ভারতের বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগ শুনতে প্রস্তুত দেশটির সরকার। একই সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। সুপ্রিম কোর্টে বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর করা চ্যালেঞ্জের পর বুধবার প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান প্রকাশ্যে আসে।
বুধবার বৈষ্ণব বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ভারতের সংবিধানে সুরক্ষিত এবং তা ক্ষুণ্ন করার কোনো অভিপ্রায় সরকারের নেই। সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি জানান, তাঁদের পরামর্শ শুনতে সরকার আগ্রহী। কোনো বিষয়ে সংশয় থাকলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য আইনটি ঘোষণা করে। এর আওতায় মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বাড়ানো হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমকে আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়নি। এ নিয়ে প্রকাশক ও সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
মুকেশ আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮ এবং গৌতম আদানির এনডিটিভিসহ ২১টি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশক আইনটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, আইনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র শনাক্ত করার সুযোগ করে দিতে পারে সরকারকে।
মঙ্গলবার আদালতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যুক্তি দেন, প্রতিবেদনে যাঁদের বিষয়ে লেখা হবে, তাঁদের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। তাঁদের মতে, এই বিধান কার্যত সংবাদ প্রকাশের আগেই নিয়ন্ত্রণ আরোপের শামিল হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদকক্ষের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।
সংবাদমাধ্যমগুলোর মূল উদ্বেগ হলো, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি আইনটি সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী কার্যক্রমে কীভাবে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির আগে তাঁর সম্মতি নেওয়ার শর্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রচলিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে বলে প্রকাশকদের আশঙ্কা।
আদালতের জবাব চাওয়ার সময়সীমা
আইনটির বিরুদ্ধে করা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে জবাব দিতে বলেছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের আপত্তি এবং সরকারের অবস্থান—দুই দিক থেকেই পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে যাচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, দেশটির অনেক মূলধারার সংবাদমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ড যথেষ্ট কঠোরভাবে পর্যালোচনা করছে না। তবে ভারত সরকার বলে আসছে, তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করে।
আইনটি নিয়ে চলমান বিরোধ তাই শুধু ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিধানেই সীমাবদ্ধ নয়; অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সম্পাদকদের পরামর্শ গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, সংবাদমাধ্যমগুলোর উদ্বেগ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হবে পরবর্তী পদক্ষেপে।
ভারতের এই আইনি বিরোধে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকারের জবাব এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়েই মূলত বিতর্ক চলছে।












