নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে রাজধানীতে চালু হওয়া পিংক বাস সেবা এক মাস পেরিয়েও প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে বিশেষায়িত এই পরিবহনসেবা চালু রাখার টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যাত্রীস্বল্পতার পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে—স্বল্পসংখ্যক ট্রিপ ও অনিয়মিত সময়সূচি, সীমিত রুট, পর্যাপ্ত বাস না থাকা, নারী চালকের সংকট ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং প্রচারের সীমাবদ্ধতা ও যাত্রীদের প্রচলিত অভ্যাস।
রাজধানীতে পিংক বাসের যাত্রীচিত্র
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষায়িত পিংক বাসের একটি রাজধানীর জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে বাসটিতে তেমন যাত্রী ছিল না। আবদুল্লাপুর হয়ে মতিঝিলের পথে বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী উঠলেও অধিকাংশ আসন ফাঁকাই ছিল।
৭৫ আসনের ওই বাসটিতে একটি ট্রিপে যাত্রীসংখ্যা ২০ থেকে ৩০ জনের মধ্যে ছিল বলে জানান চালক মোছা. লতা আক্তার। ফার্মগেটে সকাল ৯টার দিকে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করেও মাত্র চারজন যাত্রী ওঠেন।
রাজধানীর অন্য পিংক বাসগুলোর অবস্থাও অনেকটা একই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত সোমবার বিকেলে শাহবাগে থামা একটি পিংক বাসে ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটির জন্য সেখানে অপেক্ষমাণ নারীদের একজন ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজানা হক চৈতি জানান, তিনি কয়েকবার এই বাসে যাতায়াত করেছেন। তাঁর মতে, বাস সাধারণত ফাঁকা থাকলেও সেবার মান অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় ভালো।
স্বল্প ট্রিপ ও সীমিত সময়সূচি
যাত্রীস্বল্পতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দিনে কমসংখ্যক ট্রিপ। প্রতিটি রুটে মাত্র এক বা দুটি ট্রিপ চলায় প্রয়োজনের সময় অনেক যাত্রী বাসটি পাচ্ছেন না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না চেয়ে তাঁরা অন্য গণপরিবহন বেছে নিচ্ছেন।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নওরীন সুলতানা বলেন, পিংক বাসে যাতায়াত স্বস্তিদায়ক হলেও বাসের জন্য অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কখনো বিকেল ৪টায়, কখনো ৫টায় বাস পাওয়ায় প্রয়োজনের সময় তাঁকে অন্য পরিবহনে উঠতে হয়।
রুট ও বাসের সংখ্যা কম
রাজধানীর কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের অনেককেই প্রতিদিন একাধিক এলাকা পেরিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। কিন্তু পিংক বাসের রুট সীমিত হওয়ায় অনেকের প্রয়োজনীয় গন্তব্যের সঙ্গে এর মিল হচ্ছে না। নিরাপদ ও আরামদায়ক হলেও তাই অনেক যাত্রীর জন্য এটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।
বিআরটিসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে রাজধানীতে ১৩টি পিংক বাস চলছে। এগুলো পরিচালনায় রয়েছেন ১৫ জন নারী চালক ও ২৪ জন হেল্পার। আরও ৩২ জন নারী চালক ও হেল্পার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
চালকসংকট ও দক্ষতার ঘাটতি
পিংক বাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নারী চালক ও হেল্পার দিয়ে পরিচালনা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় নারী চালকের সংখ্যা এখনো কম। নতুন চালকদের অনেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বড় বা দ্বিতল বাস চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জনেও সময় লাগছে। ফলে জনবলসংকটের পাশাপাশি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টিও সেবাটির বিস্তারে প্রভাব ফেলছে।
প্রচার ঘাটতি ও যাত্রীদের অভ্যাস
অনেক নারী এখনো পিংক বাসের রুট ও সময়সূচি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না। এর সঙ্গে রয়েছে যাতায়াতের প্রচলিত অভ্যাস। অনেক নারী পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে চলাচল করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস তাঁদের সব ধরনের যাত্রায় ব্যবহারযোগ্য হচ্ছে না।
যাত্রীদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিংক বাস নিয়ে নেতিবাচক প্রচারের কথাও জানিয়েছেন।
লোকসান গুনছে বিআরটিসি
যাত্রী কম থাকায় আর্থিকভাবেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিআরটিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি রুট মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।
গত ১৮ আগস্ট ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারীদের জন্য ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করে বিআরটিসি। ওই দিন মোট ১৪টি পিংক বাস উদ্বোধন করা হয়। ভবিষ্যতে বাস ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থাটির।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে নারীদের জন্য চালু হওয়া বিভিন্ন বাসসেবা যাত্রীস্বল্পতা ও লোকসানের কারণে বন্ধ হয়েছে। তাই নতুন করে সেবা সম্প্রসারণের আগে রুট, সময়সূচি, ট্রিপের সংখ্যা এবং যাত্রীদের প্রকৃত চলাচলের ধরন নিয়ে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর গবেষণা প্রয়োজন।
বিআরটিসির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা জানিয়েছেন, পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি।
পিংক বাস, নারীদের যাতায়াত, বিআরটিসি ও রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ে নতুন উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করছে যাত্রীদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সেবার রুট, সময়সূচি ও সক্ষমতার সমন্বয়ের ওপর।












