একসময় শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত খুলনায় এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। প্রকাশ্যে গুলি, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত নগরজীবনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী—কেউই নিজেদের পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না। চাঁদা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি, আর চাঁদা দিলে বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
খুলনার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন ছিনতাই বা ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
১০ মাসে ৭১ জন নিহত, গুলিতে প্রাণ গেছে ২৩ জনের
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭১ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৩ জন আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩৪টি হত্যা মামলায় ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩৫টি হত্যা মামলায় প্রাণ গেছে আরও ৩৫ জনের। অর্থাৎ, অপরাধের এই চিত্র শুধু মহানগরে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো খুলনা অঞ্চলেই নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
২২ অক্টোবর মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে নগরীতে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে নিয়ে আসে। সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলিতে নিহত হন তাওহিদুল ইসলাম। সন্ধ্যায় জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন খুশি আক্তার। পুলিশি তদন্তে দুটি ঘটনার সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও অপরাধী গোষ্ঠীর বিরোধের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অপরাধের জগতে একাধিক বাহিনী
খুলনায় অন্তত নয়টি অপরাধী গোষ্ঠীর নাম বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমা বাহিনী, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর তৎপরতা খুলনা সদর, লবণচরা, হরিণটানা, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকায় বিস্তৃত। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এসব বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিভিন্ন অপরাধে কোনো ব্যক্তির নাম আসা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব ঘটনায় তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদাবাজির নতুন কৌশল, রহস্যময় নবাব
খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ে আলোচনায় এখন বি-কোম্পানি এবং ‘নবাব’ নামটি বিশেষভাবে উঠে আসছে। পাড়া-মহল্লায় এজেন্টের মাধ্যমে বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে নগরীর ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে বহুতল বাড়ির মালিকদের লক্ষ্য করে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চাঁদা দিতে সম্মত হলে সংশ্লিষ্ট বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট পাঠানো হয়। অন্যদিকে, চাঁদার দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ফোনে হুমকি, নজরদারি এবং প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বি-কোম্পানির পরিচয় ব্যবহার করে অন্য অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্যরাও বিভিন্ন এলাকায় চাঁদা দাবি করছে। ফলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু নগরীর বাড়ির মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২৭ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদ এবং পাইকগাছা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অর্থ দাবি করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের বি-কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও পুলিশের অভিযান
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, খুলনা মহানগরে অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানগর এলাকায় ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৩৩টি গুলি উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ৬ থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত আট দিনের বিশেষ অভিযানে জেলা পুলিশ ২৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় ৬৮৮টি ইয়াবা, ৫ দশমিক ৯০৫ কেজি গাঁজা, ২০ লিটার দেশি মদ এবং একটি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের বড় অংশের সঙ্গে মাদকসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে। নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগে অপরাধীরা দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যেতে পারে বলেও পুলিশের ধারণা।
অভিযান নয়, প্রয়োজন অপরাধের নেটওয়ার্ক ভাঙা
খুলনার পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শুধু গ্রেপ্তার বা সাময়িক অভিযান দিয়ে অপরাধের বিস্তার রোধ করা কঠিন। মাদক ও অস্ত্রের সরবরাহ, চাঁদাবাজির অর্থের প্রবাহ, অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং বিভিন্ন এলাকায় তাদের সহযোগী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা জরুরি।
পাশাপাশি জামিনে মুক্তির পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ উঠলে সেগুলোর দ্রুত তদন্ত করতে হবে। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ যেন ভয় ছাড়াই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
খুলনার মানুষের প্রত্যাশা, শহরের নিরাপত্তার ওপর অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। রাতের রাস্তায় চলাচল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কিংবা নিজের বাড়িতে বসবাসের জন্য কাউকে চাঁদা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রকৃত মাপকাঠি হবে শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপদে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা।












