জুন মাস বিশ্বজুড়ে প্রাইড মাস হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের অনেক দেশে এ সময় সমকামী, উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডারসহ বিভিন্ন যৌন ও লিঙ্গপরিচয়ের মানুষের অধিকার, স্বীকৃতি ও দৃশ্যমানতা উদ্যাপন করা হয়। কোথাও রাস্তায় শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই উদ্যাপন হয়। কিন্তু এশিয়ার অনেক সমাজে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। এখানে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের প্রত্যাশা, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই।
অনেক ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রংধনু প্রতীক ব্যবহারেই প্রাইড মাসের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ এশিয়ার বহু কুইয়ার মানুষের বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। পরিচয় প্রকাশের কারণে সামাজিক অপমান, পারিবারিক চাপ ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে দুই তরুণের চুম্বনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। এমনকি একজন তরুণের বাবাকে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের সামনে ক্ষমা চাইতে ও মাথা নত করতে দেখা যায়। অনেক কুইয়ার এশীয় মানুষের কাছে এই দৃশ্য ছিল পরিচিত সামাজিক লজ্জা ও বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি।
এই অভিজ্ঞতাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাঁচটি চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে পরিচয়, ভালোবাসা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বাধা ও আত্মস্বীকৃতির ভিন্ন ভিন্ন গল্প।
জাপান: শৈশবের পরিচয় ও পরিবারের বোঝাপড়া
1. Monster (২০২৩)
পরিচালক হিরোকাজু কোরে-এদার এই চলচ্চিত্রে দুই বালকের শৈশব, বন্ধুত্ব ও নিজেদের অনুভূতি বুঝে ওঠার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে কুইয়ার পাম পুরস্কার পাওয়া সিনেমাটির শুরু এক মাকে কেন্দ্র করে, যিনি সন্দেহ করেন তাঁর ছেলে স্কুলে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসে। এতে দুই শিশুর সম্পর্কের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের বিভ্রান্তি, উপলব্ধি ও সহমর্মিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কোরে-এদা দেখিয়েছেন, ভিন্ন যৌনপরিচয়ের সন্তানের অভিজ্ঞতা বুঝতে মা-বাবার সময় লাগতে পারে। চলচ্চিত্রটি দর্শককে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে ঘটনা দেখার সুযোগ দেয়।
থাইল্যান্ড: বন্ধুত্বের আড়ালে পরিচয়ের অনুসন্ধান
2. Flat Girls (২০২৫)
থাইল্যান্ডের সমকালীন কুইয়ার চলচ্চিত্রের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংযোজন ফ্ল্যাট গার্লস। পরিচালক জিরাসায়া ওংসুতিনের এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যান ও জেন। সরকারি আবাসন প্রকল্পের একই ভবনে বেড়ে ওঠা দুই তরুণীর জীবন ও সম্পর্ককে ঘিরে গল্পটি এগিয়েছে।
শৈশব থেকেই তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু একই পরিবেশকে তারা ভিন্নভাবে দেখে। অ্যানের কাছে আবাসন প্রকল্পটি বন্দিশালার মতো, অন্যদিকে জেনের কাছে সেটিই নিরাপদ আশ্রয়।
বড় হয়ে ওঠার সময় দুজনের পরিচয় ও যৌনতার অনুসন্ধানও গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। সিনেমাটি সরাসরি প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত নয়; বরং বন্ধুত্বের মধ্যেও যে গভীর আবেগ ও আকর্ষণ থাকতে পারে, তা তুলে ধরেছে। চলচ্চিত্রটি নেটফ্লিক্স ও ক্লিকফিল্মে দেখা যায়।
ভিয়েতনাম: অন্ধকারের মধ্যে ভালোবাসা
3. Viet & Nam (২০২৪)
২০০১ সালের ভিয়েতনামের গ্রামীণ কয়লাখনির পরিবেশে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের দুই তরুণ চরিত্র ভিয়েত ও নাম। তাদের একজন নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।
কয়লাখনির অন্ধকার ও গোপন জগতে দুই তরুণের ভালোবাসার গল্প ফুটে উঠেছে। সামাজিক স্বীকৃতির অভাব ও বৈষম্যের আশঙ্কায় অনেক তরুণকে যেভাবে নিজেদের অনুভূতি আড়াল করে রাখতে হয়, সিনেমাটি সেই বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।
চলচ্চিত্রটি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ও টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। পরে ইন্দোনেশিয়ার জগজা-নেটপ্যাক এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবেও এর প্রদর্শনী হয়। নির্বাচিত অঞ্চলে মুবিতে সিনেমাটি দেখা যায়।
তাইওয়ান: মৃত্যুর পর বাবার গোপন জীবন
4. Dear Ex (২০১৮)
তাইওয়ানের এই কমেডি-ড্রামার গল্প শুরু হয় এক কিশোরকে ঘিরে। বাবার মৃত্যুর পর সে জানতে পারে, তাঁর বাবা জীবনবিমার পুরো অর্থ স্ত্রী ও ছেলের পরিবর্তে নিজের পুরুষ সঙ্গীর জন্য রেখে গেছেন।
এরপর বিধবা স্ত্রী, ছেলে ও মৃত ব্যক্তির সাবেক সঙ্গীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। হাস্যরসের আড়ালে সিনেমাটি তুলে ধরে একজন গোপন সমকামী পুরুষের জীবন, সামাজিক প্রত্যাশা এবং পরিবারকে ঘিরে তাঁর জটিল সিদ্ধান্তগুলো।
একজন মানুষ কি সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের পরিচয় আড়াল করে রাখতে পারেন? ভালোবাসা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে তার পরিণতি কী হয়? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর না দিয়ে চলচ্চিত্রটি শোক, ক্ষোভ, ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতার সহাবস্থান দেখিয়েছে। নেটফ্লিক্সে এটি দেখা যায়।
ইন্দোনেশিয়া: ট্রান্সজেন্ডার নারীর জীবন ও পারিবারিক দায়িত্ব
5. Sara (২০২৩)
ইন্দোনেশিয়ার চলচ্চিত্রে ট্রান্সজেন্ডার নারীদের জীবন নিয়ে নির্মিত সিনেমার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এই প্রেক্ষাপটে পরিচালক ইসমাইল বাসবেথের সারা গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
আশা স্মারা দারা অভিনীত কেন্দ্রীয় চরিত্র সারা একজন তরুণ ট্রান্সজেন্ডার নারী। মায়ের স্মৃতিভ্রংশের কারণে তিনি মেয়েকে প্রয়াত স্বামী ভেবে ভুল করেন। মায়ের দেখাশোনার জন্য সারা নিজের শহরে ফিরে এলে ধীরে ধীরে তার অতীত ও পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণগুলো সামনে আসে।
সিনেমায় অভিনয় করেছেন ক্রিস্টিনে হাকিমও। ২০২৩ সালে বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর ছবিটি সিত্রা পুরস্কারের দুটি বিভাগে মনোনয়ন পায়। এর মধ্যে আশা স্মারা দারার সেরা অভিনেত্রী বিভাগে মনোনয়ন ছিল ঐতিহাসিক; এই বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া তিনিই প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নারী।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমাটি দেশটির চলচ্চিত্রে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের জীবনকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।












