বিশ্ববাজারে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন পুনরায় চালু হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়ই তেলের বাজারে দাম কমার চাপ বাড়িয়েছে।
বুধবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৯ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ১৬ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে ১ দশমিক ৫০ ডলার বা ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ০১ ডলারে।
ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দামই টানা ছয়টি সেশনে কমেছে। বর্তমানে উভয় বাজারই প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে রয়েছে।
সৌদি আরবের পাইপলাইন চালু হওয়ায় স্বস্তি
তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক খবরগুলোর একটি এসেছে সৌদি আরব থেকে। দেশটি মঙ্গলবার তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম আবার শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সৌদি আরব ওই হামলার জন্য ইরাকের একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে দায়ী করেছিল। পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল ইয়ানবু বন্দরের দিকে পাঠাতে পারে। এই পরিমাণ বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
ফলে পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হওয়াকে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব মঙ্গলবার এশিয়ার শোধনাগারগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালির বাইরে থাকা বিভিন্ন স্থান থেকে আরও বেশি পরিমাণ তেল সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে। এতে এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কিছুটা সহজ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরাকও বাড়াচ্ছে তেল রপ্তানি
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক ইরাকও রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইরাকের তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করছে। তুরস্কের মাধ্যমে তেল রপ্তানি আরও বাড়িয়ে প্রতিদিন ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তেল পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা ও কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে ইরাকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ছিল যথাক্রমে প্রতিদিন প্রায় ২৩ লাখ ও ২১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল।

জুলাইয়ের তুলনায় এই পরিমাণ বেশি হলেও যুদ্ধ শুরুর আগের ফেব্রুয়ারির মাত্রার তুলনায় এখনও কম। ফেব্রুয়ারিতে ইরাকের তেল রপ্তানি প্রতিষ্ঠান দুটির হিসাবে প্রতিদিন যথাক্রমে ৩৭ লাখ ও ৩৩ লাখ ৬২ হাজার ব্যারেল ছিল।
অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরেনি। তবে সৌদি আরব ও ইরাকের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ বাজারে সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার আশাও প্রভাব ফেলছে
তেলের দাম কমার আরেকটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার একদিকে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কঠোর হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে তিনি জানিয়েছেন, তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হওয়ার জন্য যথেষ্ট গতি তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগের খবরও তেলের বাজারে আশাবাদ তৈরি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের বক্তব্যে এখনও কঠোর অবস্থান রয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক সমাধান হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
১০০ ডলারের নিচে ব্রেন্ট
সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা এবং যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—দুইয়ের প্রভাবে মঙ্গলবার ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে দিনের লেনদেন শেষ করে।
৮ সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম ব্রেন্ট ১০০ ডলারের নিচে বন্ধ হয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাজার অনেক বেশি আশাবাদী।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা—দুই বিষয়ই তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের মজুত
তেলের দাম কমার পেছনে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মজুতের তথ্যও প্রভাব ফেলেছে।
শিল্প খাতের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৮ লাখ ব্যারেল বেড়েছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা মজুত কমার প্রত্যাশা করেছিলেন।

মজুত বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো বাজারে সরবরাহের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে। ফলে চাহিদা একই পর্যায়ে থাকলে তেলের দামের ওপর আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় দেশটির সাপ্তাহিক তেল মজুতের সরকারি তথ্য প্রকাশ করার কথা রয়েছে। সেই তথ্য বাজারে তেলের পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
তেলের বাজার এখন মূলত দুটি বিপরীতমুখী সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে আছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘ হলে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের পাইপলাইন চালু হওয়া, ইরাকের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা যদি আরও জোরালো হয়, তাহলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম আরও কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তাই আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মজুত—এই চারটি বিষয় তেলের বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












