জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। সরকারি ২০২৬–২৭ সালের চাহিদা পূর্বাভাস অনুযায়ী ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের সম্ভাব্য ব্যবহার প্রায় ৫৪ লাখ ৭২ হাজার টন। প্রচলিত ঘনত্ব ধরে এই পরিমাণকে লিটারে রূপান্তর করলে, একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার অব্যাহত থাকলে নতুন দামে ভোক্তা ও ব্যবসার বাড়তি ব্যয় বছরে আনুমানিক ১৫–১৬ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। বিপরীতে, দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বার্ষিক ক্ষতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে।
হিসাবটি কীভাবে হলো
জ্বালানি বিভাগের ২০২৬–২৭ সালের পূর্বাভাসে ডিজেলের চাহিদা ৫৪ লাখ ৩৪ হাজার টন, অকটেন ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন, পেট্রোল ৫ লাখ ৮ হাজার টন এবং কেরোসিন ৮১ হাজার টন ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৪ লাখ ৭২ হাজার টন।
টনকে সরাসরি লিটারে রূপান্তর করা যায় না, কারণ চার ধরনের জ্বালানির ঘনত্ব আলাদা। প্রচলিত গড় ঘনত্ব ধরে আনুমানিক হিসাব করলে—
- ডিজেল: প্রায় ৬৫৩ কোটি লিটার
- পেট্রোল: প্রায় ৬৯ কোটি লিটার
- অকটেন: প্রায় ৬১ কোটি লিটার
- কেরোসিন: প্রায় ১০ কোটি লিটার
অর্থাৎ মোট ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ৭৯৩ কোটি লিটার।
প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়তি দাম ধরলে:
৭৯৩ কোটি লিটার × ২০ টাকা = প্রায় ১৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার অব্যাহত থাকলে এক বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ১৫–১৬ হাজার কোটি টাকা।
এটি সরকারের সরাসরি বাড়তি রাজস্ব নয়। এটি হলো ভোক্তা, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য ব্যবহারকারীর সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়। দাম বাড়ার কারণে জ্বালানি ব্যবহার কমে গেলে প্রকৃত অঙ্কও কম হবে।
সরকারের সাশ্রয় ১০ হাজার কোটি
অন্যদিকে, নতুন মূল্য কাঠামোর মাধ্যমে বিপিসির বার্ষিক ক্ষতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ক্ষতি প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সরকারের হিসাবে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমবে। কিন্তু সেই চাপের একটি বড় অংশ অর্থনীতির অন্য প্রান্তে স্থানান্তরিত হবে।
পরিবহন থেকে নিত্যপণ্যে
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা পড়বে পরিবহন খাতে। ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, নৌযান ও কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিমসহ নিত্যপণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলা থেকে শহরে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে।
শিল্প ও কৃষিতেও বাড়বে খরচ
কারখানায় কাঁচামাল আনা, তৈরি পণ্য পরিবহন এবং ডিজেলনির্ভর যন্ত্রপাতি পরিচালনার খরচ বাড়বে। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে থাকা শিল্প খাতের জন্য এটি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
কৃষিতেও সেচ, জমি প্রস্তুত, কৃষিযন্ত্র ও ফসল পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ
জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শুধু পাম্পে দেওয়া অতিরিক্ত টাকা নয়। পরিবহন ও পণ্যের দাম বাড়লে পরিবারের মাসিক বাজেটেও এর প্রভাব পড়বে।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বেশি হতে পারে। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।
দারিদ্র্যের ঝুঁকি
শুধু এই ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগামী এক বছরে কত মানুষ নতুন করে দরিদ্র হবে—এমন নির্দিষ্ট নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস এখনো নেই। তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধির দাবি করা ঠিক হবে না।
তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার সঙ্গে নতুন জ্বালানি ব্যয় যুক্ত হলে নিম্নআয়ের ও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকা পরিবারগুলোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নতুন মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক হিসাব তাই দুই দিকের।
সরকারের লক্ষ্য: বিপিসির বার্ষিক ক্ষতি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো।
অন্যদিকে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার ধরে জনগণ ও ব্যবসার সম্ভাব্য বাড়তি ব্যয়: প্রায় ১৫–১৬ হাজার কোটি টাকা বছরে।
এই বাড়তি অর্থ এক জায়গায় জমা হবে না। এর একটি অংশ যাবে পরিবহনে, একটি অংশ উৎপাদনে, একটি অংশ কৃষিতে এবং শেষ পর্যন্ত বড় একটি অংশ পণ্যের দাম ও পরিবারের ব্যয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপবে।
তাই জ্বালানির লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি শুধু জ্বালানি পাম্পের হিসাব নয়—এটি আগামী এক বছরে বাজার, উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়েরও হিসাব।












