০৮:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেরিতে ফুটলেও ফুল ফোটে: শেখার কোনো বয়স নেই বিরামপুর সীমান্তে ১২ থেকে ১৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবি-গ্রামবাসীর বাধায় পিছু হটল বিএসএফ নতুন ছাঁটে চমকে দিলেন কনর স্টোরি, ক্রিয়েটিভ আর্টস এমিসে আত্মপ্রকাশ ‘বাজকাট’ লুকে জঙ্গলে মিলল নিখোঁজ যুবকের কঙ্কাল, পোশাক দেখে শনাক্ত করলেন বাবা কৃষিকে বদলে দিতে বিশ্বব্যাংকের ‘এগ্রিকানেক্ট’, লক্ষ্য ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক সাইফুর রহমানের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র, তদন্ত চান রিজভী শরতের ফ্যাশনে জেন বারকিনের পুরোনো ছবিই আজকের নতুন অনুপ্রেরণা শরতের সাজে সুয়েড জ্যাকেট, ৬ দারুণ স্টাইলিং আইডিয়া সিয়ারা মা হচ্ছেন পঞ্চমবার, রাসেল উইলসনের সঙ্গে আসছে নতুন অতিথি ভেনিসে আবারও আলোচনায় ব্রুকলিন-নিকোলা, পুরোনো বিরতির পর ফিরলেন আলোয়

শুনসাকু তামিয়ার অবদান: ক্ষুদ্র প্লাস্টিক মডেলকে বাস্তবতার ছোঁয়ায় বিশ্বজোড়া খ্যাতি

বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধার বন্যা
১৮ জুলাই ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন প্লাস্টিক মডেল জগতের কিংবদন্তি শুনসাকু তামিয়া। মৃত্যুর এক মাস পরও তাকে নিয়ে শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ থেমে নেই। জাপানের শিজুওকা শহরে তামিয়া ইনকর্পোরেটেডের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিদিন মানুষ সমবেদনা বইতে স্বাক্ষর করছেন। কেউ খেলনা গাড়ি, কেউ যুদ্ধজাহাজ বা ট্যাঙ্কের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দিয়ে তার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা জানাচ্ছেন।

মডেল জগতের বিপ্লবী
প্রায় সাত দশকের নেতৃত্বে শুনসাকু তামিয়া ক্ষুদ্র প্লাস্টিক অংশ জোড়া লাগিয়ে বাস্তবসম্মত প্রতিরূপ তৈরির সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেন। জাপানে ‘প্লামো’ নামে পরিচিত এই শখকে তিনি শিল্পে রূপ দেন এবং দেশটিকে প্লাস্টিক মডেলের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রারম্ভিক যাত্রা
১৯৪৬ সালে তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত “তামিয়া শোজি”-তে যোগ দেন, যা মূলত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। সাত বছর পর প্রতিষ্ঠানটি কাঠের মডেল তৈরিতে মনোযোগ দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্লাস্টিক মডেলের আগমন দেখে তামিয়া পুরোপুরি এই শিল্পে প্রবেশ করেন।

১৯৬০ সালে বাজারে আসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্লাস্টিক মডেল কিট—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধজাহাজ ইয়ামাতোর ১/৮০০ স্কেল প্রতিরূপ। এরপর ১৯৬২ সালে জার্মান প্যান্থার ট্যাঙ্কের ১/৩৫ স্কেল মডেল বিপুল সাড়া তোলে, যা চলন্ত মোটর সংযুক্তির কারণে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

নিখুঁত বাস্তবায়নের সাধনা
তামিয়া নিখুঁততা অর্জনে কখনো ছাড় দেননি। এক পর্যায়ে তিনি বাস্তব একটি পোর্শে ৯১১ কিনে তা টুকরো টুকরো করে খুলে প্রতিটি যন্ত্রাংশ গভীরভাবে পরীক্ষা করেন। এমনকি যেসব অংশ মডেলে দৃশ্যমান নয়, সেগুলোর নকশাতেও তিনি যথাযথ মনোযোগ দেন।

১৯৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত অ্যাবারডিন ট্যাঙ্ক জাদুঘরে গিয়ে দু’দিনে ৩ হাজার ছবি তোলেন। এগুলো থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত ১/২৫ স্কেলের ট্যাঙ্ক সিরিজ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবন্দি সোভিয়েত ট্যাঙ্ক দেখতে তিনি ইসরায়েল ভ্রমণ করেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৬৮ সালে জার্মানির নুরেমবার্গ আন্তর্জাতিক খেলনা মেলায় তামিয়ার হোন্ডা এফ১ কার মডেল প্রদর্শিত হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা পায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তামিয়ার নাম ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৬ সালে কোম্পানি উন্মোচন করে ব্যাটারিচালিত ১/১২ স্কেলের পোর্শে ৯৩৪ টার্বো আরসি মডেল। এটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং রেডিও কন্ট্রোলড মডেলের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

শিশুদের জন্য উদ্ভাবন
১৯৮২ সালে শিশুদের জন্য সুলভ মূল্যে “মিনি ৪ডব্লিউডি” সিরিজ চালু করেন তামিয়া। ছোটখাটো চার-চাকা গাড়ির এ খেলনা দ্রুতই শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সৃজনশীলতার উন্মাদনা সৃষ্টি করে। আজও এ প্রবণতা এশিয়া জুড়ে জনপ্রিয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিলিয়ন মিনি ৪ডব্লিউডি বিক্রি হয়েছে।

কোম্পানির সম্প্রসারণ
১৯৮৪ সালে তামিয়া ইনকর্পোরেটেড নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯৪ সালে ফিলিপাইনের সেবুতে প্রথম উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে। ২০২৩ সালে সেখানে দ্বিতীয় কারখানা চালু হয়। বর্তমানে কোম্পানির অধিকাংশ পণ্য ফিলিপাইনে তৈরি হয়।

২০০৮ সালে তামিয়া চেয়ারম্যান হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে নেতৃত্ব তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।

স্থানীয় শিল্পের অগ্রদূত
শিজুওকা শহরকে “বিশ্বের মডেল রাজধানী”-তে রূপ দিতে তামিয়ার ভূমিকা অনন্য। তিনি স্থানীয় হবি শোকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ইভেন্টে পরিণত করেন। আজ শহরটিতে প্লাস্টিক মডেল-সংক্রান্ত পর্যটনও গড়ে উঠেছে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি ও উত্তরাধিকার
অন্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরাও স্বীকার করেছেন—তামিয়ার মতো মডেলের প্রতি এত নিবেদিত আর কেউ ছিলেন না। শিজুওকার মেয়র জানিয়েছেন, তারা তামিয়ার প্রচেষ্টাকে ভিত্তি করে শহরকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপ দিতে চান।

নভেম্বরে তার স্মরণসভা আয়োজন করা হবে। তবে ইতোমধ্যেই ভক্তদের শ্রদ্ধা প্রকাশ, প্রদর্শনী কক্ষের জীবনঘনিষ্ঠ মডেল, আর শহরের প্রতিটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেরিতে ফুটলেও ফুল ফোটে: শেখার কোনো বয়স নেই

শুনসাকু তামিয়ার অবদান: ক্ষুদ্র প্লাস্টিক মডেলকে বাস্তবতার ছোঁয়ায় বিশ্বজোড়া খ্যাতি

১২:৩২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫

বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধার বন্যা
১৮ জুলাই ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন প্লাস্টিক মডেল জগতের কিংবদন্তি শুনসাকু তামিয়া। মৃত্যুর এক মাস পরও তাকে নিয়ে শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ থেমে নেই। জাপানের শিজুওকা শহরে তামিয়া ইনকর্পোরেটেডের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিদিন মানুষ সমবেদনা বইতে স্বাক্ষর করছেন। কেউ খেলনা গাড়ি, কেউ যুদ্ধজাহাজ বা ট্যাঙ্কের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দিয়ে তার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা জানাচ্ছেন।

মডেল জগতের বিপ্লবী
প্রায় সাত দশকের নেতৃত্বে শুনসাকু তামিয়া ক্ষুদ্র প্লাস্টিক অংশ জোড়া লাগিয়ে বাস্তবসম্মত প্রতিরূপ তৈরির সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেন। জাপানে ‘প্লামো’ নামে পরিচিত এই শখকে তিনি শিল্পে রূপ দেন এবং দেশটিকে প্লাস্টিক মডেলের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রারম্ভিক যাত্রা
১৯৪৬ সালে তিনি বাবার প্রতিষ্ঠিত “তামিয়া শোজি”-তে যোগ দেন, যা মূলত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। সাত বছর পর প্রতিষ্ঠানটি কাঠের মডেল তৈরিতে মনোযোগ দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্লাস্টিক মডেলের আগমন দেখে তামিয়া পুরোপুরি এই শিল্পে প্রবেশ করেন।

১৯৬০ সালে বাজারে আসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্লাস্টিক মডেল কিট—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধজাহাজ ইয়ামাতোর ১/৮০০ স্কেল প্রতিরূপ। এরপর ১৯৬২ সালে জার্মান প্যান্থার ট্যাঙ্কের ১/৩৫ স্কেল মডেল বিপুল সাড়া তোলে, যা চলন্ত মোটর সংযুক্তির কারণে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

নিখুঁত বাস্তবায়নের সাধনা
তামিয়া নিখুঁততা অর্জনে কখনো ছাড় দেননি। এক পর্যায়ে তিনি বাস্তব একটি পোর্শে ৯১১ কিনে তা টুকরো টুকরো করে খুলে প্রতিটি যন্ত্রাংশ গভীরভাবে পরীক্ষা করেন। এমনকি যেসব অংশ মডেলে দৃশ্যমান নয়, সেগুলোর নকশাতেও তিনি যথাযথ মনোযোগ দেন।

১৯৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত অ্যাবারডিন ট্যাঙ্ক জাদুঘরে গিয়ে দু’দিনে ৩ হাজার ছবি তোলেন। এগুলো থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত ১/২৫ স্কেলের ট্যাঙ্ক সিরিজ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবন্দি সোভিয়েত ট্যাঙ্ক দেখতে তিনি ইসরায়েল ভ্রমণ করেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৬৮ সালে জার্মানির নুরেমবার্গ আন্তর্জাতিক খেলনা মেলায় তামিয়ার হোন্ডা এফ১ কার মডেল প্রদর্শিত হয় এবং ব্যাপক প্রশংসা পায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তামিয়ার নাম ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৬ সালে কোম্পানি উন্মোচন করে ব্যাটারিচালিত ১/১২ স্কেলের পোর্শে ৯৩৪ টার্বো আরসি মডেল। এটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং রেডিও কন্ট্রোলড মডেলের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

শিশুদের জন্য উদ্ভাবন
১৯৮২ সালে শিশুদের জন্য সুলভ মূল্যে “মিনি ৪ডব্লিউডি” সিরিজ চালু করেন তামিয়া। ছোটখাটো চার-চাকা গাড়ির এ খেলনা দ্রুতই শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সৃজনশীলতার উন্মাদনা সৃষ্টি করে। আজও এ প্রবণতা এশিয়া জুড়ে জনপ্রিয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিলিয়ন মিনি ৪ডব্লিউডি বিক্রি হয়েছে।

কোম্পানির সম্প্রসারণ
১৯৮৪ সালে তামিয়া ইনকর্পোরেটেড নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯৪ সালে ফিলিপাইনের সেবুতে প্রথম উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে। ২০২৩ সালে সেখানে দ্বিতীয় কারখানা চালু হয়। বর্তমানে কোম্পানির অধিকাংশ পণ্য ফিলিপাইনে তৈরি হয়।

২০০৮ সালে তামিয়া চেয়ারম্যান হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে নেতৃত্ব তার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।

স্থানীয় শিল্পের অগ্রদূত
শিজুওকা শহরকে “বিশ্বের মডেল রাজধানী”-তে রূপ দিতে তামিয়ার ভূমিকা অনন্য। তিনি স্থানীয় হবি শোকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ইভেন্টে পরিণত করেন। আজ শহরটিতে প্লাস্টিক মডেল-সংক্রান্ত পর্যটনও গড়ে উঠেছে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি ও উত্তরাধিকার
অন্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরাও স্বীকার করেছেন—তামিয়ার মতো মডেলের প্রতি এত নিবেদিত আর কেউ ছিলেন না। শিজুওকার মেয়র জানিয়েছেন, তারা তামিয়ার প্রচেষ্টাকে ভিত্তি করে শহরকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপ দিতে চান।

নভেম্বরে তার স্মরণসভা আয়োজন করা হবে। তবে ইতোমধ্যেই ভক্তদের শ্রদ্ধা প্রকাশ, প্রদর্শনী কক্ষের জীবনঘনিষ্ঠ মডেল, আর শহরের প্রতিটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।