ইউক্রেন যুদ্ধের আকাশপথে রাশিয়ার নতুন জেটচালিত গেরান-৫ ড্রোনের আবির্ভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এর প্রভাব এখন ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে ন্যাটোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। দ্রুতগতি, দীর্ঘ পাল্লা এবং তুলনামূলক ভারী বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতার কারণে এই ড্রোনকে আগের প্রজন্মের গেরান বা শাহেদ-ধরনের ড্রোনের তুলনায় ভিন্ন মাত্রার হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সম্প্রতি দেশটির সংসদে রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড’ হামলার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল এমন একটি আশঙ্কা—ইউক্রেনকে সহায়তা করা ন্যাটো সদস্যদের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে রুশ হামলার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোলিশ সীমান্তের কাছে আকাশপথে এমন অস্ত্রের উপস্থিতিও বাড়ছে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনই মূল উদ্বেগ
গেরান-৫-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতি। ইউক্রেনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ড্রোনটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪৫০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার এবং উড়তে পারে প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এতে ৯০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতা রয়েছে।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রচলিত ধীরগতির ড্রোন মোকাবিলার তুলনায় আকাশ প্রতিরক্ষাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলছে। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর হিসাবে, পুরোনো ধরনের ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিহত করার হার যেখানে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, জেটচালিত গেরানগুলোর ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬০ শতাংশ।
অর্থাৎ, একই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার সময় কমে যাচ্ছে এবং বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।
সংখ্যার শক্তিও বড় বিষয়
এই হুমকির আরেকটি দিক প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—উৎপাদনের পরিমাণ। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া তাতারস্তানের আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গেরান-৪ ও গেরান-৫সহ জেটচালিত ড্রোনের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। আগস্টে মাসে প্রায় ৩ হাজার এমন ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতার কথা জানানো হয়েছিল।
এখানেই যুদ্ধের অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র যদি বিপুল সংখ্যায় ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেটি ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। ফলে শুধু একটি ড্রোন ধ্বংস করাই বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনৈতিক সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডের দিকে ঝুঁকি
ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে রুশ হামলা যত বাড়বে, পোল্যান্ডের সীমান্তের কাছাকাছি আকাশে ড্রোনের উপস্থিতিও তত বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ড্রোন ভুল পথে গিয়ে পোলিশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে সেটি দুর্ঘটনা নাকি ইচ্ছাকৃত হামলা—এই প্রশ্নই ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক ও সামরিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
কারণ ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঘটনার ব্যাখ্যা ও দায় নির্ধারণ নিয়েও ঐকমত্য প্রয়োজন। কোনো হামলার পর রাশিয়া যদি দায় অস্বীকার করে এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করে, তাহলে প্রমাণ সংগ্রহ ও সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার সিদ্ধান্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই অনিশ্চয়তাই একটি সম্ভাব্য হামলাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। কারণ সীমান্তের কাছে কোনো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটলে প্রশ্নটি শুধু ‘কে হামলা করেছে’—এতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে, ন্যাটো কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে।

ন্যাটোর ঐক্যই বড় পরীক্ষা
এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জন্য সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি ন্যাটোর রাজনৈতিক ঐক্য পরীক্ষা করার সুযোগও তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশেষ করে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে হামলার পর মিত্রদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার মাত্রা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সেটি জোটের প্রতিরোধক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই পোল্যান্ডের মতো সীমান্তবর্তী ন্যাটো সদস্যদের উদ্বেগ শুধু নিজেদের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে নয়। ইউক্রেনের আকাশযুদ্ধের পরিবর্তন এখন বৃহত্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে গেরান-৫-এর উত্থানকে একতরফা প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবেও দেখা যায় না। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, নতুন অস্ত্র আবির্ভূত হওয়ার পর প্রতিপক্ষও দ্রুত পাল্টা প্রযুক্তি তৈরি করছে। ইউক্রেন ইতিমধ্যে জেটচালিত ড্রোন ঠেকাতে নতুন প্রতিরোধী ড্রোন ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, কয়েক ডজন দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই পাল্টা প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্ত হয়েছে।
যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা
ইউক্রেন যুদ্ধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আক্রমণ ও প্রতিরোধ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন। আজ যে অস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য কঠিন লক্ষ্য, কয়েক মাস পর সেটি মোকাবিলার নতুন পদ্ধতি তৈরি হতে পারে। গেরান-৫-এর ক্ষেত্রেও সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
কিন্তু পাল্টা প্রযুক্তি কার্যকর হওয়ার আগের সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। রাশিয়া যদি দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চরে আরও বেশি জেটচালিত ড্রোন পাঠাতে পারে, তাহলে সীমান্তের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও বাড়বে।
এ কারণে গেরান-৫-এর আসল তাৎপর্য শুধু এর গতি, পাল্লা বা বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতায় নয়। এর বড় প্রভাব হলো—ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সংকট এখন ন্যাটোর সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর সেই সংযোগ যত গভীর হবে, একটি ভুল পথে উড়ে যাওয়া ড্রোনও তত বড় কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের সূচনা করতে পারে।
লেখক: ডেভিড ব্লেয়ার, দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষক












