ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ার ফলে সৌদি আরবের সামনে যে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও প্রথম বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
চুক্তিটির মূল কথা হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে হুতিরা যদি সৌদি জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেটি কি সৌদি আরবের ওপর সশস্ত্র হামলা হিসেবে গণ্য হবে? আর সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের দায়িত্বই বা কী?
বাব আল-মান্দাব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মান্দাব শুধু ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার একটি সামুদ্রিক পথ নয়। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সুয়েজ খালনির্ভর বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, জাহাজভাড়া, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের অগ্রযাত্রায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পেরিম দ্বীপের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখান থেকে প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব সৌদি আরবের জন্য আরও বেশি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকুচিত হয়ে পড়লে বাব আল-মান্দাব সৌদি তেল এশিয়ার বাজারে পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে ওঠে। ফলে এই পথও যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, সৌদি আরবের রপ্তানি সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।
সৌদি জাহাজকে আলাদা করে লক্ষ্য করার অর্থ
এখানেই পরিস্থিতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি রয়েছে। হুতিদের অবস্থান যদি সব ধরনের আন্তর্জাতিক নৌযান বন্ধ করার পরিবর্তে বিশেষভাবে সৌদি-সম্পর্কিত জাহাজকে লক্ষ্য করে হয়, তাহলে বিষয়টি কেবল নৌপথের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখা কঠিন হবে।
সৌদি জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য হলে সেটিকে রিয়াদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগের একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। পেরিম ও আশপাশের এলাকায় হুতিদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পর সৌদি জাহাজের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
তবে এখানেই মক্কা চুক্তির আইনি ও রাজনৈতিক সীমারেখার প্রশ্নটি সামনে আসে। চুক্তিতে সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু প্রতিটি বৈরী পদক্ষেপ, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা হুমকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক জবাবের কারণ হবে—এমন কথা চুক্তিতে নেই। পাকিস্তানও চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেছে।
কোন পর্যায়ে পাকিস্তানের ভূমিকা জরুরি হতে পারে
পরিস্থিতি যদি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা, জাহাজ দখল, সমুদ্রপথে মাইন স্থাপন কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে সৌদি জাহাজ চলাচল বন্ধ করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন রিয়াদের জন্য সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করার যুক্তি অনেক শক্তিশালী হতে পারে।
কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানকে অবিলম্বে ইয়েমেনে স্থলযুদ্ধে সেনা পাঠাতে হবে। সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বাস্তব প্রয়োগ বিভিন্ন মাত্রায় হতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা, সৌদি অবকাঠামো রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, নৌবাহিনী মোতায়েন কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা—সবই সম্ভাব্য বিকল্প।
অর্থাৎ, চুক্তির বাস্তব পরীক্ষা হবে পাকিস্তান কতটা সহায়তা করবে, তার চেয়ে বেশি—কোন পরিস্থিতিতে কতটা সহায়তা করবে, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে।
সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ ইরান
ইসলামাবাদের জন্য সামরিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত কূটনৈতিক। হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক ভূমিকা তেহরানে সৌদি-ইরান সংঘাতের একটি পরোক্ষ অংশগ্রহণ হিসেবে দেখা হতে পারে।
অন্যদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। মক্কা চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পর্ক এখন আনুষ্ঠানিক সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোর নতুন স্তরে পৌঁছেছে।
তাই ইসলামাবাদের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে তাকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো পদক্ষেপ এড়াতে হবে যা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মক্কা চুক্তি যদি সৌদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের একটি নতুন সামরিক কাঠামোতে পরিণত হয়, তাহলে পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।
পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও জড়িত
এখানে পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি শুধু মিত্রের নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্ন নয়। বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্যের একটি বড় অংশ নিরাপদ সামুদ্রিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল।
প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা হলে জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথে যেতে হবে। এতে পরিবহন, বীমা ও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নতুন করে সমুদ্রপথের সংকট পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপরও অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করতে পারে। বাব আল-মান্দাব দিয়ে বড় তেলবাহী জাহাজের চলাচল এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
সুতরাং পাকিস্তানের জন্য নিরাপদ নৌপথ রক্ষা করা কেবল সৌদি আরবের প্রতি আনুগত্যের বিষয় নয়; এটি তার নিজস্ব বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
যুদ্ধ এড়িয়েও চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা
এখন মূল প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কীভাবে তার মিত্রের পাশে দাঁড়াবে, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষা করবে এবং একই সঙ্গে ইয়েমেনে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াবে।
মক্কা চুক্তির সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। এর বড় পরীক্ষা হবে কূটনৈতিক বিচক্ষণতায়। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হবে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিকে এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে না যাতে তা ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের দরজা খুলে দেয়।
বাব আল-মান্দাব তাই এখন কেবল একটি সামুদ্রিক সংকটের নাম নয়। এটি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা। সৌদি আরবকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সুরক্ষিত রাখা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করাই হবে ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
* আসিফ দুররানি পাকিস্তানের ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তিনি আফগানিস্তানবিষয়ক পাকিস্তানের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এবং ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।












