প্রায় চার বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুক দ্বীপপুঞ্জে আটকে আছেন শ্রীলঙ্কার ৫০ বছর বয়সী নারী রুচিরা রানাসিংহে। দেশে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু একের পর এক ট্রানজিট ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় কোনোভাবেই শ্রীলঙ্কায় ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, আগামী নভেম্বরে তাঁর একমাত্র ছেলের বিয়ে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও এখনো নিশ্চিত নন, ছেলের বিয়েতে যোগ দিতে পারবেন কি না। অসুস্থ মায়ের কাছেও ফিরতে পারছেন না তিনি।
রুচিরার ভাষায়, দেশে ফিরতে যা যা করতে বলা হবে, তিনি সবই করতে রাজি। এমনকি হাতকড়া পরিয়ে, চোখ বেঁধে ও মুখ বন্ধ করে তাঁকে বিমানে তুললেও আপত্তি নেই। তাঁর একমাত্র চাওয়া, নিজের দেশে ফিরে যাওয়া।
কীভাবে বিদেশে গিয়ে আটকে পড়লেন
২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কায় নিজের ছোট টি-শার্ট তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশ ছাড়েন রুচিরা। ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ায় ঋণের চাপ সামলাতে পারছিলেন না তিনি। পরে হংকংয়ে গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। সেখানে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের দেখাশোনা করতেন।
এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডে যান তিনি। প্রথমে দুই মাসের ভ্রমণ ভিসায় সেখানে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু দেশে ঋণদাতাদের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেন।
আবেদন করার পর তাঁকে এক বছরের জন্য কাজের অনুমতি দেওয়া হয়। একটি রেস্তোরাঁয় চাকরিও পান। পরে ওই প্রতিষ্ঠান তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি কাজের ভিসার ব্যবস্থা করে দিতে আগ্রহ দেখায়।
কিন্তু নিউজিল্যান্ডে আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় অন্য ধরনের ভিসার আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।
ভুল পরামর্শে বাড়ে বিপদ
এরপর একটি অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রুচিরা। প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে জানায়, নিউজিল্যান্ডের বাইরে গিয়ে নতুন করে কাজের ভিসার আবেদন করলে অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সেই পরামর্শ অনুযায়ী তিনি কুক দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভেবেছিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন ভিসা নিয়ে আবার নিউজিল্যান্ডে ফিরতে পারবেন।
কিন্তু তাঁর কাজের ভিসার আবেদন আবারও প্রত্যাখ্যাত হয়। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ায় আগের আশ্রয়-সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্তও ভঙ্গ হয়। ফলে দেশটির কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে তাঁকে আর ভিসা না দেওয়ার অবস্থান জানায়।
অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্নভাবে সহায়তার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত রুচিরাকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু তখনই শুরু হয় নতুন জটিলতা।
ট্রানজিট ভিসা না পাওয়ায় বন্ধ সব পথ
শ্রীলঙ্কায় ফেরার জন্য রুচিরা নিউজিল্যান্ড হয়ে বিমানে যাওয়ার টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন, নিউজিল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসা ছাড়া বিমানে ওঠা সম্ভব নয়।
এরপর তিনবার নিউজিল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসার আবেদন করেন তিনি। প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যাত হয়। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, তিনি নিউজিল্যান্ডে প্রবেশের সুযোগ পেলে আবার আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার ট্রানজিট ভিসার জন্যও চারবার আবেদন করেছিলেন রুচিরা। সেখানেও অনুমতি মেলেনি।
কুক দ্বীপপুঞ্জ থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্য দুটি সম্ভাব্য পথ তাহিতি ও হাওয়াই। কিন্তু সেখানেও যেতে হলে আগে নিউজিল্যান্ডে উপস্থিত হয়ে আঙুলের ছাপসহ প্রয়োজনীয় জৈবিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। অথচ নিউজিল্যান্ডেই প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন না তিনি।
এভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার প্রতিটি পথই তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
দ্বীপের মানুষের সহায়তায় চলছে জীবন
কুক দ্বীপপুঞ্জ পর্যটকদের কাছে সুন্দর সমুদ্রসৈকত, সবুজ পাহাড় ও আগ্নেয়গিরির জন্য পরিচিত। কিন্তু রুচিরার কাছে এই দ্বীপ এখন এক অনিচ্ছাকৃত বন্দিজীবনের নাম।
তবে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় কোনোভাবে দিন কাটছে তাঁর। যে হোটেলে তিনি অবস্থান করছেন, সেটির কর্তৃপক্ষ কর্মীদের থাকার জায়গায় তাঁকে বিনা খরচে থাকার সুযোগ দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁকে খাবার ও পোশাক দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
হোটেলের একজন পরিচালক তাঁকে একটি সেলাই মেশিনও দিয়েছেন। সেটি ব্যবহার করে কিছু আয় করার চেষ্টা করছেন রুচিরা।
তবু এই সহযোগিতা তাঁর দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কমাতে পারছে না। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তাঁর স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞের চোখে জটিলতার কারণ
নিউজিল্যান্ডের একজন অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞের মতে, রুচিরা সম্ভবত গুরুতর ভুল অভিবাসন পরামর্শের শিকার হয়েছেন। আশ্রয়ের আবেদন করার পর অন্য ভিসার জন্য আবেদন এবং দেশ ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য আইনি পরিণতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি ছিল।
তাঁর মতে, অভিবাসন পরামর্শ দেওয়ার নামে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় আইনগত জ্ঞান ছাড়াই মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে আবেদন জমা দেয়। এতে আবেদনকারীরা বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন।
রুচিরাও জানিয়েছেন, ওই প্রতিষ্ঠানের পেছনে তিনি নিউজিল্যান্ডের কয়েক হাজার ডলার খরচ করেছেন।
নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রুচিরার একাধিক ট্রানজিট ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কারণ, তিনি নিউজিল্যান্ড হয়ে অন্য দেশে যাওয়ার পর নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাবেন—এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে পারেনি।
এমনকি তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে বা নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে বিমানে নেওয়ার প্রস্তাবও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও কেউ আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন।
দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা
রুচিরার পরিবারও তাঁকে দেশে ফেরানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছে। তাঁর ভাই জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু এখনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।
তবে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে শ্রীলঙ্কার হাইকমিশন এবং সংশ্লিষ্ট নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ চলছে।
এদিকে রুচিরার মা অসুস্থ। ছেলের বিয়েও সামনে। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তায় তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাঁর ভাইয়ের আশঙ্কা, বোনের মানসিক অবস্থা এখন ভালো নেই। একবার কথোপকথনের সময় রুচিরা এমন কথাও বলেছেন, তাঁকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত তাঁর মরদেহ যেন দেশে পাঠানো হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপে আটকে থাকা রুচিরার জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কবে তিনি নিজের দেশে ফিরতে পারবেন এবং পরিবারের সঙ্গে আবার দেখা হবে।












