২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী।
ফলাফলের এই অবনতি শুধু একটি পরীক্ষার খারাপ পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অভ্যাস, পাঠদানের মান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি।
তবে ফল খারাপ হওয়ার জন্য কোনো একটি ঘটনাকে একমাত্র কারণ বলা যাবে না। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরীক্ষার ফল, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিলে সংকটের গভীরতা বোঝা যায়।
তিন বছরে পাসের হারে বড় পতন
২০২৪ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন, এবার পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন।
এবারের ফলাফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। অন্যদিকে, মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছেন; গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। কোনো প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করলে সেখানে পাঠদান, শিক্ষকের উপস্থিতি, নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
২০২৪ সালের বিশেষ সুবিধা কি ভুল বার্তা দিয়েছিল?
২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষা চলার সময় জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার কারণে কয়েক দফায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে বাকি বিষয়গুলোর পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফল এবং এসএসসির সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ফলের ভিত্তিতে বাকি বিষয়গুলোর ফল নির্ধারণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত স্থগিত পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয় এবং বিষয়ভিত্তিক মান নির্ধারণের পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হয়। ওই বছর পাসের হার দাঁড়ায় ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরীক্ষার একটি বড় অংশ না দিয়েও বিকল্প পদ্ধতিতে ফল পাওয়ার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করেছিল কি না—নিয়মিত প্রস্তুতি বা সব বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত এড়ানো সম্ভব—তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ ধরনের ধারণা তৈরি হয়ে থাকলে নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ২০২৬ সালের ফলাফলের সঙ্গে ২০২৪ সালের সিদ্ধান্তের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো গবেষণা বা প্রমাণ এখনো সামনে নেই। তাই এটিকে নিশ্চিত কারণ না বলে শিক্ষাব্যবস্থার নীতিগত সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব হিসেবে দেখা উচিত।
শিক্ষক পদত্যাগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বহিরাগত ব্যক্তিরাও যুক্ত হন। ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫০ জন শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। অনেক শিক্ষককে অপমান ও হয়রানির শিকার হতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে, তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন এবং তা বন্ধের নির্দেশ দেন।
এই ঘটনাগুলোর প্রভাব শুধু পদত্যাগ করা শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষের কর্তৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বাভাবিক পরিবেশও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অভ্যুত্থানের এক মাস পর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদ শূন্য ছিল, নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল এবং প্রতিষ্ঠান খুললেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম।
শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি, অপমান বা জোর করে পদত্যাগ করানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষকের পেশাগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্য শিক্ষকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে নিয়ম, কর্তৃত্ব ও জবাবদিহি সম্পর্কে ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পড়াশোনার অভ্যাস ও মূল্যায়নব্যবস্থার প্রশ্ন
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনায় অনীহা, ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রবণতা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের এইচএসসি ফল প্রকাশের পর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান খোন্দকার এহসানুল কবির বলেছিলেন, শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরে গেছে। তাঁর মতে, ফলাফলে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ইংরেজি বিষয়ে বহুনির্বাচনি প্রশ্ন বাদ দেওয়ায় প্রশ্নপত্র তুলনামূলক কঠিন হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
অন্যদিকে, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতা বা নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে শিথিলতা কমানো হলে পাসের হার কমতে পারে। কিন্তু সেটি সব সময় শিক্ষার মান হঠাৎ কমে যাওয়ার প্রমাণ নয়। বরং আগে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উদারতা ছিল কি না, শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখেছে এবং মূল্যায়নব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল বিশ্লেষণেও শিক্ষাবিদেরা পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন, কোভিড-পরবর্তী শিখনঘাটতি, শিক্ষকস্বল্পতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা এবং কঠোর মূল্যায়নকে ফল খারাপ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসএসসির অভিজ্ঞতা এইচএসসি ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক, যদিও দুই পরীক্ষার শিক্ষার্থী ও প্রস্তুতির পরিস্থিতি এক নয়।
সমাধান শুধু পাসের হার বাড়ানো নয়
এইচএসসির ফলাফল নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে। পাসের হার বাড়ানোই যদি শিক্ষানীতির প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে নম্বরের পরিসংখ্যান উন্নত হতে পারে; কিন্তু বাস্তব দক্ষতা ও জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যেতে পারে। আবার কঠোর মূল্যায়নের নামে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কেন তারা শিখতে পারছে না, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।
এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস, পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত পড়াশোনা, উপস্থিতি ও পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে; দলবদ্ধ চাপ বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়।
২০২৬ সালের এইচএসসি ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার, শত শত প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ না হওয়া এবং জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, সমস্যা শুধু পরীক্ষার হলে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের অস্থিরতা, পরীক্ষায় বিশেষ পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার সংকট—সবকিছুর প্রভাব কতটা পড়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং শেখার মান উন্নত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।












