ইউরোপের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থানের মুখে মধ্যবাম রাজনীতি কি আদৌ টিকে থাকতে পারবে? ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস কিংবা জার্মানির অভিজ্ঞতা বলছে, প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক দলগুলো ক্রমশ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে। কিন্তু এই প্রবণতার মাঝেই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক ভিন্ন রাজনৈতিক মডেল হাজির করেছেন। তিনি শুধু ক্ষমতায় টিকে আছেন তা-ই নয়, বরং ইউরোপীয় রাজনীতিতে এমন এক কেন্দ্র-বাম নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যিনি ডানপন্থার সঙ্গে আপস না করেও কার্যকর শাসন দিতে পারেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর অনেক রাষ্ট্রনেতাই সতর্ক কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ সরাসরি বিরোধিতায় যাননি, কেউ আবার নীরব থেকেছেন। সানচেজ সেই ভিড়ে আলাদা। তিনি প্রকাশ্যে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন, সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে ওয়াশিংটনের চাপ অস্বীকার করেছেন এবং ইউরোপীয় কূটনীতিতে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। গাজা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ন্যাটোর সামরিক ব্যয়—বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ইউরোপের প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়েছে।
অনেক সমালোচকের কাছে এটি নিছক রাজনৈতিক কৌশল। তাঁদের অভিযোগ, সানচেজ আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা রক্ষায় বেশি মনোযোগী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত আট বছরে তিনি এমন এক রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করেছেন, যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও বাস্তববাদ একসঙ্গে কাজ করেছে। ইউরোপের অধিকাংশ কেন্দ্র-বাম দল যেখানে নিজেদের অবস্থান ক্রমেই ঝাপসা করে ফেলেছে, সেখানে সানচেজ স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রেখেছেন।
তাঁর উত্থানও ছিল অস্বাভাবিক। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে নিজেকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। পরে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট এনে ক্ষমতায় আসেন। স্পেনের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এটি ছিল বিরল ঘটনা।
ক্ষমতায় এসে সানচেজ সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নেন কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদ ইস্যুতে। ২০১৭ সালের বিতর্কিত গণভোটকে ঘিরে অভিযুক্তদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্পেনকে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতে ঠেলে দেয়। বিচার বিভাগ, বিরোধী দল এবং রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীরা তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। দীর্ঘমেয়াদে এই সিদ্ধান্ত কাতালান স্বাধীনতার দাবিকে দুর্বল করেছে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেকটাই কমিয়েছে।
সানচেজের রাজনৈতিক দর্শনের মূল শক্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি ঝুঁকি নিতে ভয় পান না, কিন্তু সেই ঝুঁকিকে কেবল প্রতীকী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখেন না। সামাজিক নীতিতেও তাঁর সরকার বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিক সুরক্ষা, অস্থায়ী চাকরি কমানো, নারী ও যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা—এসব উদ্যোগ স্পেনের অর্থনীতিকে নতুন গতিও দিয়েছে। মহামারির সময় সরকারি সহায়তা এবং উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি কর আরোপের নীতিও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একসময় অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত স্পেন এখন ইউরোপের সবচেয়ে স্থিতিশীল অর্থনীতির একটি হিসেবে আলোচিত। পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেবা রপ্তানি এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে দেশটি নতুন অর্থনৈতিক আস্থা অর্জন করেছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু কল্যাণমূলক নীতি নয়, বাস্তববাদী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করেছে। সানচেজ চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন, একই সঙ্গে শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসন নীতিও পুনর্গঠন করেছেন।
তবে তাঁর রাজনীতিকে কেবল অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। স্পেনের স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর উত্তরাধিকার নিয়ে যে দীর্ঘ নীরবতা ছিল, সানচেজ সেটিও ভাঙার চেষ্টা করেছেন। গৃহযুদ্ধ ও একনায়কতন্ত্রের শিকার মানুষের গণকবর শনাক্ত ও পুনঃসমাহিত করার উদ্যোগ স্পেনের রাজনৈতিক স্মৃতিকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। ইতিহাসের সঙ্গে রাষ্ট্রের এই পুনর্মিলন তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্পকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
অবশ্য সানচেজের মডেল অন্য দেশে সহজে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। স্পেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। দেশটি এখনও ফ্রাঙ্কো আমলের স্মৃতি বহন করে, ফলে উগ্র ডানপন্থার প্রতি জনসমর্থনের একটি সীমা রয়েছে। পাশাপাশি, বামপন্থী ছোট দলগুলোর উপস্থিতি সানচেজকে কখনও আরও প্রগতিশীল, কখনও আরও মধ্যপন্থী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
তবু তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। তিনি দেখিয়েছেন, কেন্দ্র-বাম রাজনীতি যদি শুধু রক্ষণাত্মক অবস্থানে না থেকে নিজস্ব আদর্শিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়, তবে সেটি এখনও কার্যকর হতে পারে। ট্রাম্পবাদ কিংবা ইউরোপীয় ডানপন্থী ঢেউয়ের বিরুদ্ধে শুধু নৈতিক আপত্তি নয়, কার্যকর শাসনের বিকল্পও তৈরি করা সম্ভব—সানচেজের স্পেন সেই বার্তাই দিচ্ছে।
আজকের বিশ্বে যেখানে বহু মধ্যপন্থী নেতা নিজেদের ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের নরম সংস্করণে পরিণত করেছেন, সেখানে সানচেজ একটি ভিন্ন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তাঁর সাফল্য স্থায়ী হবে কি না, সেটি ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, তিনি ইউরোপীয় রাজনীতিতে এমন এক বিতর্ক শুরু করেছেন, যা আগামী কয়েক বছর ধরে প্রাসঙ্গিক থাকবে।
ওমর জি. এনকারনাসিয়ন স্পেনের রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষক।












