পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধে অন্তত ৪ হাজার ৫০৪টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। এসব অপরাধে ছয়জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত হয়েছেন। অপরাধীদের হাতে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, যানবাহন, মুঠোফোনসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সব মিলিয়ে চুরি ও লুট হওয়া অর্থ এবং মূল্যবান সামগ্রীর পরিমাণ ৩ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপির বেশি।
পুলিশের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৫১৮টি ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে এবং ১৮৭টি ঘটেছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে।
এই সময়ে অপরাধীরা নগদ ৯৯ কোটি ৮৫ লাখ ১২ হাজার ৩২৫ রুপি এবং ১৬৯ কোটি ৯৮ লাখ ২১ হাজার ৫২৫ রুপি মূল্যের বিভিন্ন সামগ্রী লুট বা চুরি করেছে। এ ছাড়া ৮৬৮ তোলা স্বর্ণ, ৯৭টি গাড়ি, ১ হাজার ৯০৫টি মোটরসাইকেল এবং ১ হাজার ৭৮১টি মুঠোফোন খোয়া গেছে।
তবে পুলিশের কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। বিদেশি নাগরিক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় কয়েক ডজন মামলার এজাহার গোপন রাখা হয়েছে বা প্রকাশ করা হয়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতির পুরো চিত্র উঠে আসেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে প্রাণহানি
নয় মাসে ডাকাতির অন্তত ১০টি মামলা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। ডাকাত দলগুলো নগদ ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ রুপি এবং ৯৫ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ রুপি মূল্যের বিভিন্ন সামগ্রী লুট করেছে। এ ছাড়া দুই তোলা স্বর্ণ, দুটি মোটরসাইকেল ও ১৪টি মুঠোফোন নিয়ে গেছে তারা।
অন্যদিকে, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র ও সাধারণ ডাকাতির বাইরে পৃথকভাবে ৯৯৩টি ছিনিয়ে নেওয়ার বা বলপ্রয়োগে লুটের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি ঘটেছে বাসাবাড়িতে এবং ৪০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। নয়টি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অপহরণ করার পর লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের এবং আরেকটিতে সরকারি কর্মকর্তার ছদ্মবেশ ধারণকারী ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অপরাধীরা নগদ ২৯ কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার ২৯২ রুপি এবং ১৫ কোটি ৫২ লাখ ৮ হাজার ৯১৮ রুপি মূল্যের সামগ্রী লুট করেছে। এ ছাড়া ৮১ তোলা স্বর্ণ, সাতটি গাড়ি, ২০০টি মোটরসাইকেল ও ১ হাজার ৮২টি মুঠোফোন নিয়ে গেছে তারা।
বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনা বেশি
ইসলামাবাদে বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৬২৭টি চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৫১২টি ঘটেছে বাসাবাড়িতে।
এসব ঘটনায় চোরেরা নগদ ১৫ কোটি ১৮ লাখ ২৩ হাজার ৭২ রুপি এবং ৪৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৫ রুপি মূল্যের সামগ্রী নিয়ে গেছে। এ ছাড়া ৪৯৯ দশমিক ৬৪ তোলা স্বর্ণ, সাতটি মোটরসাইকেল ও ৩২৮টি মুঠোফোন চুরি হয়েছে।
এ সময় সাধারণ চুরির আরও ১ হাজার ৩০৪টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৪৮৫টি ঘটেছে বাসাবাড়িতে এবং ১৪৩টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এসব ঘটনার একটিতে চোরদের হামলায় একজন আহত হয়েছেন।
সাধারণ চুরির ঘটনাগুলোতে নগদ ৪০ কোটি ৭৪ লাখ ৮২ হাজার ৫৫৬ রুপি এবং ৮০ কোটি ৯৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৮৫ রুপি মূল্যের সম্পদ খোয়া গেছে। এ ছাড়া ৬২৬ দশমিক ২৮ তোলা স্বর্ণ, দুটি গাড়ি, ১৮টি মোটরসাইকেল, ৫৪৩টি মুঠোফোন এবং ৩৯টি ল্যাপটপ চুরি হয়েছে।
চোরেরা বিভিন্ন ধরনের অন্যান্য সামগ্রীও নিয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি মিটার, ২৯টি ব্যাটারি—যার মধ্যে যানবাহনের ব্যাটারিও রয়েছে—২৬টি গাড়ির টায়ার, আটটি ট্রান্সফরমার, ১০টি সাইকেল এবং ১০৫টি গবাদিপশু বা অন্যান্য প্রাণী। এ ছাড়া সেফ সিটি নজরদারি ব্যবস্থার কয়েকটি ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জামও চুরি হয়েছে।
ছিনতাইয়ে খোয়া গেছে অর্থ ও স্বর্ণ
পুলিশের নথিতে নয় মাসে ছিনতাইয়ের ৫৫১টি ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি বাসাবাড়িতে এবং চারটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে।
এসব ঘটনায় নগদ ১১ কোটি ৫৮ লাখ ৩০ হাজার ৯৩০ রুপি এবং ৪ কোটি ৬ লাখ ১৬ হাজার ৫ রুপি মূল্যের সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৭ দশমিক ৫ তোলা স্বর্ণ, চারটি গাড়ি, ১১টি মোটরসাইকেল ও ৪৫৮টি মুঠোফোন ছিনতাই হয়েছে।
যানবাহন চুরির ঘটনাও কম নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময় ৮৪টি গাড়ি এবং ১ হাজার ৬৬৭টি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ।
পুলিশের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
ইসলামাবাদ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশনস) আলী ওয়াসিম বলেছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন চুরি ও লুট হওয়া সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের অভিযানের সাফল্য তুলে ধরতে তিনি গ্রেপ্তারের সংখ্যা এবং উদ্ধার হওয়া সম্পদের বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তবে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিন দিন পার হয়ে গেলেও সেই তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
ফলে কতজন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছেন, কী পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের কতজন তাদের হারানো সম্পদ ফিরে পেয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ইসলামাবাদের নয় মাসের অপরাধের পরিসংখ্যান রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে চুরি, সশস্ত্র লুট, মুঠোফোন ছিনতাই এবং যানবাহন চুরির ব্যাপকতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।












