রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নয়টি গুলিতে আহত হওয়ার যে দাবি করে মামলা করেছিলেন নুর হোসেন, পুলিশি তদন্তে সেই ঘটনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার দিন তিনি গুলিবিদ্ধ হননি, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দাবির পক্ষেও কোনো নথি নেই। এমনকি মামলায় দাখিল করা চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রও জাল বলে শনাক্ত হয়েছে।
এ ঘটনায় করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক উখ্যমাং রাখাইন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে প্রতিবেদনটি জমা দেন। এতে মামলার সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এটি পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন; আসামিদের অব্যাহতির বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে প্রমাণ নেই
মামলার অভিযোগে নুর হোসেন দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে ময়ূর ভিলার সামনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরে মোট নয়টি গুলি লাগে—পিঠে ছয়টি, বাঁ হাঁটুর ওপর দুটি এবং ডান হাঁটুর পাশে একটি। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁকে ইট দিয়ে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরে তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেয়নি বলেও অভিযোগ করেছিলেন নুর হোসেন।
তবে তদন্তে এসব দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ। হাসপাতালের মূল জরুরি বিভাগের নিবন্ধন খাতা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নুর হোসেন নামে কোনো রোগী সেখানে ভর্তি বা চিকিৎসা নেননি।
চিকিৎসার কাগজপত্রেও জালিয়াতি
তদন্তে মামলার সঙ্গে জমা দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতেও অসংগতি পাওয়া যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ব্যবস্থাপত্র সাধারণত হাতে লেখা হলেও নুর হোসেনের জমা দেওয়া কাগজটি ছিল টাইপ করা।
এ ছাড়া কাগজে উল্লেখ করা ক্যাশ মেমো নম্বরটি হাসপাতালের ৫৪ বছর বয়সী আবদুস সাত্তারের নামে পাওয়া গেছে। আর রোগীর পরিচিতি নম্বরটি ছিল ৩২ বছর বয়সী জুয়েলের। ফলে জমা দেওয়া নথিগুলো নুর হোসেনের চিকিৎসার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের সরকারি গেজেটের তালিকাতেও নুর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।
৮৪ আসামির অব্যাহতির সুপারিশ
মামলাটিতে শুরুতে শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে মামলার আসামির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪ জনে। পুলিশি প্রতিবেদনে এই ৮৪ জনকেই অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা উত্তর শাখার সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সোলাইম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন এবং মহিলা লীগের নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
মামলার এজাহারের ভিত্তিতে নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্য মামলায় আগে থেকেই কারাগারে থাকা আটজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।
আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ
পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর আদালত অভিযোগকারী নুর হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।
মামলার অভিযোগে বর্ণিত গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, হাসপাতালের নথি এবং সরকারি আহতের তালিকা—কোনোটিতেই দাবির সমর্থন না পাওয়ায় পুলিশ সব আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।












