যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা অভিবাসীদের জন্য গ্রিন কার্ডের পথ কখনোই পুরোপুরি সহজ ছিল না। তবে সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন সেই পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এখন শুধু আবেদনকারীর যোগ্যতা, পারিবারিক সম্পর্ক বা অনুমোদিত আবেদনই যথেষ্ট নয়; তিনি ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আসছে।
এখানেই অভিবাসন ব্যবস্থার একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের যোগ্যতা প্রমাণ করা এবং সেখানে গিয়ে নিজের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখার নিশ্চয়তা কি একই পরীক্ষার অংশ হয়ে উঠছে?
আবেদনকারীর পাশাপাশি স্পনসরও এখন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী কোনো ব্যক্তি পরিবারের সদস্যের জন্য অভিবাসন আবেদন করলে সাধারণত একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আবেদন অনুমোদনের পর জাতীয় ভিসা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া, আর্থিক সহায়তার অঙ্গীকার এবং শেষে দূতাবাসে সাক্ষাৎকার—সব মিলিয়ে এটি বহু ধাপের প্রক্রিয়া।
এর মধ্যে আর্থিক সহায়তার অঙ্গীকারপত্র বা অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্ট দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্পনসরের আয় নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলে যৌথ স্পনসর যুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত নতুন নীতিগত নির্দেশনায় আবেদনকারীর সম্ভাব্য আর্থিক পরিস্থিতির পাশাপাশি স্পনসর ভবিষ্যতে যথাযথ সহায়তা দিতে সক্ষম থাকবেন কি না, সেটিও কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের আওতায় এসেছে।
অর্থাৎ, পরিবারের কোনো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার যোগ্য হলেই প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। তাকে গ্রহণকারী পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাও এখন বাস্তব বিবেচনার অংশ।
আইনের পুরোনো ভিত্তি, নতুন প্রয়োগ
অ্যাফিডেভিট অব সাপোর্টের বর্তমান কাঠামোর শিকড় ১৯৯৬ সালের অভিবাসন আইনে। ওই সময় কংগ্রেস অভিবাসীদের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে স্পনসরের ওপর একটি আইনি আর্থিক দায় তৈরি করে।
১৯৯৭ সালের শেষ দিকে বাধ্যতামূলক আই-৮৬৪ ফরম চালু হওয়ার পর থেকে অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়ায় স্পনসরের আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ নথিতে পরিণত হয়।
তবে আইন অপরিবর্তিত থাকলেও তার প্রয়োগের ধরন সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। বর্তমান প্রশাসনের অধীনে আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আগের ভিসা ইতিহাস, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের তথ্য এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত নথির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডও অধিকতর নজরদারির মধ্যে আসছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে অনেক আবেদনকারীর জন্য সাক্ষাৎকার পর্যন্ত পৌঁছানোই আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে।
পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের ওপর প্রভাব
ফিলিপিনো অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ১৯৮৬ সালের অভিবাসন সংস্কার আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন অনথিভুক্ত অবস্থায় থাকা প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ শেষ পর্যন্ত বৈধ মর্যাদা পান বলে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল।
এরপর বৈধ মর্যাদা পাওয়া অনেক ফিলিপিনো যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়ে পরিবারের সদস্যদের জন্য আবেদন করার পথ তৈরি করেন। এভাবেই কয়েক দশক ধরে পারিবারিক অভিবাসনের একটি ধারাবাহিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপাইন থেকে ৫৩ হাজার ২৮৭ জন অভিবাসন ভিসা বা বৈধ মর্যাদা পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পেয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০২৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, জাতীয় ভিসা কেন্দ্রের ডাটাবেসে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ২৯৪ জন অভিবাসন ভিসা আবেদনকারী সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় ছিলেন।
এদের প্রত্যেকের জন্য আর্থিক সহায়তার নথি ছিল প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্রিন কার্ডের পথ এখন শুধু যোগ্যতার প্রশ্ন নয়
পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে প্রধান আবেদনকারীর বয়স, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, সম্পদ, আর্থিক সামর্থ্য ও দক্ষতার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় আসতে পারে। উদ্দেশ্য হলো—যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না, সে বিষয়ে কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করা।
যে পরিবারের স্পনসরের নিজের আয়ই নির্ধারিত সীমা পূরণ করে না এবং যৌথ স্পনসরের প্রয়োজন হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসীদের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। সেখানে নিয়োগকর্তার নির্দিষ্ট চাকরির প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য নির্ধারিত মজুরি প্রদানের সক্ষমতা থাকার কারণে আবেদনকারীর আর্থিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নটি ভিন্নভাবে বিবেচিত হয়।
আইন একই, কিন্তু অভিজ্ঞতা বদলাচ্ছে
পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনের জন্য বিদ্যমান বার্ষিক কোটা—যথাক্রমে ২ লাখ ২৬ হাজার এবং ১ লাখ ৪০ হাজার—বদলায়নি। পরিবর্তনটি মূলত আবেদন যাচাই ও নীতির প্রয়োগে।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা নতুন সংস্করণের আই-৮৬৪ ফরম প্রকাশ করেছে। ১ অক্টোবর থেকে নির্ধারিত নতুন সংস্করণের ফরমই গ্রহণ করা হবে।
এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে আসছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন অননুমোদিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে। প্রশাসনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর ৬ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৬ লাখ ৮০ হাজার অননুমোদিত অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও আনুমানিক ১৯ লাখ থেকে ২২ লাখ মানুষ স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন অথবা দেশত্যাগ কর্মসূচি ব্যবহার করেছেন।
এ বাস্তবতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সামনে প্রশ্নটি এখন শুধু ভিসা পাবেন কি না, তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর নিজেদের আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাও তাদের অভিবাসন যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
অতীতের পারিবারিক অভিবাসন ব্যবস্থা বহু মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান নীতিগত পরিবেশে সেই ধারাবাহিকতার প্রতিটি ধাপেই নতুন করে যোগ্যতা ও আর্থিক সক্ষমতার পরীক্ষা আসছে।
ফলে গ্রিন কার্ডের স্বপ্ন এখন আগের চেয়ে বেশি নির্ভর করছে কাগজপত্র, স্পনসরের আয়, আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং সরকারি কর্মকর্তার মূল্যায়নের ওপর। এই পরিবর্তন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার পথকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।












