একদিকে কমছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অন্যদিকে বাড়ছে ডলারের দাম। আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগেও বাজারে ডলারের দাম কমছে না।
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের আমদানি বিল বাবদ ১৬৪ কোটি ডলার পরিশোধের পর গত বৃহস্পতিবার দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ নেমে আসে ২৯ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে।
এর আগের দিন বুধবার মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এক দিনে আকুর বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভ থেকে বড় অঙ্কের ডলার কমে গেছে।
একই সময়ে ডলারের দামও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায়। আমদানি দায় পরিশোধে দর উঠেছে ১২৪ টাকা ৮০ পয়সায়। অন্যদিকে বুধবার খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১২৯ টাকায়। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে ডলার কিনতে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।
রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না দাম
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে সম্প্রতি আবারও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বুধবার নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১০ কোটি ডলার বিক্রি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত সপ্তাহে বিক্রি করা হয়েছিল ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
তবে বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এসব উদ্যোগে ডলারের দামে বড় প্রভাব পড়ছে না। ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৮০ কোটি ডলারের চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেছে মাত্র ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
গত মঙ্গলবার আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়। ব্যাংকারদের ধারণা, ব্যাংকগুলোর প্রস্তাবিত দর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি থাকায় ওই নিলামে ডলার বিক্রি করা হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি বন্ধ রাখা এবং বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ায় রিজার্ভে উন্নতি দেখা যায়। চলতি বছরের ২৯ জুন প্রথমবারের মতো মোট রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। গত ১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এরপর থেকে রিজার্ভ কমতে শুরু করে।
আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার।
এ সময়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ এফওবি মূল্যে আমদানি ব্যয় ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম জানান, জুলাই-আগস্টে আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রপ্তানি আয় না বাড়ায় দুই খাতের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেশি থাকায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় ডলারের বাজারে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পেট্রোবাংলার বৈদেশিক বিল পরিশোধের চাপও ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ৮০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে। একই মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি ঋণপত্র।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়েও প্রত্যাশিত গতি নেই
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসী আয় ও রপ্তানি। দুই খাত থেকেই অর্থ আসছে, তবে আমদানি ব্যয়ের তুলনায় তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় ডলারের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২৭৭ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৭ কোটি ডলারে। তবে আগের কয়েক মাসের তুলনায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। এর আগে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস ৩০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আগের তুলনায় কমেছে। রপ্তানি আয়ও আশানুরূপ নয়। এর সঙ্গে সরকারি আমদানি ঋণপত্রের বিল পরিশোধের বাড়তি চাপ যুক্ত হয়েছে। ফলে ডলারের দাম বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল ৮২১ মিলিয়ন ডলার।
খোলাবাজারে প্রতি ডলার ১২৯ টাকা
ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি খোলাবাজারেও ডলারের দাম বেড়েছে। গত বুধবার সেখানে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১২৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় দর ছিল ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা।
ব্যাংকারদের মতে, বিদেশে চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভ্রমণের জন্য নগদ ডলারের চাহিদাও খোলাবাজারের দামে প্রভাব ফেলছে। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে খোলাবাজারে দরের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানি চেঞ্জার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ প্রতি ডলার ১২৮ টাকা ১০ পয়সার বেশি দামে বিক্রি না করার নির্দেশনা দিয়েছে। এর বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও খোলাবাজারে ১২৯ টাকা দরে ডলার বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ডলারের বাজারে সামনে আরও চাপের আশঙ্কা
অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য না ফিরলে রিজার্ভ এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেশি থাকলে এবং প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ডলারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডলারের দাম বাড়লে আমদানি করা জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, চিনি, ডাল ও শিল্পের কাঁচামাল কেনার খরচ বেড়ে যায়। আমদানিকারকেরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে ভোক্তাদের ওপর। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানার কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়ানো, রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বাড়ানোও জরুরি।
কারণ, ডলারের চাহিদা মেটাতে একদিকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি দায় পরিশোধে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












