মধ্যবয়সে পৌঁছানো অনেক নারী এখন বয়সজনিত পেশি ক্ষয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়ামের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এই প্রবণতার মাঝেই বিভ্রান্তি তৈরি করছে পরস্পরবিরোধী পরামর্শ ও প্রভাবশালীদের ছড়ানো ভুল তথ্য।
গত বছর আমিও এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হই—নিজেকে এমন একজন নারী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যিনি নিয়মিত ওজন তুলে ব্যায়াম করেন। সত্যি বলতে, নিজেকে এভাবে পরিচয় দিতে একটু অতিরঞ্জিতই মনে হয়। সাত মাস পরেও আমি পুলআপ করতে পারি না, আর ডাম্বেল ইনক্লাইন প্রেসে আমার সীমা ১৮ কেজি। তবুও আমি নিয়মিত এমন একটি জিমে যাই, যেখানে নারীদের শক্তিশালী করে তোলাই মূল লক্ষ্য।
আমার মতো অনেক মধ্যবয়সী নারীর লক্ষ্য খুব সহজ—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা। কিন্তু একসময় এই বয়সী নারীদের মধ্যে শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম খুব একটা প্রচলিত ছিল না। অথচ সুস্থভাবে বার্ধক্যে পৌঁছাতে পেশি ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারীদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন চিকিৎসকেরা মূলত হাড় ক্ষয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু শরীরের গঠন পরিবর্তন ও পেশি কমে যাওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
মধ্যবয়সে শরীরে বড় পরিবর্তন আসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যায়, হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, এবং শরীরে চর্বি ও পেশির ভারসাম্য বদলে যায়। এর ফলে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
পেটের অতিরিক্ত মেদ শুধু পোশাক পরতে অসুবিধা তৈরি করে না, বরং হৃদরোগ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে পেশি কমে গেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পড়ে যাওয়া ও হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে অনেক নারী বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যান। সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য পরামর্শ পাওয়া যায়—কেউ বলছেন শক্তি ব্যায়াম জরুরি, আবার কেউ বলছেন নমনীয়তা হারাবেন না। কেউ বলছেন কার্ডিও দরকার, আবার কেউ বলছেন বেশি কষ্ট করে ব্যায়াম করা ঠিক নয়। এমনকি কেউ কেউ হরমোন থেরাপি বা নানা ধরনের সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিচ্ছেন।
এই পরামর্শগুলোর আড়ালে অনেক সময় পণ্য বিক্রির প্রচারণাও লুকিয়ে থাকে, যা সবসময় ব্যবহারকারীর জন্য উপকারী নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখন অনেক মধ্যবয়সী নারীকে ভারী জ্যাকেট পরে হাঁটতে দেখা যায়। এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মূলত সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে। দাবি করা হয়, এতে পেশি ও হাড় শক্তিশালী হয়। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করার মতো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব কম।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের জ্যাকেট তেমন কোনো কার্যকর ফল দেয় না। যেসব গবেষণায় উপকারিতা দেখানো হয়েছে, সেগুলোর পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এক গবেষণায় জ্যাকেট পরে ব্যায়াম করা নারীদের তুলনা করা হয়েছে এমন নারীদের সঙ্গে, যারা কোনো ব্যায়ামই করেননি—যা স্বাভাবিকভাবেই ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশি গঠনের জন্য সঠিক মাত্রার প্রতিরোধ প্রয়োজন, যা শুধু হাঁটাহাঁটি করে পাওয়া যায় না—এমনকি ভারী জ্যাকেট পরলেও না। তাই ওজন তুলে ব্যায়ামের বিকল্প নেই।
তবে এর মানে এই নয় যে জ্যাকেট ক্ষতিকর। যদি এটি কাউকে হাঁটতে উৎসাহিত করে, তাহলে সেটি ইতিবাচক। এমনকি এটি শক্তি ব্যায়ামের সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতেও সাহায্য করতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস নিয়েও অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের পরামর্শ দেন, কখনো কখনো দিনে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত। যদিও প্রোটিন পেশি বৃদ্ধিতে সহায়ক, তবে একটি নির্দিষ্ট সীমার পর এর অতিরিক্ত গ্রহণ তেমন উপকার দেয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজিতে প্রায় ১.৬ গ্রাম প্রোটিনই যথেষ্ট। অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রতিটি খাবারে পরিমিত প্রোটিন এবং প্রয়োজনে একটি অতিরিক্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারই যথেষ্ট।
সব মিলিয়ে, অনেক বিভ্রান্তিকর পরামর্শের ভিড়ে সবচেয়ে কার্যকর পথটি আসলে খুব সহজ। নিয়মিত শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়ামই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি। সপ্তাহে এক বা দুইবার ওজন তুলে ব্যায়াম করলেই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।












