আফগানিস্তানে নারী ও মেয়েদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ এবং দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর হামলা চালানো ঠেকাতে তালেবান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, আফগানিস্তানের তালেবান শাসকদের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও দায়িত্ব পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হলে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কথাও জানিয়েছে দেশটি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সংলাপে পাকিস্তানের কাউন্সেলর মুহাম্মদ জাওয়াদ আজমল এসব বক্তব্য দেন। ২৯ অক্টোবর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় তিনি আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তালেবান প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সীমান্তবর্তী দুই প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বেগ
পাকিস্তানের অভিযোগ, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইসলামাবাদ বারবার কাবুলকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালানো বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক।
জাতিসংঘের আলোচনায় জাওয়াদ আজমল বলেন, আফগানিস্তানের নানা সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ। দেশটির ভূখণ্ডে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে পাকিস্তান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর অভিযোগ, আফগান তালেবান ও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তান ও প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে তৎপরতা চালানো গোষ্ঠীগুলোকে বাইরের পক্ষগুলোর সমর্থনের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
আজমলের ভাষ্য, এসব গোষ্ঠীর প্রকাশ্য নিন্দা জানাতে তালেবান প্রশাসনের ধারাবাহিক ব্যর্থতা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও সমর্থন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
১৬ মার্চের হামলার প্রসঙ্গ
পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে জাওয়াদ আজমল ১৬ মার্চের অভিযানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই অভিযানে সামরিক স্থাপনা এবং নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) হামলায় ব্যবহৃত সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে ড্রোন ও গোলাবারুদ সংরক্ষণের স্থাপনাও ছিল।
পাকিস্তানি বাহিনী ওই রাতে কাবুল ও নানগারহরে আফগান তালেবানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সে সময় পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছিলেন, ‘অপারেশন গজব লিল-হক’-এর অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
জাওয়াদ আজমল বলেন, পাকিস্তানের নাগরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর ধারাবাহিক হামলার মুখে দেশটি নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে নাগরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকির জবাবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে ইসলামাবাদ।
নারী অধিকার ও শরণার্থী সংকট
আফগানিস্তানে নারী ও মেয়েদের মৌলিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়েও উদ্বেগ জানান পাকিস্তানি প্রতিনিধি। তাঁর মতে, এ ধরনের বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক আচরণ তালেবানের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রতিফলন। একই সঙ্গে এসব চর্চা ইসলামের আইন, ঐতিহ্য ও মৌলিক শিক্ষার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আজমল বলেন, কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়াই লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। দেশটি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ঝুঁকিতে থাকা আফগানদের সহায়তা অব্যাহত রাখলেও এই দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ভাগ করে নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আফগানদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা
এদিকে পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কিছু আফগান অভিবাসীকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। আফগান শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আফগানইভ্যাকের প্রধান শন ভ্যানডাইভার শুক্রবার জানান, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর যারা আফগানিস্তান ছেড়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজনও এই পরিকল্পনার আওতায় রয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫০ জনের বেশি আফগান অভিবাসীকে ফেরত পাঠানো হতে পারে। লুইজিয়ানায় কয়েক ডজন আফগান অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে এবং প্রথম প্রত্যাবাসন ফ্লাইট সোমবারের মধ্যেই ছাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ভ্যানডাইভার সতর্ক করে বলেন, ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে থাকা কয়েকজন এমন পরিবারের সদস্য, যাদের স্বজনেরা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। তালেবানের হাতে তাঁদের পরিবারগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও তিনি উদ্বেগ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অবশ্য নিরাপত্তাগত কারণে ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন অভিযানের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানায়নি।
জাতিসংঘে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নারী নিপীড়ন বন্ধ ও জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫০ জনের বেশি আফগান অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।












