রক ও পাঙ্কসংগীতের দুনিয়ায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনভিত্তিক চার সদস্যের ব্যান্ড ডাই স্পিটজ। বিদ্যুৎগতির গিটার, তীব্র কণ্ঠ, দুর্দান্ত মঞ্চ পরিবেশনা আর দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—সব মিলিয়ে ব্যান্ডটি এখন সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে বেশ আলোচিত। তাদের কনসার্টে শুধু গান শোনাই নয়, দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠা এবং মঞ্চের সামনে প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করাও বিশেষ আকর্ষণ।
আভা শ্রোবিলজেন, এলিনর লিভিংস্টন, কেট হাল্টার ও ক্লোয়ি ডি সেন্ট অবাঁ—এই চার তরুণীকে নিয়ে গঠিত ডাই স্পিটজ। কনসার্টে তাঁরা পালা করে বাদ্যযন্ত্র বাজান, কণ্ঠ দেন এবং দর্শকদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যান, যা তাঁদের পরিবেশনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। দর্শকদের মাথার ওপর দিয়ে ভিড়ের মধ্যে ভেসে যাওয়ার মতো কনসার্টের পরিচিত রীতিতেও অংশ নেন তাঁরা। কখনো এমন করতে গিয়ে পড়ে গেলেও তাঁদের উৎসাহে ভাটা পড়ে না।
গত ১৭ জুলাই সান দিয়েগোর হাউস অব ব্লুজে রোলিং স্টোন রক ট্যুরের অংশ হিসেবে তাঁদের পরিবেশনা দর্শকদের মনে দাগ কাটে। এই আয়োজনের উপস্থাপনায় ছিল মিলার হাই লাইফ। ব্যান্ডটির গিটারবাদক ও কণ্ঠশিল্পী আভা শ্রোবিলজেন বলেন, কনসার্টে তিনি প্রায়ই দর্শকদের মধ্যে নারী ও সমকামী ভক্তদের খুঁজে তাঁদের সাড়া দিতে বলেন। সান দিয়েগোতে এই দুই দলের দর্শকদের উচ্ছ্বসিত সাড়া বিশেষভাবে চোখে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
ছোট পরিসর থেকে বড় মঞ্চে
ডাই স্পিটজের উত্থানের পেছনে রয়েছে একের পর এক প্রাণবন্ত পরিবেশনা। গত বছর সাউথ বাই সাউথওয়েস্ট (এসএক্সএসডব্লিউ) উৎসবে তাদের দুর্দান্ত উপস্থিতি সংগীতজগতের নজর কাড়ে। এরপর বিখ্যাত সংগীতশিল্পী জ্যাক হোয়াইটের প্রতিষ্ঠান থার্ড ম্যান রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় ব্যান্ডটি। কয়েক মাস পর এই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রকাশিত হয় তাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যালবাম সামথিং টু কনজিউম।
এরপর তাদের পথচলা আরও দ্রুত এগিয়েছে। এ বছর ফু ফাইটার্সের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি কোচেলা ও লোলাপালুজার মতো বড় সংগীত উৎসবেও পারফর্ম করেছে তারা। এসব আয়োজন ব্যান্ডটির পরিচিতি আরও বাড়িয়েছে এবং বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
আগামী মে ২০২৭ পর্যন্ত কয়েকটি বিরতি ছাড়া নিয়মিত কনসার্ট ও সফরে থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এই সময় টার্নস্টাইল ও অলিভিয়া রদ্রিগোর মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনাতেও উদ্বোধনী ব্যান্ড হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে রক ও পাঙ্কসংগীতের নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে ডাই স্পিটজ।
বন্ধুত্বই ব্যান্ডটির বড় শক্তি
দীর্ঘ সফর, নিয়মিত কনসার্ট এবং ব্যস্ত সময়সূচির চাপ সামলাতে চার সদস্যের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাঁদের বন্ধন এতটাই দৃঢ় যে নিজেদের আলাদা চারজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং একই সত্তার অংশ হিসেবে ভাবতে ভালোবাসেন তাঁরা।
শ্রোবিলজেনের ভাষায়, চারজন যেন মিলে একজন মানুষ হয়ে গেছেন। তাঁদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির মধ্যে মিল থাকায় একে অপরকে বুঝতে সুবিধা হয়। কখনো কোনো দিন চারজনই ক্লান্ত হয়ে পড়লে কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে সেটিও একই সময়ে ঘটে। বিষয়টি তাঁদের কাছে বিরক্তিকর হওয়ার বদলে হাস্যরসের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
বন্ধুত্বের পাশাপাশি অবসর কাটানোর জন্য তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক পাশা খেলা ফার্কল খেলেন। ব্যস্ত সংগীতজীবনের মধ্যে এই ছোট ছোট মুহূর্ত তাঁদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি সামলাতে সাহায্য করে।
তবে এই সাফল্যের শুরুটা খুব বেশি দিনের নয়। ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে, যখন মহামারির কারণে অনেকের জীবনেই একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা ছিল, তখন সময় কাটানোর জন্য ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয়। সদস্যদের বেশির ভাগই তখন একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এলিনর লিভিংস্টন বলেন, অনেকেই এমন একটি জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেন। তবে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের সঙ্গে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারাটা তাঁদের কাছে আরও বেশি আনন্দের।
নারী ও সমকামী দর্শকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ
ডাই স্পিটজের কাছে সংগীত পরিবেশনা কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; কনসার্টে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করাও তাদের লক্ষ্য, যেখানে নারী ও সমকামী দর্শকেরা স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারেন। তাঁদের চাওয়া, দর্শকেরা যেন ভয় বা অস্বস্তি ছাড়াই গান উপভোগ করতে পারেন এবং নিজেদের মতো করে আনন্দ করতে পারেন।
ব্যান্ডটির সদস্যদের অভিযোগ, কখনো কখনো পুরুষ দর্শকদের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি ও আচরণের কারণে তাঁদের নিজেদের এবং অন্য দর্শকদের অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতির বিরুদ্ধে তাঁরা সরব। বিরক্তিকর আচরণ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ভক্তদেরও উৎসাহ দেন তাঁরা।
ড্রামার ক্লোয়ি ডি সেন্ট অবাঁ বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাঁরা ভক্তদের পাশে থাকবেন। তাঁর মতে, নারীদের নিজেদের সুরক্ষায় আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
ডাই স্পিটজের এই অবস্থান তাদের সংগীতের বাইরেও একটি পরিচয় তৈরি করেছে। মঞ্চে প্রচণ্ড শক্তিশালী পরিবেশনা, সদস্যদের গভীর বন্ধুত্ব এবং দর্শকদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাগতপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা—সব মিলিয়ে ব্যান্ডটি রক ও পাঙ্কসংগীতের নতুন ধারায় নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
তাদের সামনে এখন আরও বড় মঞ্চ, দীর্ঘ সফর এবং নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ। কয়েক বছর আগেও যে চার তরুণী অবসর কাটানোর জন্য একসঙ্গে সংগীতচর্চা শুরু করেছিলেন, তাঁরাই এখন আন্তর্জাতিক সংগীতমঞ্চে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন।












