আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশের শক্তি এখন আর শুধু তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা কূটনৈতিক প্রভাব দিয়ে পরিমাপ করা হয় না। বিশ্ববাসী সেই দেশকে কীভাবে দেখে, তার বক্তব্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার কর্মকাণ্ড কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে—এসবও রাষ্ট্রীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতায় এই বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গণমাধ্যম নীতির দায়িত্ব নিতে মনোনীত সারাহ বি. রজার্স মার্কিন সিনেটে তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত শুনানিতে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় গণমাধ্যম ও প্রভাব বিস্তারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, পডকাস্ট এবং বিদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো মাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এই পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আসে—বিশ্বে একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতা কি মূলত প্রচারণার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে, নাকি সেই দেশের বাস্তব কর্মকাণ্ডই শেষ পর্যন্ত তার আন্তর্জাতিক পরিচয় নির্ধারণ করে?
বিশ্বজনমতের পালাবদল
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক জনমত জরিপগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক জরিপে ৩৬টি দেশ ও অঞ্চলের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, ২৭টি দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ছিল। এসব দেশের মধ্যে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও রয়েছে।
জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের মধ্যম হার ৫৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে চীনের ক্ষেত্রে তা ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে পিউ রিসার্চ সেন্টার যখন নিয়মিতভাবে দুই দেশের প্রতি বৈশ্বিক মনোভাব পর্যবেক্ষণ করছে, তখন এমন বিপরীতমুখী পরিবর্তন আর দেখা যায়নি।
গ্যালাপের ২০২৫ সালের বিশ্বনেতৃত্ব মূল্যায়নেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতি অনুমোদন ছিল ৩৬ শতাংশ, আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ। প্রায় দুই দশকের জরিপে এই ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বড়।
অবশ্য কোনো জরিপই আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। একটি দেশের প্রতি মানুষের মনোভাব অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির মতো নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবু যখন ভিন্ন উৎসের জরিপে একই ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, তখন বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রচারণা দিয়ে কি আস্থা তৈরি হয়?
ওয়াশিংটন যে আন্তর্জাতিক জনমত নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগে। মার্চে প্রকাশিত একটি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তায় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী বক্তব্যকে জোরালো করার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার নির্দেশনার কথা উঠে আসে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত বিষয়বস্তুকে স্থানীয় বা তৃণমূল পর্যায়ের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপনের মতো কৌশলের কথাও এতে উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের উদ্যোগ দেখায়, আন্তর্জাতিক জনমত এখন কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং তা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তথ্য, যোগাযোগ এবং গল্প বলার ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হয়েছে।
চীনও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং বিশ্বের কাছে নিজের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও যদি একইভাবে নিজের বক্তব্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চায়, সেটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, একটি দেশ কি নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর দুর্বলতাকে ক্রমাগত সামনে আনবে, নাকি নিজের কার্যক্রমের মাধ্যমে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করবে?
কারণ আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু প্রচারণা দিয়ে স্থায়ী করা যায় না।
নিজের কাজই সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা
একটি দেশের বৈশ্বিক পরিচয় গড়ে ওঠে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনগণের জীবনযাত্রা, পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি, অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আচরণ এবং বিভিন্ন সংকটে তার ভূমিকার সমন্বয়ে। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজের সমস্যাগুলো সমাধানের চেয়ে প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টায় বেশি মনোযোগ দেয়, তাহলে তা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না।
অন্যদিকে একটি দেশ যদি নিজের অর্থনীতি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কার্যকর ফলাফল দেখাতে পারে, তাহলে সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে কার্যকর প্রচারণায় পরিণত হয়।
চীনা একটি প্রাচীন প্রবাদ এই ধারণাটিকে সংক্ষেপে তুলে ধরে—পীচ ও বরইগাছ নিজের প্রশংসা করে না, কিন্তু তাদের নিচে মানুষের চলাচলে পথ তৈরি হয়। গাছকে নিজের সৌন্দর্য বা ফলের গুণ সম্পর্কে মানুষকে বোঝাতে হয় না; তার ফলই মানুষকে আকৃষ্ট করে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। একটি দেশ তার সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তার কর্মকাণ্ডের বাস্তব ফলাফল শেষ পর্যন্ত মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রচারণার ব্যবধান যত বেশি হয়, বিশ্বাসযোগ্যতা তত বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতাকে শুধু গণমাধ্যম, প্রচারণা কিংবা তথ্যযুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। প্রকৃত প্রতিযোগিতা আরও গভীরে—কে নিজের বক্তব্যকে বাস্তব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারছে, কে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা তৈরি করতে পারছে এবং কে বিশ্ববাসীর কাছে নিজের সক্ষমতার একটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র উপস্থাপন করতে পারছে।
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক প্রভাব শুধু গল্প বলার দক্ষতায় তৈরি হয় না। একটি দেশের কাজই তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী গল্প।












