মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল রপ্তানি সচল রাখতে নতুন এক ধরনের ব্যয়বহুল পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে সমুদ্রে তেল স্থানান্তরের এই পদ্ধতি এখন ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
ওমানের উপকূলের কাছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে এখন সারি সারি তেলবাহী জাহাজ নোঙর করে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অনেক জাহাজকে দড়ি ও পাইপের মাধ্যমে পাশাপাশি যুক্ত করে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে অপরিশোধিত তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। সমুদ্রের ওপর তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ভাসমান সরবরাহসেতু, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এই ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘শিপ-টু-শিপ’ বা এসটিএস স্থানান্তর। পদ্ধতিটিতে একটি জাহাজ উপসাগরীয় টার্মিনাল থেকে তেল নিয়ে ওমান উপসাগরের তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় যায়। সেখানে তেল অপেক্ষাকৃত বড় আরেকটি জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। এরপর বড় জাহাজটি এশিয়ার কোনো শোধনাগারের উদ্দেশে রওনা হয়। অন্যদিকে প্রথম জাহাজটি আবার উপসাগরে ফিরে গিয়ে নতুন করে তেল সংগ্রহ করে।
এতে প্রতিটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে না। ফলে যুদ্ধকবলিত এলাকায় ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে আরও বেশি জাহাজ, সময় ও অর্থ।
হরমুজে ঝুঁকি বাড়লেও তেল প্রবাহ পুরোপুরি থামেনি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে বলে কেপলার তথ্য জানিয়েছে। জুনে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর অল্প সময়ের যে উত্থান দেখা গিয়েছিল, তার পর এটিই সর্বোচ্চ প্রবাহ।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু ইরানের অবরোধ ও সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল হঠাৎ কমে যায়। অনেক জাহাজ মালিক যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে জাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান। যারা ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে রাজি হন, তারা পরিবহনের জন্য নজিরবিহীন বাড়তি ভাড়া দাবি করতে শুরু করেন।
এই পরিস্থিতিতে জাহাজের সংকট মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা এডনক এসটিএস পদ্ধতি কাজে লাগাতে শুরু করে। এপ্রিল থেকে প্রতিষ্ঠানটি কিছু জাহাজকে মূলত ‘শাটল ট্যাংকার’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব জাহাজ উপসাগরীয় টার্মিনাল থেকে তেল নিয়ে ওমান উপসাগরের নিরাপদ এলাকায় যায় এবং সেখানে বড় জাহাজে তেল তুলে দেয়।
এর ফলে সীমিতসংখ্যক ট্যাংকারকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্তত কিছু পরিমাণ তেল রপ্তানি চালু রাখা যাচ্ছে।
এই ব্যবস্থার ফলে সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানি দৈনিক ৩৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির গড় রপ্তানি ছিল দৈনিক প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল।
সৌদি আরামকোও এসটিএস পদ্ধতিতে যাচ্ছে
এডনকের জরুরি ব্যবস্থা এখন আর শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কৌশল নয়। সৌদি আরবসহ অন্যান্য তেল উৎপাদকও একই পদ্ধতি গ্রহণ করছে।
সৌদি আরামকোও হরমুজসংকটের মধ্যে সমুদ্রপথে তেল পাঠাতে এসটিএস ব্যবস্থার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো লোহিত সাগরের বিকল্প রপ্তানিপথও আগের মতো কার্যকর নেই।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যে তেল পাঠানো হচ্ছিল, তার বড় অংশ ব্যাহত হয়।
এই পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাব তেলের দামের ওপরও পড়ে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। পরে সৌদি আরব ক্রেতাদের জানায়, ওমান উপসাগরীয় রুটে এসটিএস স্থানান্তরের মাধ্যমে তারা তেল সরবরাহ চালু রাখবে।
ওমান উপসাগরে বাড়ছে সমুদ্রেই তেল স্থানান্তর
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বরেই ওমান উপসাগরে এসটিএস পদ্ধতিতে প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন তোলা হতে পারে। আগস্টে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
অর্থাৎ মাত্র এক মাসে সমুদ্রেই জাহাজ বদলে তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল যাচ্ছে, তার প্রায় ৪০ শতাংশের সমপরিমাণ তেল এই এসটিএস ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই পদ্ধতির ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। এখন এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে।
তেল সরবরাহ সচল থাকলেও খরচের চাপ ভয়াবহ
এই নতুন পরিবহনব্যবস্থা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়া ঠেকাতে সাহায্য করছে। কিন্তু এর বিনিময়ে দিতে হচ্ছে বিপুল অর্থ।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত অতি-বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের ভাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এটি রেকর্ড সর্বোচ্চ।
বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৫ ডলার ধরা হয়, তাহলে শুধু পরিবহন ব্যয়ই মোট মূল্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি। যুদ্ধের আগে যেখানে এই ব্যয় ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের মতো।
এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রতিটি অতিরিক্ত ধাপে প্রয়োজন হচ্ছে বাড়তি জাহাজ, বাড়তি সময় এবং বাড়তি অর্থ। ফলে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের মোট ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
উৎপাদকদের কেউ কেউ আবার তেলের দাম কমিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট রাখার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির একটি অংশ শেষ পর্যন্ত উৎপাদকদেরই বহন করতে হচ্ছে।
লাভবান হচ্ছে ট্যাংকার মালিকেরা
এসটিএস ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার বৈশ্বিক ট্যাংকারের সরবরাহও কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন রুটে জাহাজ ভাড়াও দ্রুত বেড়েছে।
হাইলো অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী কেশভ লোকিয়া পরিস্থিতিটিকে তেল উৎপাদকদের কাছ থেকে ট্যাংকার মালিকদের দিকে বড় ধরনের সম্পদ স্থানান্তর হিসেবে দেখছেন।
অর্থাৎ সংঘাতের কারণে শুধু তেলের বাজারই বদলাচ্ছে না; তেল পরিবহনের ব্যবসাতেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন তৈরি হয়েছে। জাহাজের চাহিদা যত বাড়ছে, মালিকেরা তত বেশি ভাড়া আদায় করতে পারছেন।
নতুন স্বাভাবিকতা নাকি সাময়িক ব্যবস্থা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই জটিল ও ব্যয়বহুল পরিবহনব্যবস্থা কি শুধু যুদ্ধকালীন সাময়িক সমাধান, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্যের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হয়ে উঠবে?
এখন পর্যন্ত এসটিএস ব্যবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সংকটের মুখেও পুরোপুরি অচল হয়ে যায় না। তেল উৎপাদক, জাহাজ মালিক ও ক্রেতারা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে এর আরেকটি দিকও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্য এখন ক্রমেই এমন এক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যেখানে সামরিক পাহারা, অস্থায়ী তেল স্থানান্তরকেন্দ্র এবং এমন সব বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যেগুলো এত বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের জন্য তৈরি হয়নি।
ফলে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে এবং আরও বেশি তেল পরিবহনপথ যত ঝুঁকির মুখে পড়বে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা তত বেশি ব্যয়বহুল ও ভঙ্গুর হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেলের প্রবাহ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু সেই প্রবাহ সচল রাখতে যে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে, তার মূল্য শেষ পর্যন্ত উৎপাদক, পরিবহনকারী এবং বিশ্বজুড়ে তেল ব্যবহারকারী—সব পক্ষকেই বহন করতে হতে পারে।












