পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া—কখনো আত্মরক্ষার শেষ আশ্রয়, কখনো দীর্ঘদিনের ক্ষত থেকে মুক্তির পথ। আবার কখনো সেই বিচ্ছেদই হয়ে উঠতে পারে নিজের অস্তিত্বের একটি অংশকে কেটে ফেলার মতো বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে সমকামী ও অন্যান্য যৌন সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে জন্মপরিবারের স্বীকৃতি না পেলে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেদের পছন্দের মানুষদের নিয়ে নতুন ‘নির্বাচিত পরিবার’ গড়ে তোলার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
কিন্তু সব ক্ষেত্রে কি পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়াই সঠিক পথ?
আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, সব সময় নয়।
আমি এমন একটি রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল ও গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বড় হয়েছি, যেখানে শেখানো হতো—সমলিঙ্গের বিয়ে বেআইনি হওয়া উচিত। এমনকি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমলিঙ্গের বিয়ে বলে কোনো বিষয়ই থাকতে পারে না—এমন ধারণাও ছিল সেই পরিবেশে।
আমার বাবা-মা জানতে পারেন যে আমি সমকামী নারী, তখনই, যখন আমি তাঁদের সঙ্গে সেই নারীকে পরিচয় করিয়ে দিই, যাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ২৮ বছর।
আমার বাবা বিষয়টি খুব খারাপভাবে নিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অন্য একজন নারীকে বিয়ে করলে আমার জন্য অর্থপূর্ণ ইহুদি জীবনযাপন করা কঠিন, হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাঁর আরও আশঙ্কা ছিল, এমন সম্পর্ক থেকে একটি সুস্থ, সুখী পরিবার গড়ে তোলাও সম্ভব হবে না।
বাবার প্রতিক্রিয়ার কথা যখন বন্ধুদের বললাম, তাঁরা বললেন, তাঁর আচরণ এতটাই ভয়াবহ এবং তার প্রভাব আমার ওপর এতটাই গভীর যে, বাবাকে আমার জীবন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়াই ন্যায্য। তাঁদের একজন এমনকি বলেছিলেন, বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা নৈতিকভাবেও সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি আমাকে পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি
ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া এখন আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিরও একটি দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আমার মতো প্রগতিশীল সন্তানদের রক্ষণশীল বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রবণতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালে একটি বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকীতেও এই প্রবণতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল।
সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে রয়েছে নানা সহায়ক গোষ্ঠী ও অনলাইন আলোচনামঞ্চ, যেগুলোর সদস্যসংখ্যা কয়েক দশক হাজারে পৌঁছেছে।
কেউ নির্যাতনের কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেন। কেউ করেন সম্পূর্ণ বিপরীত জীবনদর্শনের কারণে—যেখানে প্রতিটি সাক্ষাৎ, প্রতিটি কথোপকথন এবং প্রতিটি পারিবারিক মিলন অবিরাম মতবিরোধে পরিণত হয় এবং সেই বিরোধ ধীরে ধীরে সম্পর্কটিকে অসহনীয় করে তোলে।
আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁরা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই তাঁদের মূল্যবোধ ও বিশ্বাস পেয়েছেন, কিন্তু বড় হয়ে সেই একই মূল্যবোধকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে একই শিকড় থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্বাসই একসময় দুই প্রজন্মের মধ্যে বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্পর্ক ছিন্ন করা অনেকটা অঙ্গচ্ছেদের মতো।
আমার ক্ষেত্রে বাবার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা শুধু তাঁর প্রতি ভয়াবহ অন্যায়ই হতো না; একই সঙ্গে তা আমাকে এবং আমার ভবিষ্যৎ পরিবারকে সেই চিন্তা, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্ক থেকেও বঞ্চিত করত, যেগুলো আমাকে আজকের মানুষটি করে তুলেছে।
বাবাকে জীবন থেকে কেটে ফেলা তাই আমার কাছে নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত করার মতো ছিল।
সঠিক পরিসংখ্যান খুব বেশি নেই। তবে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে—বিশেষ করে সন্তানদের বাবা-মায়ের সঙ্গে—সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনা বাড়ছে বলেই মনে হয়। কেউ কেউ মনে করেন, এমন পরিস্থিতিকে খুব সহজ একটি সমাধান হিসেবে দেখানো কিছু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পারিবারিক পরামর্শদাতার ভূমিকাও এতে রয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা’ বিষয়ক একটি বইয়ের লেখক শ্যারন মার্টিন তাঁর নিজের লেখালেখির পাতায় ‘বিষাক্ত পরিবার যাচাই’ নামে একটি প্রশ্নমালাও দিয়েছেন। সেখানে অপমানজনক ভাষা, যৌন নির্যাতন এবং বিশৃঙ্খল পারিবারিক পরিবেশের মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এমনকি চলতি বছরের বসন্তেই ৩২ জন লেখকের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে লেখা নিয়ে একটি নতুন সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যার বিষয়ই ছিল পরিবার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা।
যৌন সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা আরও বেশি
সমকামী ও অন্যান্য যৌন সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করার প্রবণতা বিশেষভাবে বেশি দেখা যায়। এর পেছনে একটি দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস রয়েছে।
যে পরিবার জন্মসূত্রে তাদের গ্রহণ করে না, তার বিকল্প হিসেবে তারা প্রায়ই নিজেদের পছন্দের মানুষদের নিয়ে একটি ‘নির্বাচিত পরিবার’ তৈরি করে। সেই পরিবারে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও থাকে গ্রহণযোগ্যতা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা।
আমার ক্ষেত্রেও বন্ধুরা আমাকে সেই পথেই যেতে বলেছিলেন।
কিন্তু আমার জন্য সেটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।
আমি ২০২৩ সালের বসন্তে বাবা-মাকে আমার যৌন পরিচয়ের কথা জানাই। এর মাত্র ছয় মাস পর ঘটে ৭ অক্টোবরের হামলা। এরপর আমার ফিলিস্তিনপন্থী সক্রিয়তাবাদ বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে। আমার যৌন পরিচয় নিয়ে তাঁর যে আপত্তি ছিল, তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয় রাজনৈতিক ও নৈতিক মতপার্থক্যের আরেকটি গভীর স্তর।
যে বিরোধ আমাদের আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছিল
২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আমি এক ইহুদি অভিবাসী শিল্পীকে নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। ওই শিল্পী হলোকাস্টের সময় মারা গিয়েছিলেন। লেখায় তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে গাজার ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত তুলনা টেনেছিলাম।
সেই তুলনাই আমার ও বাবার মধ্যে এমন এক তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়, যার পর আমরা বহু মাস একে অপরের সঙ্গে কথা বলিনি।
৭ অক্টোবরের পর আমার বাবা-মা যখন প্রথমবার ইসরায়েলে ফিরে যান, তাঁরা ইসরায়েলি সেনাদের জন্য সরবরাহ নিয়ে গিয়েছিলেন।
আর আমি যখন প্রথমবার সেখানে ফিরে যাই, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ‘সুরক্ষামূলক উপস্থিতি’—এমন এক ধরনের সক্রিয়তাবাদ, যেখানে ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
আমার কাছে বাবার সঙ্গে এই দুটি গভীর মতবিরোধ আসলে পরস্পর সম্পর্কিত।
আমার ইহুদি পরিচয়ই আমাকে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। একই পরিচয় আমাকে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ও নৈতিক অখণ্ডতার পক্ষেও দাঁড়াতে শিখিয়েছে। আর সেই একই মূল্যবোধ থেকেই আমি যে নারীকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে পরিবার গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
অর্থাৎ, আমার জীবনের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই এসেছে সেই মূল্যবোধ থেকে, যা আমার বাবা-মাই আমার মধ্যে তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু আমার বাবার কাছে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাঁর চোখে আমার যৌন পরিচয় এবং তার চেয়েও বেশি আমার সক্রিয়তাবাদ ছিল তাঁর নিজের এবং তাঁর ও আমার মায়ের শেখানো মূল্যবোধের প্রতি আমার প্রত্যাখ্যান।
আমার বন্ধুরা বলেছিলেন, এই রাজনৈতিক বিরোধও বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আরেকটি কারণ।
কিন্তু আমরা অন্য পথ বেছে নিলাম।
আমরা একসঙ্গে পারিবারিক পরামর্শ গ্রহণ করতে শুরু করলাম।
বাবাই প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন
এই উদ্যোগটি আমার বাবার কাছ থেকেই এসেছিল।
তিনি বলেছিলেন, এর খরচ তিনিই দেবেন। শুধু তা-ই নয়, আমি যতবার তাঁর পাশে বসতে রাজি থাকব, ততবার তিনি আমাদের পরিবারের ফিলাডেলফিয়ার বাড়ি থেকে ওয়াশিংটনে গাড়ি চালিয়ে আসবেন। সেখানে আমরা একজন পারিবারিক পরামর্শদাতার সামনে পাশাপাশি বসতাম।
আমার বাবা সেই পরামর্শদাতাকে মজা করে ‘মধ্যস্থ বিচারক’ বলে ডাকতেন।
আমি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করিনি।
আমি ভয় পেয়েছিলাম।
আমি জানতাম, আমার সেই ভয়ের মধ্যে যেমন যথেষ্ট কারণ ছিল, তেমনি কিছুটা কাপুরুষতাও ছিল।
আমার আশঙ্কা ছিল, পরামর্শ নেওয়ার ঘরটি হয়তো এমন এক মঞ্চে পরিণত হবে, যেখানে বাবা ইঙ্গিতের মাধ্যমে আবার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে আমার জীবনই কোনোভাবে ‘জঘন্য’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’—যে শব্দটি বাইবেলে সমকামী যৌনসম্পর্কের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
বাবার অবশ্য দাবি ছিল, বাইবেলের সেই কঠোর ভাষা কেবল পুরুষের সমকামী যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু তাঁর এই ব্যাখ্যাও আমাকে কোনো স্বস্তি দেয়নি।
বাবার ছাপ থেকে নিজেকে আলাদা করা অসম্ভব
আমার জীবনের ওপর বাবার প্রভাব গভীর।
আমাদের পারিবারিক পরামর্শদাতা বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেন, আমরা দুজন আসলে একে অপরের মতো অনেক বেশি মানুষ।
আমি যে পরিবারটি আমার স্ত্রীর সঙ্গে গড়ে তুলতে চাই, সেটি আমার ভালোবাসার ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর দ্বারা সমৃদ্ধ। সেই ঐতিহ্য আমার বাবা আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, এবং আজ আমার স্ত্রী ও আমি সেই ঐতিহ্যই ভাগ করে নিই।
তাই সেই ঐতিহ্যের কাছে যেতে গেলেই আমি বাবার ছাপ দেখতে পাই।
আমার নিজের যে অংশগুলো সেই ঐতিহ্য ও পারিবারিক শিক্ষায় গড়ে উঠেছে, সেগুলোর মধ্যেও বাবার হাতের ছাপ রয়েছে।
আমি আমার হবু স্ত্রীকে নিজের একটি দরিদ্র, অসম্পূর্ণ সংস্করণ দিতে চাইনি।
নিজের নতুন পরিবার শুরু করার আগে তাই আমাকে বাবার সঙ্গে এবং নিজের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটি কোনোভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা করতেই হতো।
অন্তত চেষ্টা তো করতেই হতো।
বোঝাপড়ার পথটি ছিল যন্ত্রণায় ভরা
আমাদের অগ্রগতি সহজ ছিল না।
২০২৪ সালে আমাদের বিরোধ যখন চরমে পৌঁছেছিল, বাবা চিৎকার করে বলেছিলেন, ইহুদি জনগণের প্রতি আমার মধ্যে একটুও আনুগত্য নেই।
আমাদের পরিবারে আনুগত্যহীনতাকে গুরুতর পাপ হিসেবে দেখা হয়। তাই বাবার সেই অভিযোগ আমার হৃদয়ের একেবারে গভীরে গিয়ে আঘাত করেছিল।
আমি আর সেই বিতর্ক চালিয়ে যেতে পারিনি।
তাই সাময়িকভাবে তাঁর কাছ থেকে পুরোপুরি দূরে সরে গেলাম।
অল্প সময়ের জন্য আমিও প্রবেশ করেছিলাম সেই ‘সম্পূর্ণ যোগাযোগহীন’ জীবনের জগতে, যে পথ বেছে নিতে আমার বন্ধুরা আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরামর্শ গ্রহণের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি।
পারিবারিক পরামর্শের ঘরেও বাবা একই অভিযোগ করেছিলেন।
আমি তখন তাঁকে জানাই, নিজের জীবনের একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা—ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা—প্রকাশ্যে লেখার কিছুদিন আগেই ঘটেছিল।
কিন্তু সেখানেও পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
বাবা তত্ত্ব দিয়েছিলেন, আমার সমকামী পরিচয় হয়তো সেই ধর্ষণের পর তৈরি হওয়া মানসিক আঘাতের প্রতিক্রিয়া।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমার জীবনের আগের বছরগুলোতে আমি কি এমন নিষ্ঠুর পুরুষদের নিজের জীবনে জায়গা দিয়েছিলাম, যাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে তাঁর নিজের কিছু ভুলের ভূমিকা ছিল কি না।
এসব কথা শোনা সহজ ছিল না।
আমিও তাঁকে এমন কিছু অভিযোগ করেছিলাম, যেগুলো তাঁর সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাত নিয়ে ছিল এবং তাঁর জন্যও সমানভাবে কষ্টদায়ক।
তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই ঘরে আমরা একে অপরকে যত বেশি আঘাত করেছি, ততই যেন নিজেদের এবং পরস্পরের গভীরে পৌঁছানোর একটি পথ তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি কঠিন কথা, প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি অভিযোগ আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং একে অপরের সম্পর্কে নতুন কিছু বুঝতে বাধ্য করেছে।
আমরা কেউ বদলাইনি, কিন্তু সম্পর্ক বদলেছে
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমার বাবা এবং আমি দুজনেই কিছুটা নরম হয়েছি।
কিন্তু আমাদের কেউই নিজের মৌলিক বিশ্বদৃষ্টিকে বদলে ফেলিনি।
আমরা কেউই হঠাৎ করে অন্যজনের রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করিনি।
বরং আমরা শিখছি, মতপার্থক্যকে ভয় না পেয়ে কীভাবে তার সঙ্গে বসবাস করা যায়।
আমরা এমন এক পারিবারিক সম্পর্কের ধারণা গ্রহণ করতে শিখছি, যেখানে পরিবারের সবাইকে একই বিশ্বদৃষ্টি ধারণ করতেই হবে—এমন কোনো শর্ত নেই।
হয়তো এখানেই সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ বেছে নেওয়া মানুষ আর সম্পর্কের ভেতরে থেকে তর্ক, চেষ্টা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি শোভন ভালোবাসার দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
পরিবারে একে অপরকে ভালোবাসা ও সম্মান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও একই মত পোষণ করার চেয়ে।
বরং একজন আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণকারী মানুষকেও ভালোবাসতে পারা নিজেই একটি মানবিক গুণ।
যে দিন বাবা মেয়ের বিয়েতে পাশে দাঁড়ালেন
মে মাসের এক রবিবার।
আমার বাবা সেই বাড়ির পেছনের উঠোনে আমার বিয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করলেন—সেই বাড়িতে, যেখানে তিনি ও আমার মা আমাকে এবং আমার ভাইবোনদের বড় করে তুলেছিলেন।
স্বাগত বক্তব্যে তিনি অতিথিদের জানালেন, আমি ও আমার স্ত্রী তিন মাস আগে নাগরিকভাবে বিয়ে করেছি।
কিন্তু এই অনুষ্ঠানটি ছিল আমাদের ইহুদি বিয়ে—যে বিয়েতে আমরা নিজেরাই আমাদের বন্ধু ও পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি; যে বিয়েকে আমরা প্রকাশ্যে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং একে অপরের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে।
এরপর বাবা আরও একটি কথা বললেন, যা আমার কাছে অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তিনি বললেন, আমি ও আমার স্ত্রী এমন একটি বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছি, যার উদ্দেশ্য মানুষের সেই অস্তিত্বগত একাকিত্ব দূর করা, যার ব্যাপারে ঈশ্বর আদিপুস্তকে সতর্ক করেছেন।
সেখানে লেখা আছে, মানুষের একা থাকা ভালো নয়।
বাইবেলের এই অংশেই বলা হয়েছে, ঈশ্বর কীভাবে আদমের জন্য সঙ্গী হিসেবে হাওয়াকে সৃষ্টি করেছিলেন।
আমাদের ভালোবাসাকে আদম ও হাওয়ার ভালোবাসার সঙ্গে তুলনা করে বাবা আসলে আমার এবং আমার স্ত্রীর ভালোবাসাকে সম্মান করেছিলেন। আমাদের সম্পর্ককে তিনি সেই প্রথম প্রেমেরই একই শ্রেণিতে স্থান দিয়েছিলেন—যে প্রেম ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করেছিলেন।
সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করেছিলাম, বাবার সঙ্গে আরও অনেক দীর্ঘ সময় পরামর্শের ঘরে বসতে হলেও আমি রাজি থাকতাম।
যত আঘাত আমরা একে অপরকে দিয়েছি, যত আঘাত আমরা নিজেরা সহ্য করেছি—সবকিছুর বিনিময়েও তাঁর মুখ থেকে ওই কথাগুলো শুনতে পারা আমার কাছে মূল্যবান ছিল।
কারণ আমি জানতাম, তিনি কথাগুলো সত্যিই বিশ্বাস করেই বলেছেন।
ভালোবাসার মানুষকে বুঝতে শেখাও এক ধরনের সাধনা
সেই জায়গায় পৌঁছানো সহজ ছিল না।
আপনি যাঁদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তাঁদের কেন আপনার জীবনে প্রয়োজন—এবং তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের কোন কোন অংশ আপনাকে ধরে রাখে—তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করাও সহজ নয়।
পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় একই মত, একই বিশ্বাস বা একই রাজনৈতিক অবস্থান থাকা সম্ভব নয়।
কিন্তু কখনো কখনো সম্পর্ক টিকে থাকে অন্য কিছুর ওপর—ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য, নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস এবং ভিন্ন মানুষকে ভিন্ন মানুষ হিসেবেই গ্রহণ করার ক্ষমতার ওপর।
আর যদি আপনি সৌভাগ্যবান হন—যদি এমন কাউকে ভালোবাসেন এবং সেই মানুষটিও আপনাকে ভালোবাসেন, যিনি সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের দিক থেকে একই পরিমাণ চেষ্টা করতে প্রস্তুত—তবে সেই ভালোবাসাকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করুন।
তাকে সম্মান করুন।
তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করুন।
কারণ সব বিচ্ছেদ মুক্তি দেয় না, আর সব মতবিরোধ সম্পর্কের শেষও নয়।
কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার জন্ম হয় ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরের সঙ্গে একমত হতে পারেন না—কিন্তু তবু একে অপরকে ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।












