্দটি এখন নেতাকে ঘিরে সাংকেতিক উল্লেখের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
চায়না ডিজিটাল টাইমসের প্রতিবেদনে এমন আরও কিছু উদাহরণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে ‘↗↘↗’ প্রতীক, রাসায়নিক পদার্থ এন-বিউটেন, ইংরেজি অক্ষর ‘এন’, ‘২-৪-২’ ও ‘১২৩’ সংখ্যার বিন্যাস, সিঙ্গাপুরের ম্যান্ডারিন নাম এবং ‘শি ড্রিপিং’ ইংরেজি বাক্যাংশ।
এসব সংকেতের অর্থ সব সময় সরাসরি বোঝা যায় না। কিন্তু চীনের অনলাইন সেন্সরশিপ ব্যবস্থায় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে কথা বলার জন্য ব্যবহারকারীরা নানা ধরনের শব্দখেলা ও বিকল্প প্রকাশভঙ্গি খুঁজে থাকেন।
ভুল শনাক্তকরণও বড় উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা নির্দিষ্ট অক্ষর ও তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের ভিত্তিতে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ইঙ্গিত শনাক্ত করতে পারে। ফলে কোনো বাক্য নিরীহ হলেও তার অক্ষরবিন্যাস সন্দেহজনক মনে হলে সেটি আটকে যেতে পারে।
ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থায় ভুল শনাক্তকরণের ঘটনাকে অনেক সময় মেনে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কোনো বক্তব্য নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে নিরীহ বক্তব্যও আটকে যাওয়াকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতে পারে।
কোন অক্ষরের মধ্যে কত ব্যবধান থাকলে এমন শনাক্তকরণ এড়ানো সম্ভব, তা পরীক্ষা করতে একাধিক নতুন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু চীনে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ায় এমন পরীক্ষা ব্যয়বহুল হতে পারে। তার ওপর নিষেধাজ্ঞার সীমা যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
প্রতিবেদনটি থেকে স্পষ্ট, চীনের অনলাইন পরিসরে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ বাক্যও স্বয়ংক্রিয় নজরদারির আওতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর পক্ষ থেকে এসব নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার কারণ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
চীনের অনলাইন সেন্সরশিপ, শি জিনপিংকে ঘিরে সাংকেতিক ভাষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত জানতে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ।












