একজন শিল্পীর মৃত্যু কখনো কখনো কেবল একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সময়ের আবহ, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা অসংখ্য অনুভূতির পরিচিত কণ্ঠ। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জুবিন গার্গের মৃত্যু আসামের মানুষের কাছে এমনই এক শূন্যতা তৈরি করেছিল। ৫২ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বহু মানুষকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যা মেনে নেওয়া সহজ নয়—যে মানুষটি এতদিন সর্বত্র ছিলেন, তিনি হঠাৎ কীভাবে কোথাও নেই?
কিন্তু এক বছর পর জুবিনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট: তাঁর অনুপস্থিতি তাঁর গানকে থামাতে পারেনি। বরং তাঁর মৃত্যুর পরও সেই গান নতুন করে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
জুবিনের শূন্যতা কেন আলাদা
আজও তাঁর গান গাড়িতে, বাড়িতে, চায়ের দোকানে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা বিহু উদ্যাপনে শোনা যায়। কণ্ঠটি পরিচিত, সুরটি পরিচিত, আবেগটিও পরিচিত। শুধু মানুষটি নেই।
এই জায়গাতেই একজন শিল্পীর রেকর্ড করা কণ্ঠ আর একজন জীবন্ত মানুষের উপস্থিতির মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। প্রযুক্তি একটি গানকে বারবার বাজাতে পারে, পুরোনো পরিবেশনা সংরক্ষণ করতে পারে; কিন্তু সেই শিল্পী আর কোনো নতুন গান নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবেন না।
জুবিনের ক্ষেত্রে শোকটি তাই শুধু একজন জনপ্রিয় গায়ককে হারানোর শোক নয়। তিনি আসামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। প্রেম, বিচ্ছেদ, বিয়ে, উৎসব, ভ্রমণ, একাকিত্ব কিংবা শোক—জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনো না কোনো গান জড়িয়ে আছে।
অনেকের কাছে অতীতের একটি সময়কে মনে করা মানেই সেই সময়ের কোনো জুবিনের গানকে মনে করা। এই সম্পর্কই তাঁকে সাধারণ জনপ্রিয়তার সীমা পেরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশে পরিণত করেছে।
আসাম থেকে ভারতের বৃহত্তর সংগীতভুবনে
১৯৭২ সালে মেঘালয়ের তুরায় জন্ম নেওয়া জুবিন গার্গ ১৯৯২ সালে অসমিয়া অ্যালবাম ‘অনামিকা’র মাধ্যমে পেশাদার সংগীতজগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী তিন দশকে তাঁর কাজের পরিধি বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত হয়। তিনি গায়ক, সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা—একাধিক পরিচয়ে কাজ করেছেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ৪০টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায় ৩৮ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন। অসমিয়া লোকধারা থেকে আধুনিক সংগীত, বাংলা থেকে হিন্দি চলচ্চিত্র—বিভিন্ন সংগীতভাষার মধ্যে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল।
২০০৬ সালের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘গ্যাংস্টার’-এর ‘ইয়া আলি’ তাঁকে দেশের বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে। গানটির জন্য তিনি গ্লোবাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে সেরা প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কারও পান। কিন্তু জুবিনকে শুধু ‘ইয়া আলি’র শিল্পী হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল জায়গাটিই আড়ালে পড়ে যায়।
তাঁর প্রকৃত সাংস্কৃতিক ভিত্তি ছিল আসাম। ‘মায়াবিনী রাতির বুকুত’, ‘তুমি সুবাস’সহ তাঁর অসংখ্য গান অসমিয়া মানুষের আবেগ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে
জুবিনের সৃষ্টিশীলতা গানেই থেমে থাকেনি। তিনি বহু অসমিয়া চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ও ‘মিশন চায়না’র মতো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত তৈরি করেছেন এবং কবিতাও লিখেছেন।
২০০৯ সালে অ-বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ‘ইকোস অব সাইলেন্স’-এর সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০২৪ সালে পান সম্মানসূচক ডি.লিট. ডিগ্রি।
তবে তাঁর পুরস্কারের তালিকা তাঁর প্রভাবের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। একজন শিল্পীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে পুরস্কার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। জুবিনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিকে যুক্ত করে দেওয়া।
তাঁর ব্যক্তিত্বও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি নিজের মত প্রকাশ করতেন, অনেক সময় সরাসরি। শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়েও মত দিয়েছেন। বন্যার মতো দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও তাঁর জনজীবনের আরেকটি দিক তুলে ধরে।
তিনি ছিলেন অকপট, কখনো বিতর্কিত, কখনো অননুমেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ছিলেন গভীরভাবে মানবিক। সম্ভবত সেই মানবিকতাই তাঁর গানকে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।
শোক যখন একটি সমাজের সম্মিলিত অনুভূতি
জুবিনের মৃত্যুর পর আসামে যে শোকের বিস্তার দেখা যায়, তার ব্যাপ্তি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো কঠিন। তাঁর শেষযাত্রায় ১৫ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কামারকুচিতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তদের দীর্ঘ সারিও দেখা যায়। (Hindustan Times)
পরবর্তীতে তাঁর ৫৩তম জন্মবার্ষিকীতে কোকরাঝাড়ে ২৫ হাজার শিল্পী একত্র হয়ে ‘মায়াবিনী’ পরিবেশন করেন অসমিয়া ও বড়ো ভাষায়। আয়োজনটি ইন্ডিয়া বুক অব রেকর্ডস এবং এশিয়া বুক অব রেকর্ডসে স্বীকৃতি পায়।
কিন্তু রেকর্ডের সংখ্যাই এই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন শিল্পীর গান কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত কণ্ঠে পরিণত হয়েছিল। সেখানে মানুষ শুধু একজন প্রয়াত গায়ককে স্মরণ করেনি; তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির একটি অংশকে পুনরায় উচ্চারণ করেছে।
নতুন শ্রোতার মধ্যেই বেঁচে থাকা
শিল্পীর উত্তরাধিকার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন, যখন তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে এমন মানুষও যুক্ত হতে শুরু করে যারা তাঁকে জীবিত অবস্থায় কখনো দেখেনি।
আজকের একজন তরুণ একটি গান শুনে জুবিনকে আবিষ্কার করতে পারে। কোনো বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে তাঁর গান ভাগ করে নিতে পারেন। আসামের বাইরে থাকা কেউ তাঁর কণ্ঠে নিজের শিকড়ের পরিচিতি খুঁজে পেতে পারেন।
এখানেই মৃত্যুর সঙ্গে শিল্পের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়ে আছে। মৃত্যু একজন শিল্পীর নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু তাঁর পুরোনো সৃষ্টির নতুন অর্থ তৈরি হওয়া বন্ধ করে না।
একটি গান নতুন শ্রোতার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। একটি পুরোনো সুর নতুন প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াই একজন শিল্পীর সৃষ্টিকে তাঁর জীবনের সময়সীমার বাইরে নিয়ে যায়।
জুবিনের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে।
বিদায় কি কখনো সম্পূর্ণ হয়?
জুবিন গার্গের মৃত্যুর এক বছর পরও আসাম তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। হয়তো পারবে না।
কিছু মানুষ চলে গিয়ে স্মৃতি রেখে যান। আবার কিছু মানুষ এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করে যান, যেখানে তাঁদের উপস্থিতি প্রতিদিন নতুনভাবে অনুভূত হয়। জুবিন গার্গ সেই দ্বিতীয় ধরনের শিল্পী।
তাঁর গান এখন আর শুধু তাঁর জীবনের দলিল নয়। এগুলো মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অনুভূতির অংশ।
তাঁর নতুন গান আর আসবে না। নতুন কোনো মঞ্চে তিনি গিটার হাতে দাঁড়াবেন না। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির যাত্রা থামেনি। প্রতিবার কোনো নতুন শ্রোতা তাঁর গান শুনছে, প্রতিবার কোনো পরিবার তাঁর সুর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, ততবারই তাঁর শিল্প নতুন জীবন পাচ্ছে।
শিল্পীর জন্য এর চেয়ে গভীর অমরত্ব আর কী হতে পারে?
জুবিন গার্গ নেই। কিন্তু তাঁর গান আছে। আর যতদিন আসাম সেই গান গাইবে, শুনবে এবং নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেবে, ততদিন তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হবে।
সিদ্ধার্থ রায় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রীয় রক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শক, লেখক ও কলামিস্ট।












