ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নিজেও বুঝতে পারছিলেন না, কেন এমন ফল হলো। তাঁর ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন মেয়াদের মধ্যে এবারের মেয়াদেই তিনি সবচেয়ে ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর বামপন্থী শিবিরে নেমে আসে হতাশা। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, প্রথম দফায় পরাজিত প্রার্থীদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ফ্লাভিও বলসোনারোর দিকে চলে যেতে পারেন। ফলে লুলার জয়ের সম্ভাবনা অনেকেই ক্ষীণ বলে মনে করছিলেন।
কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে বদলে যায় পুরো নির্বাচনী পরিস্থিতি। তরুণদের রাজপথের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং লুলার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান তিনি। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে জয়ী হন।
তরুণদের আন্দোলনে নতুন প্রাণ
প্রথম দফার ভোটের পরদিনই ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর কাছের শহর নিতেরোইতে রাস্তায় নামেন ফ্লুমিনেন্স ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য ছিল বলসোনারো পরিবারের আবার ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা। ফ্লাভিও বলসোনারোর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো তখন অভ্যুত্থানের চেষ্টা-সংক্রান্ত মামলায় গৃহবন্দী ছিলেন।
এর দুই দিন পর রিও ডি জেনেইরোর কেন্দ্রেও শিক্ষার্থীদের আরেকটি প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দেশের বিভিন্ন শহরে একই ধরনের কর্মসূচি দেখা যায়। এসব আন্দোলনের পেছনে কোনো একক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছিল না। বরং তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই আন্দোলনকে বিস্তৃত করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ লুলার প্রচারে নতুন গতি এনে দেয়। পরাজয়ের আশঙ্কায় যখন তাঁর সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, তখন তরুণদের সক্রিয়তা আবারও তাঁদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে।
রোববার রাতে বিজয়ী ভাষণে লুলা গণতন্ত্র রক্ষায় রাজপথে নামার জন্য ব্রাজিলের তরুণদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে তরুণদের ভূমিকা তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
হোয়াটসঅ্যাপ থেকে কোটি মানুষের কাছে প্রচার
লুলার প্রত্যাবর্তনের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাবিও ভাসকনসেলোসের মতে, রাজপথের আন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি বদলে দেয়।
প্রথম দফার ভোটের দুই দিন পর লুলার ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সংসদ সদস্য আন্দ্রে জানোনেস ‘লুলাস আর্মি’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল চালু করেন। সেখানে তিনি নিয়মিত অডিও বার্তা, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুলার পক্ষে প্রচার ছড়িয়ে দেওয়ার নানা নির্দেশনা দিতে থাকেন।
কীভাবে একটি পোস্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, কোন ধরনের বিষয়বস্তু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং কীভাবে অনলাইনে প্রচারের গতি বাড়ানো যায়—এসব বিষয়েও অনুসারীদের পরামর্শ দেওয়া হতো।
চ্যানেলটি চালুর প্রথম দিনেই অনুসারীর সংখ্যা ৬০ হাজারে পৌঁছে যায়। নির্বাচনের দিন সেই সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে অনলাইনে লুলার প্রচারের পরিধি বলসোনারোর প্রচারকেও ছাড়িয়ে যায়।
বিজয়ী ভাষণে জানোনেসকে ‘আমাদের সেনাপতি’ বলে উল্লেখ করেন লুলা। তাঁর ভাষায়, প্রতিদিন সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখাই ছিল জানোনেসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নির্বাচনের আগের দিন টানা ২৪ ঘণ্টা ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারসহ প্রচারের নানা কাজে যুক্ত ছিলেন জানোনেস। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আগের সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ওই দিনই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলটি নীরব ছিল।
নিজের প্রচারেও বদল আনেন লুলা
শুধু সমর্থকদের প্রচার নয়, নিজেদের অনলাইন যোগাযোগের কৌশলেও পরিবর্তন আনে লুলার নির্বাচনী দল। প্রচারের শেষ কয়েক সপ্তাহে লুলা নিজেই ছোট ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে শুরু করেন। মজার বিষয় হলো, তখন পর্যন্ত তাঁর নিজের কোনো মুঠোফোন ছিল না।
বিজয়ী ভাষণে তিনি জানান, তাঁকে একটি ফোন দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে তিনি সরাসরি ব্রাজিলের মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন এবং দিনে একাধিকবার তাঁদের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ ভোটারদের সঙ্গে লুলার সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে শুধু জনসভা বা প্রচার দলের ওপর নির্ভর না করে তিনি নিজেও অনলাইন প্রচারের দৃশ্যমান মুখ হয়ে ওঠেন।
দরিদ্র পরিবারকে সহায়তার কর্মসূচিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ
নির্বাচনের আগে লুলা সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিও আলোচনায় আসে। নির্বাচনী আইন যতটা অনুমতি দেয়, তার সীমার মধ্যে থেকে সরকার দরিদ্র পরিবারের জন্য নগদ সহায়তা কর্মসূচির অর্থ বাড়ানো এবং আগাম পরিশোধের মতো পদক্ষেপ নেয়।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয়। লুলার সমর্থকদের একটি বড় অংশের কাছে এসব কর্মসূচি ছিল তাঁর সরকারের নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তবে শুধু সরকারি সুবিধা নয়, বলসোনারোর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ব্রাজিলের নতুন ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামিলা রোচা বলেন, লুলার প্রত্যাবর্তন ছিল দেশ পরিচালনায় বলসোনারো-ঘরানার রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিস্তৃত জনমতের প্রতিফলন।
গত মে মাস থেকে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটারদের একাংশের মধ্যে নিজেদের অধিকার হারানোর আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, বলসোনারো ক্ষমতায় ফিরলে রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
রোচা জানান, সাক্ষাৎকারে কিছু সিদ্ধান্তহীন ভোটার বলসোনারোকে বড় ব্যবসায়ীদের ঘনিষ্ঠ একজন ধনী জীবনযাপনে অভ্যস্ত রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তিনি জয়ী হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে মানুষ নিজেদের অধিকার হারাবে এবং দেশ আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে এগোবে।
ভোটারদের মন বদলাল যেভাবে
লুলার জয়ের পেছনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের একাংশকে নিজের দিকে টানার ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
প্রথম দফায় ঐতিহাসিকভাবে বেশি ভোটার ভোট দিতে যাননি। দ্বিতীয় দফায় লুলার প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল তাঁদের আবার ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা। পাশাপাশি অন্য প্রার্থীদের সমর্থকদের, এমনকি বলসোনারোর কিছু ভোটারকেও নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা চালানো হয়।
নির্বাচনের আগে বলসোনারোও একাধিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, নতুন কংগ্রেসে আরও রক্ষণশীল সদস্যদের প্রাধান্য কাজে লাগিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করবেন এবং ব্রাজিলকে নতুন করে ‘গণতান্ত্রিক’ করবেন। তাঁর বক্তব্যের এই অংশ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়।
এ ছাড়া দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তাঁকে ঘিরে দুটি তদন্তও চলছিল। এসব বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
লুলার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই কি শেষ পর্যন্ত নির্ধারক?
নির্বাচনী কৌশল, তরুণদের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরকারি সহায়তার পাশাপাশি লুলার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকেও তাঁর প্রত্যাবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হেলসিমারা দে সুজা তেলেস বলেন, লুলার পরিবর্তে অন্য কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে প্রথম দফাতেই বলসোনারো জিতে যেতে পারতেন।
লুলার নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থাপক মার্কো অরেলিও দে কারভালহোও তাঁর নেতার ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, লুলার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই এই ঐতিহাসিক নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এই নির্বাচন দেখিয়েছে, প্রথম দফার ফলই সব সময় শেষ কথা নয়। ভোটারদের মনোভাব, মাঠের আন্দোলন, অনলাইন প্রচার, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু মিলে অল্প সময়ের মধ্যেও নির্বাচনের হিসাব বদলে যেতে পারে। লুলার ক্ষেত্রে তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই পরিবর্তনই তাঁকে হতাশার পরিস্থিতি থেকে জয়ের মঞ্চে নিয়ে আসে।












