যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন রিপাবলিকান দলের দুই সিনেট প্রার্থী। মিশিগানের মাইক রজার্স ও আইওয়ার অ্যাশলি হিনসন সোমবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে গ্যাসোলিন কর স্থগিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
দুই প্রার্থীর এই অবস্থান পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এর আগে দুজনই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন যুদ্ধ প্রায় সাত মাস ধরে চলার পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তারা নিজেদের অবস্থান কিছুটা বদলাচ্ছেন।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রজার্স। অন্যদিকে আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট জশ তুরেকের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছেন হিনসন। উভয় অঙ্গরাজ্যেই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ায় যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
হিনসনের অবস্থান পরিবর্তন
অ্যাশলি হিনসনের অবস্থান পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বর্তমানে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে প্রতিনিধি পরিষদে আনা বিভিন্ন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তিনি ছয়বার ভোট দিয়েছেন। এমনকি গত সপ্তাহেও তিনি এ ধরনের একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
কিন্তু সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় হিনসন বলেন, ইরান যুদ্ধের খরচের বোঝা আইওয়ার মানুষের ওপর চাপানো উচিত নয়।
তিনি বলেন, আইওয়ার মানুষ জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে পড়ছেন। যুদ্ধের কারণে তাদের পেট্রল পাম্প বা দোকানে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হওয়া উচিত নয়। যুদ্ধকে দ্রুত এবং সফলভাবে শেষ করার আহ্বান জানান তিনি।
হিনসন একই সঙ্গে গ্যাসোলিনের ওপর কর স্থগিত, ডিজেল রপ্তানি সাময়িক বন্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রজার্সের নতুন প্রচারণা
মিশিগানের রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও সোমবার প্রকাশিত একটি নির্বাচনী প্রচারণার বিজ্ঞাপনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আগের তুলনায় ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।
একটি মুদি দোকান থেকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় রজার্স বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়া দরকার। যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো সামর্থ্য মিশিগানের সাধারণ পরিবারের নেই বলে দাবি করেন তিনি।
রজার্সও অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পেট্রল কর স্থগিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেন।
মিশিগানে জ্বালানির দাম সাধারণ ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে ডিজেলের দাম বিশেষভাবে স্পর্শকাতর, কারণ কৃষকেরা কৃষিযন্ত্র ও পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হিসাব
রজার্স ও হিনসনের নতুন অবস্থানকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছে ডেমোক্র্যাটরা। তাদের অভিযোগ, জ্বালানি ও ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পরই রিপাবলিকান প্রার্থীরা যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান বদলাতে শুরু করেছেন।
রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল এল-সাইয়েদ বলেন, পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৫ ডলারে পৌঁছানো এবং ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পরই রজার্স নিজের অবস্থান পাল্টাচ্ছেন।
আইওয়ার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ তুরেকও হিনসনের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ যখন ছিল, তখন হিনসন তা করেননি; এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া সহজ।
অন্য রিপাবলিকানরাও দূরত্ব বাড়াচ্ছেন
ইরান যুদ্ধের প্রশ্নে ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা শুধু রজার্স ও হিনসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি আরও কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত সপ্তাহে আইওয়ার প্রতিনিধি জ্যাক নান ও মারিয়েনেট মিলার-মিকস—দুজনই আগে ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে ছিলেন—ইরানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন।
এর আগে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজারও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। তার দাবি ছিল, ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিতে কিছু হিস্পানিক ভোটার নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ
রিপাবলিকান প্রার্থীদের এই পরিবর্তনের পেছনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসস জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে, যা তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান যুদ্ধ পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সীমিত। ফলে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রজার্স ও হিনসনের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন সেই রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য ধরে রেখেও যুদ্ধ ও মূল্যবৃদ্ধির দায় থেকে নিজেদের আলাদা রাখার চেষ্টা এখন কিছু রিপাবলিকান প্রার্থীর নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।












