থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে মিয়ানমারের অর্থনীতি ও সমাজের পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছে। ইয়াঙ্গুনে ফেরার অপেক্ষায় থাকা মিয়ানমারের যাত্রীদের ভিড় ছিল যথেষ্ট। ব্যবসা শ্রেণির কাউন্টারেও যাত্রীর অভাব ছিল না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পরিচিত মুখ প্রায় দেখিনি।
মিয়ানমারের ব্যবসায়ী ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বহু বছর থাকার কারণে বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। অতীতে বিমানবন্দরে পরিচিত কাউকে না কাউকে পাওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। ব্যবসায়ী, করপোরেট নির্বাহী, পেশাজীবী, পরিবারের সদস্য—কোনো না কোনো সূত্রে তাদের চেনা থাকত।
এবার যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেছে।
পরিচিতদের অনুপস্থিতির জায়গা নিয়েছে অচেনা অনেক মুখ। তারা কারা, কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে এবং মিয়ানমারের অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন তাদের উত্থানকে সম্ভব করছে—এই প্রশ্নগুলোই সামনে এসেছে।
থাইল্যান্ড যখন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে
মিয়ানমারের মানুষের জন্য থাইল্যান্ড এখন আর শুধু ভ্রমণ বা অবকাশ কাটানোর জায়গা নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, কেনাকাটা, সম্পত্তি কিংবা সাময়িকভাবে দেশের বাইরে থাকার প্রয়োজন—বিভিন্ন কারণে ব্যাংকক ও থাইল্যান্ডের অন্যান্য শহরে যাতায়াত বেড়েছে।
তরুণদের একটি অংশ আবার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে দূরে থাকার জন্য দেশ ছাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের কাছে ইয়াঙ্গুন ও ব্যাংককের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
এই যাতায়াতের সঙ্গে আরেকটি প্রবণতাও স্পষ্ট। থাইল্যান্ড থেকে ফেরার সময় অনেকেই শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের জন্যও নানা পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক পণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, ওষুধ, খাবার, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী এবং গৃহস্থালির পণ্য—সবই এই চাহিদার অংশ।
এর পেছনে মিয়ানমারের ভেতরের সরবরাহব্যবস্থার সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আমদানি অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বিধিনিষেধ বেড়েছে। নিয়মকানুন দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে প্রচলিত ব্যবসায়ীদের জন্য বিদেশ থেকে পণ্য আনা আগের চেয়ে অনেক কঠিন।
কিন্তু আমদানি কঠিন হওয়া মানেই চাহিদা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
বরং সংকটই নতুন বাজার তৈরি করেছে।
নতুন ধরনের ব্যবসায়ী
এই পরিস্থিতিতে এমন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী উঠে আসছে, যাদের অনেকেই পুরোনো ব্যবসায়ী মহলের পরিচিত নাম নন। তারা ছোট পরিসরে পণ্য সংগ্রহ করছেন, থাইল্যান্ডের বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করছেন এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মিয়ানমারের ভোক্তাদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছেন।
এদের কেউ হয়তো সুযোগসন্ধানী উদ্যোক্তা, কেউ আবার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কোনো পণ্য যখন সহজে পাওয়া যায় না, তখন সেটি সংগ্রহ করে দিতে পারাটাই একটি ব্যবসায়িক সুবিধায় পরিণত হয়।
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে সংকট কখনো শুধু ক্ষতি তৈরি করে না; সংকটের মধ্যেও নতুন বাজার তৈরি হয়। কিন্তু সেই বাজার কতটা স্বচ্ছ, কতটা টেকসই এবং কারা তার সুবিধা নিচ্ছে—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের ব্যবসার পথ অবশ্য সহজ নয়। মিয়ানমারে পণ্য নিয়ে ফেরার সময় বিমানবন্দরে অভিবাসন ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের বাড়তি নজরদারি যাত্রীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
সম্ভবত বিমানবন্দরের পরিবর্তিত চেহারার একটি ব্যাখ্যা এখানেই।
থাইল্যান্ড এখন অনেক মিয়ানমারবাসীর জীবনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেছে যে এটি একই সঙ্গে চিকিৎসার স্থান, কেনাকাটার বাজার, ব্যবসার কেন্দ্র এবং সাময়িক আশ্রয়ের জায়গা।
তবে বিমানবন্দরের নতুন মুখগুলোর গল্প এখানেই শেষ নয়।
পুরোনো সম্পদের নীরবতা
পরিচিত মুখগুলো কোথায় গেল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে আরেক ধরনের পরিবর্তনের কথা শুনেছি।
একসময় যেসব ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যেত, তাদের অনেকেই এখন অনেক বেশি নীরব। বাইরে যাওয়া কমেছে, সামাজিক উপস্থিতি কমেছে, প্রকাশ্যে নিজেদের দেখানোর প্রবণতাও কমেছে।
এক বন্ধু বলেছিলেন, তিনি আগের মতো বাইরে যান না; প্রয়োজন হলেই শুধু বের হন।
এই ছোট মন্তব্যটির মধ্যে বর্তমান মিয়ানমারের একটি বড় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
২০২১ সালের পর দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবেশ আমূল বদলে গেছে। মুদ্রার মূল্য কমেছে, ব্যবসায় সরবরাহসংকট তৈরি হয়েছে, বিধিনিষেধ বেড়েছে এবং নিয়মকানুনের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে কঠিন করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও জটিল করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে সম্পদের প্রদর্শনও আগের মতো স্বাভাবিক নয়। যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয়, আয় এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন প্রকাশ্যে বিলাসিতা দেখানো সামাজিকভাবেও অস্বস্তিকর হতে পারে।
তাই পুরোনো ধনী শ্রেণি অদৃশ্য হয়ে গেছে—এমনটি বলা ঠিক হবে না। বরং তারা হয়তো নিজেদের আরও আড়ালে রাখছে।
আর তাদের জায়গায় দৃশ্যমান হচ্ছে নতুন এক শ্রেণি।
নতুন অর্থের উৎস কোথায়?
বিমানবন্দরের সেই অচেনা মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল—মিয়ানমারের নতুন সম্পদের উৎস কোথায়?
আমি অবশ্যই জানি না ওই যাত্রীদের প্রত্যেকের অর্থ কোথা থেকে এসেছে। ব্যবসা শ্রেণিতে ভ্রমণকারী একজন সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী হতে পারেন, পেশাজীবী হতে পারেন কিংবা শুধু আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী একজন যাত্রী হতে পারেন।
তবু অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনকে উপেক্ষা করা যায় না।
একটি অর্থনীতি যখন দ্রুত বদলে যায়, তখন সেই অর্থনীতিতে সফল মানুষের ধরনও বদলায়। যেখানে বিধিনিষেধ নতুন বাধা তৈরি করে, সেখানে সেগুলো অতিক্রম করার দক্ষতা নিজেই অর্থনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। যেখানে ঘাটতি তৈরি হয়, সেখানে সরবরাহের সক্ষমতা নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে।
মিয়ানমারের নতুন ধনী শ্রেণির একটি অংশ হয়তো এমনই উদ্যোক্তা—যারা পুরোনো নিয়মের ওপর নির্ভর না করে নতুন বাস্তবতায় ব্যবসা শিখেছে।
কিন্তু মিয়ানমারের অর্থনীতিতে আরেকটি অনেক অন্ধকার প্রবাহও তৈরি হয়েছে।
অন্ধকার অর্থনীতির বিস্তার
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর বিস্তার এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ অর্থনীতির একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসব প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্রের অনেক কর্মী নিজেরাও পাচারের শিকার হয়ে সেখানে আটকে পড়েছেন এবং বাধ্য হয়ে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন।
অর্থের পরিমাণ এবং এর আন্তর্জাতিক বিস্তার দেখলে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এখানেই আরও কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে। এই বিপুল অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে? কারা এর সুবিধা পাচ্ছে? অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ কীভাবে ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করছে? এবং বৈধ ব্যবসা যখন বিধিনিষেধ ও সংকটে আটকে থাকে, তখন অবৈধ অর্থের প্রবাহ দ্রুত বাড়তে থাকলে একটি সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বদলে যায়?
এর অর্থ এই নয় যে নতুন করে সফল হওয়া প্রত্যেক মানুষকে সন্দেহ করতে হবে। এমন ধারণা অন্যায়ও হবে, দায়িত্বশীলও হবে না।
কিন্তু একটি বড় অপরাধ অর্থনীতি সমাজের আশপাশে কোনো প্রভাব না ফেলে আলাদা অবস্থান করবে—এমনটিও ধরে নেওয়া কঠিন।
একই বিমানবন্দরে ভিন্ন ভিন্ন মিয়ানমার
হয়তো বিমানবন্দরে আমি আসলে একটিমাত্র মিয়ানমার দেখিনি। দেখেছি একই দেশের কয়েকটি ভিন্ন বাস্তবতা।
কেউ নিয়মিত ব্যাংককে যাচ্ছেন, বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেনাকাটা করছেন, ব্যবসা করছেন এবং ব্যবসা শ্রেণিতে ভ্রমণ করছেন। পুরোনো সম্পদের মালিকদের কেউ কেউ জনসমক্ষে নিজেদের উপস্থিতি কমিয়ে দিয়েছেন। নতুন উদ্যোক্তারা ঘাটতি ও পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদার মধ্যে ব্যবসার সুযোগ খুঁজে নিচ্ছেন। আবার এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা কয়েক বছর আগেও প্রায় অস্তিত্বহীন ছিল এমন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করছেন।
এর পাশাপাশি আছে প্রতারণা, মানবপাচার ও অবৈধ অর্থের অন্ধকার জগৎ।
অন্যদিকে, কোটি কোটি সাধারণ মানুষ খাবারের দাম, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, সামরিক নিয়োগ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তরুণদের একটি অংশ দেশ ছাড়ছে, কারণ তারা নিজেদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ দেখতে পাচ্ছে না। পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। পেশাজীবীরা বিদেশে নতুন জীবন গড়ছেন।
তারা হয়তো একই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করছেন। কিন্তু তাদের বাস্তবতা এক নয়।
আমরা কেমন অর্থনীতি তৈরি করছি?
ধনী হওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়। মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সফল ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন হবে। নতুন ব্যবসা তৈরি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, উদ্ভাবন করা এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখা—এসবই একটি সুস্থ অর্থনীতির প্রয়োজনীয় উপাদান।
আসল প্রশ্ন তাই কারও সম্পদের পরিমাণ নয়। প্রশ্ন হলো, সেই সম্পদ কীভাবে তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর অর্থনীতি সাধারণত ধারণা, পরিশ্রম, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে পুরস্কৃত করে। বিপরীতে, দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোতে সংকট থেকে মুনাফা, বিশেষ সুযোগ, নিয়ন্ত্রিত বাজারে প্রবেশাধিকার কিংবা প্রভাবশালী যোগাযোগও সম্পদ সৃষ্টির পথ হয়ে উঠতে পারে। আর যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সম্পদের উৎস ও তার সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই সেই বন্ধুর কথাটি বারবার মনে পড়ে—তিনি এখন শুধু প্রয়োজন হলেই বাইরে যান।
হয়তো আজকের মিয়ানমারকে বোঝার জন্য বিমানবন্দরের নতুন মুখগুলোর পাশাপাশি পুরোনো মুখগুলোর নীরবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ বদলেছে। ভ্রমণের ধরন বদলেছে। ব্যবসার পদ্ধতি বদলেছে। অর্থ উপার্জনের পথও বদলেছে।
একটি বিমানবন্দরের কয়েকটি সারি দেখে হয়তো খুব বড় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু কখনো কখনো একটি সাধারণ দৃশ্যই একটি দেশের গভীর পরিবর্তন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
একসময় বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আশপাশের মানুষদের মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজে পেতাম। এখন সেই মুখগুলো কমে গেছে। তাদের জায়গায় এসেছে নতুন মানুষ।
তাই প্রশ্নটি শুধু কারা মিয়ানমারের নতুন ধনী—তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নতুন অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং সম্পদের এই পরিবর্তিত চেহারা মিয়ানমারের সমাজ ও অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
*স্কারলেট মিয়ানমারের ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে যুক্ত একজন নাগরিক। জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটির ব্যর্থতা নিয়ে হতাশ হয়ে তিনি মিয়ানমার ছেড়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি দেশটির পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে লেখেন।












