ঢালিউডের তারকা দম্পতি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে ঘিরে বিচ্ছেদের গুঞ্জন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবন এবং তাঁদের পারিবারিক জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বলা হচ্ছে, তাঁরা আলাদা থাকছেন। কোথাও আবার দাবি করা হচ্ছে, তাঁদের সংসার ভেঙে যাওয়ার পথে।
কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কতটা? এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের বিচ্ছেদের কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই। বরং ফারুকী প্রকাশ্যে এই খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ঘটনাটি তাই শুধু একটি তারকা দম্পতির ব্যক্তিগত সম্পর্কের খবর নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জনপরিসরে বিচার বসানোর প্রবণতাকেও সামনে এনেছে।
গুঞ্জনের শুরু কোথায়?
অক্টোবরের শুরু থেকে ফারুকী ও তিশার দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পোস্ট ছড়াতে থাকে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ির মালিকানা ও সেটি বিক্রি নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের কথা প্রচার করা হয়। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, এই বিরোধ থেকেই তাঁদের বিচ্ছেদ হয়েছে।
এমনকি তিশার একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের ভিডিও সম্পাদনা করে এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক তথ্য যাচাইয়ে দেখা যায়, ফারুকী ও তিশার বিচ্ছেদ এবং অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি নিয়ে বিরোধের দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তিশার যে সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রচার করা হয়েছিল, সেটি ২০২৪ সালের ১৯ জুন মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘রাঙা সকাল’ অনুষ্ঠানের। সেখানে তিনি বাবার মৃত্যু নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সেই অংশ সম্পাদনা করে ভিন্ন অর্থে প্রচার করা হয়।
ওই সাক্ষাৎকারে ফারুকীর বিরুদ্ধে নির্যাতন, পরকীয়া কিংবা সম্পত্তি দখলের অভিযোগ করেননি তিশা। বরং সেখানে তিনি স্বামীর প্রশংসা করেছিলেন। বিচ্ছেদের দাবির পক্ষেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফারুকীর প্রতিক্রিয়া: ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না
গুঞ্জন নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর ২৪ ও ২৫ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা বাড়ে। এ সময় ফারুকী সরাসরি বিচ্ছেদের খবর অস্বীকার করেন।
২৫ অক্টোবর এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এসব খবরের কোনো ভিত্তি নেই। এ নিয়ে কথা বলার আগ্রহও তাঁর নেই। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, মিথ্যা খবর নিয়ে বারবার আলোচনা করলে সেটি আরও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
একই সময়ে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগও করেন এই নির্মাতা। তাঁর দাবি, একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে উল্লাস প্রকাশ করছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
২৫ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে তাঁর বিচ্ছেদের খবর অস্বীকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
তবে তিশার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর এই নীরবতাকে বিচ্ছেদের স্বীকৃতি হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই।
২৯ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে ফারুকীর বিচ্ছেদের খবরকে মিথ্যা বলার বিষয়টি উঠে আসে। তিনি ব্যক্তিগত বিতর্কের পরিবর্তে নিজের চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাণের কাজ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী বলে জানান।
১৬ বছরের দাম্পত্য ও দীর্ঘ সম্পর্ক
ফারুকী ও তিশার সম্পর্ক বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত সম্পর্কগুলোর একটি। ২০১০ সালের ১৬ জুলাই তাঁদের বিয়ে হয়। এর আগে তাঁদের মধ্যে প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২২ সালে তাঁদের মেয়ে ইলহাম নুসরাত ফারুকীর জন্ম হয়।
তিশা টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘টেলিভিশন’, ‘অস্তিত্ব’, ‘ডুব’, ‘হালদা’, ‘মায়াবতী’ ও ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘হালদা’ ও ‘অস্তিত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন।
অন্যদিকে ফারুকী বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকের পরিচিত নির্মাতা। ‘ব্যাচেলর’, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘টেলিভিশন’ ও ‘ডুব’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি পেশাগত পরিচয়ও দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন কেন এত আলোচনার বিষয়?
তিশা-ফারুকীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের একটি পরিচিত প্রবণতাকে সামনে এনেছে। কোনো তারকা দম্পতির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা ব্যাখ্যা, অনুমান ও পাল্টা দাবি।
অনেক সময় একটি ছবি, একসঙ্গে উপস্থিত না থাকা কিংবা দীর্ঘদিন কোনো পারিবারিক ছবি প্রকাশ না করাকেও সম্পর্কের অবনতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ এসবের কোনোটিই একা বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য সংকটের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়।
এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তারকাদের পরিচিতি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে জনআলোচনার অংশ করে তুললেও তাঁদের দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ঘটনা জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতা নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় যাচাই না করা খবর, পুরোনো সাক্ষাৎকারের খণ্ডিত অংশ এবং সম্পাদিত ভিডিও অনেক সময় বাস্তব ঘটনার চেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করে। তিশা-ফারুকীকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি, নির্যাতন ও বিচ্ছেদের যে দাবি ছড়িয়েছিল, তার একটি অংশ মনগড়া ও বিকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ছড়ানো হয়েছিল।
বিচ্ছেদ, নাকি নিছক গুঞ্জন?
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, তিশা ও ফারুকীর বিচ্ছেদ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ফারুকী এই খবরকে ভিত্তিহীন বলেছেন। তিশার পক্ষ থেকেও বিচ্ছেদের কোনো ঘোষণা আসেনি। তাঁদের আলাদা থাকার দাবির পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
তাই এই মুহূর্তে ঘটনাটিকে বিচ্ছেদের খবর না বলে বিচ্ছেদ নিয়ে ছড়ানো গুঞ্জন বলাই সঠিক।
একটি তারকা দম্পতির সংসার ভাঙার খবর মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে। কিন্তু কৌতূহল আর তথ্য এক বিষয় নয়। তিশা ও ফারুকীর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী, সেটি তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব সেই ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া খবরের সত্যতা যাচাই করা—গুঞ্জনকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা নয়।












