সুদানের দারফুর অঞ্চলের অন্যতম বড় শহর এল-ফাশের। একসময় প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস ছিল এই শহরে। বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা শহরটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে পরিণত হয় মৃত্যু, ক্ষুধা ও ধ্বংসের এক ভয়াবহ প্রতীকে। আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) দখলদারত্বের মুখে শহরের অধিকাংশ চিকিৎসক পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু তরুণ চিকিৎসক আদম শেষ পর্যন্ত রোগীদের ছেড়ে যেতে চাননি। নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা হাসপাতালে থেকে মানুষের চিকিৎসা চালিয়ে যান।
আদমের গল্প শুধু একজন চিকিৎসকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নয়। এটি যুদ্ধের মধ্যে মানবিক দায়িত্ব, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি মানুষের অসাধারণ সহমর্মিতার গল্প। একই সঙ্গে এই কাহিনি তুলে ধরে, কীভাবে দীর্ঘ অবরোধ, খাদ্য ও ওষুধের সংকট এবং হাসপাতালের ওপর ধারাবাহিক হামলা একটি জনপদকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
বন্দিদশায় পরিচয় গোপন রাখার লড়াই
২০২৫ সালের অক্টোবরে এল-ফাশেরের পতনের পর আদমকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে একটি পরিত্যক্ত স্কুলে আটকে রাখা হয়। চারদিকে মরুভূমি, খাবারের অভাব আর সশস্ত্র যোদ্ধাদের পাহারা। বন্দিদের মধ্যে চিকিৎসকদের খুঁজছিল আরএসএফের সদস্যরা। কারণ, যুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার প্রমাণ প্রকাশ করেছিলেন এমন কিছু চিকিৎসক, যাঁদের মধ্যে আদমও ছিলেন।
শহরটি পতনের আগেই কয়েক মাসের অবরোধে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বন্দিদশায় প্রতিদিন সামান্য রুটি ছাড়া প্রায় কিছুই খেতে পেতেন না। শরীর ভেঙে পড়ছিল। কখনো বাস্তবতা আর স্মৃতি তাঁর কাছে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। মনে পড়ছিল হাসপাতালের সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো সময়, ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়ানো তাঁর পোষা কুকুর বুলডোজের কথা এবং শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ার মুহূর্তে মানুষের আর্তচিৎকার।

এমন সময় এক নারী বন্দিদের ভিড়ের মধ্যে তাঁকে চিনতে পারেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে চিনাবাদাম বিক্রি করতেন। প্রথমবার তিনি আদমকে বলেন, তিনি তাঁকে চেনেন—তিনি সেই চিকিৎসক, যিনি সৌদি হাসপাতালে কাজ করতেন।
আদম ভয় পেয়ে পরিচয় অস্বীকার করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, নারীটি হয়তো আরএসএফের তথ্যদাতা। চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় প্রকাশ পেলে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। কয়েক দিন পর নারীটি আবার ফিরে এসে একই কথা বলেন। এবার তিনি জানান, আদম তাঁর বোনকে চিকিৎসা দিয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুনরায় দেখা করার আকাঙ্ক্ষা এবং কাউকে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা আদমকে দ্বিধায় ফেলে। শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বার ওই নারী ফিরে এলে তিনি নিজের পরিচয় স্বীকার করেন। নারীটি তাঁকে বন্দিদশা থেকে পালাতে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন।
শৈশবের শহর থেকে যুদ্ধের পথে
আদমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এল-ফাশেরেই। ২০০৩ সালে দারফুরে নতুন করে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। দীর্ঘদিনের অবহেলা, বৈষম্য এবং তৎকালীন সুদানের কর্তৃত্ববাদী সরকারের দমননীতির পটভূমিতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সরকার-সমর্থিত জানজাওয়িদ বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রাম লুট, ধর্ষণ ও বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ ওঠে।
তবে শৈশবে আদমের কাছে যুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল অনেকটাই দূরের ঘটনা। এল-ফাশের ছিল সাহারা অঞ্চলের বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য শহরটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল। স্কুলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশুরা একসঙ্গে পড়ত। আদমের আগ্রহ ছিল ফুটবল ও গোয়েন্দা কাহিনিনির্ভর জাপানি অ্যানিমে সিরিজে।
পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল। বাবা-মায়ের দুজনেরই ভালো চাকরি ছিল। দুই বোনের সঙ্গে একটি প্রশস্ত বাড়িতে বেড়ে ওঠা আদম ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন থেকেই চিকিৎসক হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন।
২০১৪ সালে এল-ফাশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা পড়া শুরু করেন তিনি। তত দিনে সুদানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছিল, সরকারের সমালোচকদের নিখোঁজ হওয়ার খবর আসছিল। প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হলে আদমও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে কাঁদুনে গ্যাস, মারধর ও কারাবাসের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।
২০১৯ সালের এপ্রিলে গণআন্দোলনের মুখে আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন আদম ও তাঁর সহপাঠীরা একটি নতুন, গণতান্ত্রিক সুদানের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু সেই আশা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২১ সালে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ মিলে বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পড়াশোনাও বারবার ব্যাহত হয়। তবু ২০২২ সালের শেষ দিকে চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা শেষ করেন আদম।
চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব, যুদ্ধের মধ্যে নতুন জীবন
স্নাতক হওয়ার পরপরই আদম এল-ফাশেরের একটি শিক্ষণ হাসপাতালে কাজ শুরু করেন। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ ছিল সেখানে। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়।
প্রথম দিকে সংঘর্ষের মধ্যে আহত মানুষজন হাসপাতালে আসতে থাকেন। কয়েকটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীরা দক্ষিণ হাসপাতাল এবং সৌদি মাতৃসদন হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রের সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত থাকায় সাধারণ মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা হাসপাতাল সচল রাখতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা ওষুধ সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার কাজে যুক্ত হন।

আদমের বন্ধু ওয়াসিম, যিনি পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করতেন, তিনিও এই উদ্যোগে যোগ দেন। তাঁদের আরেক বন্ধু আবদুল্লাহ মানুষের কাছ থেকে অর্থ ও ওষুধ সংগ্রহ করতেন। অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা আয়েশাও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। যুদ্ধের মধ্যেই আবদুল্লাহ ও আয়েশার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
কয়েক মাস ধরে এল-ফাশের তুলনামূলকভাবে টিকে ছিল। দারফুরের গভর্নর মিননি মিনাউইয়ের বাহিনী প্রথমে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দেওয়ায় শহরটি বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভাগ হয়ে যায়। সেনাবাহিনী শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে, আরএসএফ পূর্ব অংশে এবং মিনাউইয়ের বাহিনী মাঝের একটি এলাকায় অবস্থান নেয়।
কিন্তু ২০২৩ সালের নভেম্বরে মিনাউই সেনাবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আতঙ্কিত মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করেন। সৌদি হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা পরিচালকও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিদায়ের আগে তিনি আদমকে হাসপাতালের দায়িত্বের একটি বড় অংশ গ্রহণ করতে বলেন।
তখন আদমের চিকিৎসকজীবলের বয়স মাত্র কয়েক মাস। প্রায় ৪০০ কর্মীর এই হাসপাতালটি ছিল ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের দারফুর অঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত মাতৃসদন। এত বড় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তিনি প্রথমে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে দ্রুত বুঝতে পারেন, কর্তৃত্ব দেখিয়ে নয়, সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেই তাঁকে কাজ করতে হবে।
তিনি নিজে হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করতেন, অভিজ্ঞ কর্মীদের পরামর্শ নিতেন এবং প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলতেন। তাঁদের বলতেন, হাসপাতালের প্রকৃত নেতৃত্ব তাঁদের হাতেই। ধীরে ধীরে সহকর্মীরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন। হাসপাতালই হয়ে ওঠে তাঁর বাড়ি। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে নিজের পোষা কুকুর বুলডোজকেও সেখানে নিয়ে আসেন তিনি।
এর কিছুদিন পর তাঁর বাবা-মা ও দুই বোন নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে শহর ছাড়েন। পরিবারের সদস্যদের শহরের প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আদম আবার হাসপাতালে ফিরে যান। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁরা নিরাপদে পৌঁছেছেন—এই খবর না পাওয়া পর্যন্ত কাজে মন দিতে পারেননি তিনি।
হাসপাতালে হামলা, মৃত্যুর মিছিল
২০২৪ সালে সংঘাত আরও তীব্র হয়। দারফুরের অন্য শহরগুলোতে আরএসএফের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক মানুষ হত্যার খবর আসতে থাকে। আদমের মা বারবার তাঁকে শহর ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আদম মনে করতেন, তিনি চলে গেলে রোগীদের দেখাশোনা করার মতো মানুষ থাকবে না।
একপর্যায়ে মাকে তিনি বলেন, এই শহরের মানুষের জন্যই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর কাছে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া শুধু পেশাগত দায়িত্ব ছিল না, ছিল নৈতিক অঙ্গীকার।
যুদ্ধের প্রথম দিকে হাসপাতালগুলোতে প্রধানত গুলিবিদ্ধ রোগী আসতেন। পরে ড্রোন ও আরও শক্তিশালী অস্ত্রের ব্যবহার বাড়লে আহতদের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের জুনে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৫০ জন আহত মানুষ সৌদি হাসপাতালে পৌঁছান। তাঁদের অনেকেই নারী ও শিশু; শরীরে বিস্ফোরণের ধাতব টুকরোর গভীর ক্ষত।
এর মধ্যেই খবর আসে, দক্ষিণ হাসপাতাল আরএসএফের দখলে চলে গেছে। সেখানকার চিকিৎসাকর্মীদের অনেকে গুলির মধ্যে দেয়াল টপকে পালিয়ে সৌদি হাসপাতালে আশ্রয় নেন। পরে জানা যায়, দক্ষিণ হাসপাতালে কয়েকজন রোগীকে তাঁদের শয্যাতেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের স্বজনদের মরদেহ পড়ে ছিল হাসপাতালের প্রবেশপথে। সামরিক বয়সী অনেক পুরুষকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ফলে সৌদি হাসপাতালই হয়ে ওঠে শহরের শেষ কার্যকর হাসপাতাল।
এরপর হাসপাতালের ওপর ড্রোন হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। ছোট ড্রোনের শব্দ শোনা যেত দূর থেকেই। বড় সামরিক ড্রোনগুলো বিমানসদৃশ শব্দ করে হাসপাতালের ওপর চক্কর দিত, তারপর বোমা ফেলত। হামলা থেকে বাঁচতে আদম ও তাঁর সহকর্মীরা মাটির নিচে পুঁতে রাখা বড় ধাতব কনটেইনারকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু সতর্কসংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সময়মতো সেখানে পৌঁছাতে পারতেন না।
একটি হামলায় হাসপাতালের ওষুধের গুদামে সরাসরি আঘাত লাগে। এতে আমনা নামের এক ফার্মাসিস্ট নিহত হন। চিকিৎসকদের থাকার ঘরেও চলত মৃত্যুর আশঙ্কা। তবু তাঁদের জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। হাসপাতালের একটি ছোট কক্ষ, যেখানে চারটি বিছানায় একসঙ্গে এক ডজনেরও বেশি মানুষ থাকতেন, হয়ে উঠেছিল তাঁদের মানসিক আশ্রয়।
সেখানে কেউ গান গাইতেন, কেউ নাচতেন, কেউ একসঙ্গে কফি খেতেন। যুদ্ধের মধ্যেই চিকিৎসক, পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ, নার্স ও ফার্মাসিস্টদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কয়েকটি বিয়েও হয়। এই ছোট ছোট আনন্দ তাঁদের অসহনীয় বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থাকার শক্তি দিত।
বিয়ের আনন্দের পাশেই মৃত্যু

আদমের বন্ধু আবদুল্লাহ ও আয়েশার প্রেমের গল্প হাসপাতালের কর্মীদের কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছিল। ২০২৪ সালে আরএসএফের সদস্যরা আয়েশার পরিবারের বাড়ি দখল করে নিলে তিনি আবদুল্লাহর মা জেইনাবের কাছে আশ্রয় নেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি বিপথগামী গুলি জেইনাবের বুকে আঘাত হানে। মৃত্যুর আগে তিনি আবদুল্লাহকে আয়েশার যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন।
কয়েক মাস পর তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে আবদুল্লাহ তাঁর মৃত মায়ের স্মরণে কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের অনুরোধ জানান। উপস্থিত সবাই কেঁদে ফেলেন। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত জরুরি চিকিৎসাকক্ষের এক পাশে নীল ও বেগুনি বেলুন ঝুলিয়ে, সুদানি প্রেমের গান বাজিয়ে তাঁরা আনন্দে মেতে ওঠেন।
আদমের মনে হয়েছিল, কিছুক্ষণের জন্য যেন যুদ্ধ বলে কিছু নেই। তাঁরা আর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অসহায় মানুষ নন; তাঁরা স্বাভাবিক জীবনের আনন্দ ফিরে পেয়েছেন।
কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই দিন পর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে আরএসএফ জামজাম বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির দখল করে। জাতিসংঘের হিসাবে, সেখানে অন্তত এক হাজার মানুষ নিহত হন; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। শিবিরের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে কাজ করতেন ২৬ বছর বয়সী চিকিৎসক মাহমুদ বাবিকির ইদ্রিস আদম। তিনি আবদুল্লাহ ও আয়েশার বিয়েতেও উপস্থিত ছিলেন। আরএসএফ সদস্যরা চিকিৎসাকেন্দ্রটি দখল করার পর মাহমুদসহ নয়জন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে।
এই খবর শুনে আদম কান্নায় ভেঙে পড়েন। যুদ্ধের পুরো সময়ে সেটি ছিল তাঁর বিরল কয়েকটি মুহূর্তের একটি, যখন তিনি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
অবরোধে ক্ষুধা, ওষুধের সংকট ও অসহায় চিকিৎসকেরা
জামজাম দখলের পর এল-ফাশের হয়ে ওঠে দারফুরে আরএসএফের শেষ বড় লক্ষ্য। শহরের চারপাশে মাটি ফেলে প্রতিরোধবেষ্টনী তৈরি করা হয়। অধিকাংশ সড়কে বসানো হয় তল্লাশিচৌকি। শহর থেকে বের হতে চাওয়া মানুষের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে সামরিক বয়সী পুরুষদের জন্য পালানো ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণকারী ইয়েল হিউম্যানিটারিয়ান ল্যাব এই অবরোধব্যবস্থাকে এমন একটি এলাকা হিসেবে বর্ণনা করেছিল, যেখানে মানুষকে আটকে রেখে হত্যা করা সহজ হয়ে ওঠে।
শহরে খাবারের অভাব চরমে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মের শেষ দিকে এক কেজি চালের দাম ৭৫০ ডলারেরও বেশি হয়ে যায়। এই পরিমাণ চাল দিয়ে হাসপাতালের প্রায় ১২ জন কর্মীর এক দিনের খাবারের ব্যবস্থা করা যেত। অনেক সময় চিকিৎসকদের খাবার বলতে থাকত চিনাবাদামের বর্জ্য গুঁড়ো করে তৈরি পশুখাদ্য। তাঁরা কয়েক সপ্তাহ ধরে একই কফির গুঁড়ো পুনর্ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ ক্ষুধার যন্ত্রণা কমাতে পেটের চারপাশে কাপড় বেঁধে রাখতেন।
যুদ্ধের শুরুতে আদমের ওজন ছিল ৮৮ কেজি। অবরোধের মধ্যে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৮ কেজিতে।
ওষুধের সংকটও ছিল ভয়াবহ। কয়েক বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য হন চিকিৎসকেরা। মেরুদণ্ডে প্রয়োগ করা অ্যানেসথেশিয়ার শেষ মজুতটির মেয়াদও ২০২১ সালে শেষ হয়েছিল। আরএসএফের সদস্যরা শহরে ওষুধ পাচারের অভিযোগে মানুষকে হত্যা করতেন। তারপরও কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওষুধ আনতেন।
সৌদি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানো এক বৃদ্ধ নিজের দুর্বল শরীর নিয়েই তিন দিন হেঁটে মরুভূমি পেরিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করতে যেতেন। আবার অ্যানেসথেশিয়ার সংকট দেখা দিলে কয়েকজন নারী প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের একটি শহরে গিয়ে কেটামিন সংগ্রহ করেন। পরে সেটি পোশাকের ভেতরে লুকিয়ে ফিরিয়ে আনেন।
এত কিছুর মধ্যেও চিকিৎসকেরা নিজেদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। নতুন আহত রোগী এলেই চিকিৎসক ইয়াসির কাজ শুরু করার আগে ঘোষণা করতেন, ‘জীবন সুন্দর!’ কথাটি ছিল তাঁদের ভয় ও হতাশার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ।
কিন্তু একসময় সেই মনোবলও ভেঙে পড়তে শুরু করে। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের কাছের একটি মসজিদে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মসজিদের ইমাম ছিলেন হাসপাতালের প্রশাসনিক পরিচালক মাহাসিনের স্বামী। তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে স্বামী ও দুই ছেলেকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজে পান। স্বামী ও দুই ছেলেকেই হারিয়ে তিনি কিশোরী মেয়েকে নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান।
হাসপাতালে তখন অস্ত্রোপচার করার মতো চিকিৎসক ছিলেন মাত্র দুজন। এরপরও আদম ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে শহরের অবশিষ্ট মানুষও পালাতে বাধ্য হবেন। অন্যদিকে, পালানোর পথও ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। ইয়াসিরের ভাই শহর ছাড়ার সময় একটি তল্লাশিচৌকিতে নিহত হন। আরেক স্বেচ্ছাসেবক চলে যাওয়ার পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অক্টোবরের মধ্যে হাসপাতালের মাতৃসদনের দেয়ালে বোমার আঘাতে বড় গর্ত তৈরি হয়। একই সময়ে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আবদুল্লাহ তখন গর্ভবতী স্ত্রী আয়েশাকে নিয়ে শহর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শহর ছাড়ার পথে নির্মমতা
২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর আবদুল্লাহ ও আয়েশা অন্য বেসামরিক মানুষের একটি দলের সঙ্গে শহর ছাড়েন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুদানের সেনাবাহিনীর সমর্থনে লিখেছিলেন। একটি তল্লাশিচৌকিতে আরএসএফের এক যোদ্ধা তাঁকে চিনে ফেলে এবং তাঁর পরিবারকে আলাদা করে।
এরপর সেই যোদ্ধা ছয় বছরের শিশুটিকে ধরে তার মায়ের সামনে গলা কেটে হত্যা করে। শিশুটির বাবা কিছুই করতে পারেননি। ছেলেকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণা নিয়েই তাঁকে বেঁচে থাকতে বলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
একই তল্লাশিচৌকিতে আয়েশাকে ডেকে পাঠানো হলে আবদুল্লাহ সামনে এগিয়ে যান। তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানান, তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী। আশ্চর্যজনকভাবে, আরএসএফের ওই যোদ্ধা তাঁদের চলে যেতে দেন। এমনকি শুভকামনাও জানান। আবদুল্লাহর কাছে ঘটনাটি ছিল অবিশ্বাস্য। এত দিনের যুদ্ধের মধ্যে প্রথমবার তিনি প্রতিপক্ষের একজন যোদ্ধার কাছ থেকে মানবিক আচরণ দেখতে পান।
এদিকে সৌদি হাসপাতালে থাকা আদম ও তাঁর সহকর্মীরা শহর ছাড়বেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, একসঙ্গে থেকে যাওয়া কিংবা একসঙ্গে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়াই ভালো। ভোটে অধিকাংশই থাকার পক্ষে মত দেন। আদমও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। রোগীদের আরএসএফের হাতে ফেলে যাওয়ার কথা তিনি ভাবতে পারছিলেন না।
কিন্তু সেদিন রাতে হাসপাতালের দেয়াল কাঁপিয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে ঘুরে ঘুরে আদম নীরবে বিদায় নেন। বুলডোজকে আদর করেন। মনে হচ্ছিল, এটাই হয়তো তাঁর শেষ রাত।
ভোরের আগে আলী নামের এক ফার্মাসিস্ট আবার সবাইকে ডেকে বলেন, শহর ছাড়ার বিষয়ে নতুন করে ভোট হওয়া উচিত। এবার আদম রাজি হন। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তাঁরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়েন। আদমের সঙ্গে ছিল মাত্র এক বোতল পানি ও তাঁর প্রিয় সুগন্ধি রোজ টোব্যাকো।
রাস্তায় আতঙ্কিত মানুষের ঢল। মায়েরা শিশুদের কোলে নিয়ে ছুটছেন, কেউ গাধার পিঠে, অধিকাংশই হেঁটে পশ্চিম দিকে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ, পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে আরএসএফের সদস্যরা শহরে ঢুকে পড়ছিলেন। তাঁরা লুটপাট ও গুলি চালাতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষের ওপরও হামলা হয়। অনেক পরিবারকে বন্দুকের মুখে মাটিতে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়; কোথাও সাঁজোয়া যান দিয়ে মানুষকে পিষে ফেলার অভিযোগও ওঠে।
পরে প্রকাশিত ভিডিওতে আরএসএফের এক কমান্ডারকে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করতে দেখা যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছেন।
বন্দিদের চিকিৎসা, কলেরা মোকাবিলা ও পালিয়ে বাঁচা
শহর ছাড়ার পথে আদম ও তাঁর সহকর্মীদের আরএসএফ সদস্যরা আটক করেন। বিশৃঙ্খলার মধ্যে তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আদমকে নিয়ে যাওয়া হয় মরুভূমির ধারের সেই পরিত্যক্ত স্কুলে। অবরোধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম তাঁর সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়।
ওয়াসিম, আলী ও ইয়াসিরকে রাখা হয় পরিত্যক্ত শিশু হাসপাতালে, যেখানে হাজার হাজার বন্দি আটক ছিলেন। সেখানে তিন দিন প্রায় পানি ছিল না। তৃষ্ণায় কয়েকজন মারা যান। পরে পানি আনা হলে বন্দিরা হুড়োহুড়ি করে ছুটে যান। এ সময় এক যোদ্ধার গুলিতে তিনজন নিহত হন। তীব্র তৃষ্ণায় কেউ কেউ পয়োনিষ্কাশনের ট্যাংক থেকে নোংরা পানি তুলেও পান করতে শুরু করেন। দ্রুত কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
রোগ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে আরএসএফের সদস্যরা বন্দিদের মধ্যে কোনো চিকিৎসক আছেন কি না, তা জানতে চান। চিকিৎসকদের সামনে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। দলের সদস্যরা বুঝতে পারছিলেন না, এটি তাঁদের হত্যা করার ফাঁদ কি না। কিন্তু অন্য বন্দিদের বাঁচানোর সুযোগও তাঁরা হাতছাড়া করতে চাননি।
অবশেষে সৌদি হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীরা এগিয়ে আসেন। ভাঙা চেয়ার ও ডালপালা দিয়ে কলেরায় আক্রান্ত রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করেন। সীমিত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা চালান। প্রায় ১০ দিনের চেষ্টায় তাঁরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তবে তত দিনে প্রায় ২০০ মানুষ মারা গিয়েছিলেন।
এরপর আরএসএফ তাঁদের আবার সৌদি হাসপাতালে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকেরা একটি ছোট ছেলেকে কাঁদতে দেখেন। সে জানায়, তার বাবা-মা দুজনই রোগী ছিলেন এবং চিকিৎসকেরা চলে যাওয়ার পর আরএসএফের সশস্ত্র সদস্যরা তাঁদের হত্যা করেছে। জাতিসংঘের পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালটি দখলের সময় প্রায় ৪৬০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন শয্যায় থাকা রোগী।
কয়েক সপ্তাহ পর ওয়াসিম, আলী ও ইয়াসির ছোট ছোট গ্রামের মধ্য দিয়ে ঘুরপথে চাদ সীমান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু আদমের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ কাটছিল না।
অন্যদিকে, পরিত্যক্ত স্কুলে বন্দি আদমের কাছে ফিরে আসেন সেই নারী, যিনি তাঁকে চিনেছিলেন। তিনি পালানোর একটি পরিকল্পনা জানান। প্রহরীদের বলার কথা বলেন, আদমের শৌচাগারে যাওয়া প্রয়োজন। এরপর ভবনের পেছনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
আদম নির্দেশনা অনুসরণ করেন। নারীটি তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখেন। সেখানে তিনি ২০ দিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে রাতের অন্ধকারে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতে থাকেন। প্রতিবার আশ্রয়দাতাদের অনুরোধ করতেন, সামনে কোথাও এমন কাউকে খুঁজে দিতে, যিনি তাঁকে সাহায্য করতে পারবেন। কখনো কোনো সহানুভূতিশীল চালক তাঁকে গাড়িতে তুলে নিতেন।
এভাবে প্রায় এক মাসের পথ পাড়ি দিয়ে তিনি খার্তুমে পৌঁছান। বন্ধুদের খবর জানার জন্য তিনি ব্যাকুল ছিলেন। কিন্তু আরএসএফ তাঁকে খুঁজে বের করতে পারে—এই ভয়ে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে হাসপাতালের এক স্বেচ্ছাসেবককে খুঁজে পান। তাঁকে শুধু লিখেছিলেন, ‘আমি আদম। আমি বেঁচে আছি।’
ধ্বংসস্তূপের শহর, বেঁচে থাকা মানুষের স্মৃতি
এখন এল-ফাশের প্রায় জনশূন্য এক শহর। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, একসময়ের ব্যস্ত বাজারের জায়গায় ঘাস জন্মেছে। সৌদি হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী এখনো নিখোঁজ। বেঁচে যাওয়া চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন। অনেকেই ঘুমাতে পারেন না, দুঃস্বপ্নে বারবার ফিরে যান সেই দিনগুলোতে। এক নারী এখনো স্বপ্নে দেখেন, তাঁকে মৃতদেহে ভরা একটি নালা পার হতে হচ্ছে।
আদম এখনো নিরাপত্তার কারণে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে চান না। যুদ্ধের পর তাঁর সঙ্গে দেখা করা মানুষেরা জানান, তিনি এখনো সহকর্মীদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন। কেউ ওষুধ চান, কেউ চাকরি খোঁজেন, কেউ অর্থের জন্য যোগাযোগ করেন। এসব বার্তা তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কিন্তু তিনি নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না।
কারণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর পরিচয়। তিনি যদি সাহায্য না করেন, তাহলে তিনি আর কে থাকবেন?
আদমের কাছে অবরুদ্ধ শহরের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এক ধরনের বিষণ্ন নস্টালজিয়া তৈরি হয়। অবশ্যই তিনি ক্ষুধা, বোমা, মৃত্যু কিংবা সহকর্মীদের হারানোর স্মৃতিতে ফিরে যেতে চান না। কিন্তু সেই সময়ের পারস্পরিক নির্ভরতা, একসঙ্গে লড়াই করা এবং একটি পরিবারের মতো বেঁচে থাকার অনুভূতিকে ভুলতেও পারেন না।
যুদ্ধের মধ্যে তাঁরা জানতেন, তাঁদের কাজের উদ্দেশ্য আছে। একজন আহত মানুষকে বাঁচানো, একটি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া কিংবা সহকর্মীর মনোবল ফিরিয়ে আনা—এসব ছোট কাজই তাঁদের জীবনের অর্থ হয়ে উঠেছিল।
আদমের ভাষায়, তিনি এখনো যেন পুরোপুরি এল-ফাশের ছেড়ে আসতে পারেননি। তাঁর আত্মা রয়ে গেছে সেই শহরে। শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও এর মানুষ যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন এল-ফাশেরও পুরোপুরি ধ্বংস হবে না।












