পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনৈতিক সম্প্রদায় বা ইকোওয়াস চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি অভিন্ন মুদ্রা চালুর স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় যতই কাছে আসে, ততই স্পষ্ট হয় যে শুধু একটি নতুন মুদ্রা চালু করলেই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি তৈরি হবে না। বরং অভিন্ন মুদ্রার ভিত্তি শক্ত করতে হলে তার আগে এমন একটি আর্থিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বহিরাগত অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পারে।
‘ইকো’ নামের অভিন্ন মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা ২০০৩ সাল থেকে বারবার পিছিয়েছে। প্রধান বাধা ছিল সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক সূচকে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য না থাকা। মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, ঋণ এবং অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে একই সময়ে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি দেশগুলো।

এখন ইকোওয়াস ২০২৭ সালে ধাপে ধাপে এই মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু যেসব দেশ নির্ধারিত অর্থনৈতিক মানদণ্ড পূরণ করবে, তারাই এতে অংশ নেবে। এই পদ্ধতি কিছুটা বাস্তবসম্মত। এতে প্রস্তুত দেশগুলোকে এগিয়ে নেওয়া যাবে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা থাকবে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সমস্যা থেকে যায়। সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর এমন অনেক চাপ কাজ করে, যা জাতীয় সরকারের নীতিনির্ধারণের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আন্তর্জাতিক সুদের হার বেড়ে গেলে বিদেশি ঋণের খরচ বাড়ে, ঋণ পরিশোধের চাপ তীব্র হয় এবং একই সময়ে একাধিক দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। ফলে একটি দেশ বিচক্ষণ অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করেও আঞ্চলিক মানদণ্ড থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য তাই কোনো স্থির অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
বিনিময় হার তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে শুরু করলে আফ্রিকার বহু দেশের মুদ্রা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ইকোওয়াসের বৃহত্তম অর্থনীতি নাইজেরিয়ার নাইরার মূল্য এক পর্যায়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এর ফলে বৈদেশিক ঋণ স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধের ব্যয় এবং আমদানি খরচ উভয়ই বেড়ে যায়। মুদ্রার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, মূল্যস্ফীতি রাজস্ব পরিস্থিতিকে চাপের মধ্যে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক দুর্বলতা আরও তীব্র হয়।
এই ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, শুধু নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক মানদণ্ড পূরণ করলেই একটি অভিন্ন মুদ্রা টেকসই হয় না। কোনো সদস্য দেশ সংকটে পড়লে তাকে আবার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক মানদণ্ডের কাছাকাছি ফিরিয়ে আনার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা দরকার।
এখানেই আর্থিক ফেডারেলিজমের গুরুত্ব।
আঞ্চলিক আর্থিক কাঠামো
ইকোওয়াসের উচিত অভিন্ন মুদ্রার আগে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর অর্থ এই নয় যে সদস্য দেশগুলোকে একসঙ্গে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করতে হবে। বরং করব্যবস্থা, রাজস্ব সংগ্রহ, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব ভাগাভাগির একটি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

একটি আঞ্চলিক আর্থিক কর্তৃপক্ষ অভিন্ন নীতিমালা নির্ধারণ, আঞ্চলিক রাজস্ব সংগ্রহ, সীমান্তপারের অবকাঠামো অর্থায়ন এবং সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য স্থিতিশীলতা তহবিল পরিচালনা করতে পারে। এতে অর্থনৈতিক ঝুঁকি ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অভিন্ন মুদ্রা চালুর পর সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন বা স্বাধীন মুদ্রানীতি ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সুযোগ হারাবে। সেই পরিস্থিতিতে একটি দেশের ওপর বড় আঘাত এলে আঞ্চলিক পর্যায়ে তার বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।
ইকোওয়াসের বর্তমান অর্থনীতিগুলো একে অপরের মতো নয়। কোনো দেশ পণ্য রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, আবার কোনো দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর। উৎপাদন কাঠামো, শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা, সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা এবং আর্থিক বাজারের গভীরতাতেও রয়েছে বড় পার্থক্য।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যে একই মুদ্রানীতি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং একটি দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, অন্য দেশে তখন মূল্যস্ফীতি বা অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। একই সুদের হার বা একই মুদ্রানীতি তখন দুই দেশের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল তৈরি করবে। এ ধরনের অসমমিত অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় একটি যৌথ আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
যৌথ তহবিল সেই ব্যবস্থার কেন্দ্র হতে পারে। কোনো সদস্য দেশ সাময়িক সংকটে পড়লে সেই তহবিল থেকে সম্পদ স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মন্দার সময়ে অবকাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ চালু রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
এর সুফল শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। সীমান্তপারের অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতিগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্যও কমানো সম্ভব হবে।
আঞ্চলিক আর্থিক বাজারের প্রয়োজন

ইকোওয়াসের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারের খণ্ডিত অবস্থা। সদস্য দেশগুলোর সরকারি ঋণবাজার অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ও অল্প তারল্যসম্পন্ন। ফলে সরকারগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বিনিময় হার দুর্বল হলে ঋণের প্রকৃত বোঝা দ্রুত বেড়ে যায়।
একটি সমন্বিত আঞ্চলিক আর্থিক কাঠামো এই সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বৃহত্তর ও অধিক তারল্যসম্পন্ন আঞ্চলিক ঋণবাজার তৈরি হলে সদস্য দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। বিভিন্ন মেয়াদের ঋণের অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করা এবং মূলধনের প্রকৃত ব্যয় আরও স্বচ্ছ করা সম্ভব হবে।
এর ফলে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি খাতও আঞ্চলিক বিনিয়োগের জন্য বেশি কার্যকর আর্থিক বাজার পেতে পারে। স্থানীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নিয়ে যাওয়ার পথও প্রশস্ত হবে।
অভিন্ন মুদ্রার রাজনৈতিক বাধাও কমবে
আর্থিক সংহতির আরেকটি সুবিধা হলো এর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন সম্ভব। অভিন্ন মুদ্রা চালু করা সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সমতুল্য। এ কারণে রাজনৈতিক প্রতিরোধ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু আর্থিক সংহতি ধীরে ধীরে এগিয়ে নেওয়া যায়। প্রথমে অভিন্ন বাজেটনীতি, পরে আঞ্চলিক তহবিল, এরপর যৌথ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সমন্বিত রাজস্বব্যবস্থা—এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়ের সঙ্গে শক্তিশালী করা সম্ভব।
এতে সদস্য দেশগুলোর জনগণও সহযোগিতার বাস্তব সুফল দেখতে পাবে। একই সঙ্গে সরকারগুলো অভিন্ন অর্থনৈতিক নিয়ম, আঞ্চলিক স্থানান্তর ব্যবস্থা এবং যৌথ আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। তখন অভিন্ন মুদ্রা চালুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম মনে হতে পারে।
ইকোওয়াসের জন্য মূল প্রশ্ন তাই শুধু ‘কখন ইকো চালু হবে’ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘ইকো চালু হলে কোনো সদস্য দেশ বড় অর্থনৈতিক ধাক্কায় পড়লে তাকে কীভাবে রক্ষা করা হবে?’

এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া অভিন্ন মুদ্রা প্রকল্প অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী আর্থিক ফেডারেলিজম যুক্ত করা যায়, তাহলে মুদ্রা সংহতি একটি আকস্মিক পদক্ষেপ না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের অংশ হতে পারে।
এমন উদ্যোগ আফ্রিকান ইউনিয়নের এজেন্ডা ২০৬৩-এর বৃহত্তর লক্ষ্য—মহাদেশীয় অর্থনৈতিক সংহতি, আঞ্চলিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠন এবং ভবিষ্যৎ মুদ্রা সহযোগিতা—বাস্তবায়নেও সহায়ক হতে পারে।
বিশ্ব যখন ক্রমেই ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও বহুমুদ্রাব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন আফ্রিকার জন্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইকোওয়াস চাইলে এই পরিবর্তনের একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারে।
তবে সেই পথের প্রথম ধাপ অভিন্ন মুদ্রা হওয়া উচিত নয়। আগে দরকার এমন একটি আর্থিক ভিত্তি, যা সংকটের সময় সদস্য দেশগুলোকে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেবে। মুদ্রা সংহতি টেকসই করতে হলে আগে আর্থিক সংহতির প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করাই অধিক বাস্তবসম্মত পথ।












