যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি ফোন নম্বর ব্যবহারের সুযোগ থেকে চীনা টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নেওয়া এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য প্রতারণামূলক স্বয়ংক্রিয় ফোনকল বা রোবোকল বন্ধ করা। একই সঙ্গে মার্কিন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও তথ্য অবকাঠামোয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, আগামী ১৯ নভেম্বর এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবে ভোট হবে। প্রস্তাব পাস হলে চীনা টেলিকম প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। তখন চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম, চায়না ইউনিকমসহ অন্যান্য আইপি-ভিত্তিক সেবাদাতা মার্কিন ফোন নম্বরে সরাসরি প্রবেশাধিকার হারাবে।
ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল বা ভিওআইপি প্রযুক্তিতে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে কণ্ঠস্বরকে ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তর করে আদান-প্রদান করা হয়। এ ধরনের সেবাদাতাদের জন্য ফোন নম্বরে সরাসরি প্রবেশাধিকার তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল। এর মাধ্যমে উন্নত টেলিযোগাযোগ সেবা দেওয়াও সহজ হয়।
এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেন্ডান কার বলেছেন, চীনা টেলিকম প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও অবৈধ স্বয়ংক্রিয় ফোনকলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।
এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বেইজিং দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। চীনের অভিযোগ, ওয়াশিংটন জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরঞ্জিত করছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চীনা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীনের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা
ফোন নম্বরে সরাসরি প্রবেশাধিকার বন্ধ করেই থামতে চায় না এফসিসি। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে, এমন আইপি-ভিত্তিক সেবাদাতাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা আছে সংস্থাটির। এ তালিকায় চীনের হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে মার্কিন ইলেকট্রনিক পণ্য পরীক্ষার কাজে চীনা পরীক্ষাগারের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধের পরিকল্পনাও জানিয়েছে এফসিসি। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত চীনা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ফোন নম্বর ব্যবহারের অনুমোদনও বাতিল হতে পারে।
এর আগে চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম ও চায়না ইউনিকমকে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সেবা দেওয়ার অনুমতি বাতিল করেছিল ওয়াশিংটন। এখন তাদের মার্কিন টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ এবং দেশটিতে তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্র চালানো থেকেও বিরত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে উদ্বেগ
চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মার্কিন টেলিযোগাযোগ তথ্য ও অবকাঠামোয় নজরদারি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা ওয়াশিংটনে কয়েক বছর ধরে বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছিল, চীনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ‘সল্ট টাইফুন’ নামের একটি সাইবার গুপ্তচর গোষ্ঠী দেশটির টেলিযোগাযোগ খাতে বড় অনুপ্রবেশ চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গোষ্ঠীটি গ্রাহকদের ফোনকলের রেকর্ড ও যোগাযোগের তথ্য চুরি করেছে এবং বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোয় ঢুকেছে। এ বছরও এফবিআই জানিয়েছে, সল্ট টাইফুনের হুমকি এখনো সক্রিয়।
গত জুলাইয়ে এফসিসি ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ডিজিটালসিস্টেম টেকনোলজিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করে। চীনা টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং একজন চীনা নাগরিকের মালিকানার বিষয়টি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চীন বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
প্রস্তাবটি ১৯ নভেম্বরের ভোটে পাস হলে চীনা টেলিকম প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বিরোধ আরও বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেই বিরোধ নতুন মাত্রা পেতে পারে।












