ভিয়েতনামের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরছে। রাজধানী হ্যানয়ে শুরু হয়েছে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির বহুদিনের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী জাতীয় কংগ্রেস। এই কংগ্রেসকে ঘিরেই নির্ধারিত হবে ভিয়েতনাম কি আদৌ তার দ্রুত প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে পারবে, নাকি জনসংখ্যার বার্ধক্য ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে সেই সুযোগ হাতছাড়া হবে।
চার দশকের সংস্কার আর দারিদ্র্য হ্রাসের পর এখন ভিয়েতনামের সামনে এক সংকীর্ণ সময়সীমা। একশো দুই মিলিয়ন মানুষের এই দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত দ্রুত কমতে শুরু করবে। তার আগেই অর্থনীতিকে উচ্চ আয়ের স্তরে নিয়ে যাওয়াই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপ
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই শক্তির মধ্যেই ভিয়েতনামের গুরুত্ব বাড়ছে। দক্ষিণ চীন সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং দ্রুত বেড়ে ওঠা উৎপাদন খাত দেশটিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের রপ্তানি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, আবার একই সঙ্গে চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপ ও সুযোগের মধ্যেই অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে হ্যানয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের ইঙ্গিত
দীর্ঘদিন ধরে ভিয়েতনামে ক্ষমতা পরিচালিত হয়েছে চার শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এবার সেই কাঠামো বদলানোর আভাস মিলছে। দলীয় প্রধান তো লাম একসঙ্গে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে পারেন বলে জোর আলোচনা চলছে। এতে একদিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তো লামের উত্থান ও সংস্কারের বার্তা
এক সময়ের কঠোর নিরাপত্তা প্রধান হিসেবে পরিচিত তো লাম এখন সংস্কারের মুখ হয়ে উঠছেন। প্রশাসনিক পুনর্গঠন, প্রদেশ একীভূতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক স্থাপনা গড়ার উদ্যোগ তার নেতৃত্বের পরিচয় দিচ্ছে। একই সঙ্গে দলীয় ভেতরে নিজের অনুগতদের শক্ত অবস্থানে বসিয়ে তিনি ক্ষমতার ভিত্তিও মজবুত করছেন।
তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের পছন্দের সংস্থাগুলো এখনও বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে এবং মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই কড়া।
নেতৃত্ব নির্বাচন ও নতুন মুখ
এই কংগ্রেসে দেড় হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। এখান থেকেই কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্যরা নির্বাচিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রবল। আর্থিক খাতে অভিজ্ঞ এক তরুণ নেতার উত্থানকে অনেকেই অর্থনৈতিক সংস্কারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
নীতিগত অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ
ভিয়েতনাম এখন কম দক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে যেতে চায়। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে।
তবু গত বছরে আট শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, দেশটির অর্থনৈতিক গতি এখনও থামেনি। প্রশ্ন একটাই—এই গতি কি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যাবে।












