জাপানের বনাঞ্চলে ভালুকের নখের আঁচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাছ অনেক সময় কাঠশিল্পের জন্য বাণিজ্যিক মূল্য হারায়। কিন্তু জাপানি কারুশিল্পী তাকুয়া সুৎসুমির হাতে সেই ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ কাঠই হয়ে উঠছে শিল্প, আসবাব ও দৈনন্দিন ব্যবহারের মূল্যবান উপকরণ। তৈরি হচ্ছে সার্ফবোর্ড, স্কেটবোর্ড, চেয়ার, ক্লাইম্বিং দেয়ালের গ্রিপ, ট্যাটু স্টুডিওর সাইনবোর্ড—এমনকি বাড়ি সংস্কারের সামগ্রীও।
সুৎসুমির এই উদ্যোগ শুধু কাঠের পুনর্ব্যবহার নয়। এর মাধ্যমে তিনি জাপানে মানুষ ও ভালুকের ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে ভিন্ন ধরনের আলোচনা তৈরি করতে চাইছেন। তার লক্ষ্য হলো, ভালুককে শুধু বিপজ্জনক প্রাণী বা নিধনের লক্ষ্য হিসেবে না দেখে বন, কাঠ, বন্যপ্রাণী এবং মানুষের জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন করে ভাবা।
জাপানে গত কয়েক বছরে ভালুক মানুষের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভালুকের হামলায় দেশটিতে ১৩ জন নিহত এবং ২২০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। জাপান সরকারও ভালুককে জননিরাপত্তা ও শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর পাশাপাশি ভালুকের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে কাঠশিল্পেও। এর একটি কারণ ‘কুমাহাগি’—ভালুকের গাছের ছাল তুলে ফেলার ঘটনা। শীতনিদ্রা থেকে জেগে ওঠার পর ভালুক গাছের ছাল সরিয়ে ভেতরের রস ও পুষ্টি খুঁজে নেয়। গাছটি বেঁচে গেলেও ক্ষতস্থান ঘিরে পরবর্তী সময়ে কাঠের বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে না। ফলে কাঠের শিরা ও গঠন অসম হয়ে যায়। করাতকলে এমন কাঠ থেকে সোজা ও নির্দিষ্ট মানের কাঠ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক বার্নিশ ‘উরুশি’ নিয়ে কাজ করা সুৎসুমি বলেন, ভালুকের আক্রমণে একটি সাধারণ জাপানি সিডার গাছের মূল্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। আবার কাঠ কাটার পর ভেতরের ক্ষতি, বেঁকে যাওয়া বা বিবর্ণতা ধরা পড়লে মূল্য আরও কমে যেতে পারে। কখনও কাঠের জন্য যে অর্থ দেওয়া হয়েছিল, তার অর্ধেক বা তারও কম মূল্য অবশিষ্ট থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমন গাছ শেষ পর্যন্ত কাগজ তৈরির কাঁচামাল বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঠের টুকরোয় পরিণত হয়।
সুৎসুমির কাছে ক্ষতির বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়। তার মতে, ভালুক সাধারণত বড়, স্বাস্থ্যবান ও উন্নতমানের গাছকে আঁচড়ায়। এসব গাছ অনেক সময় ৬০ থেকে ৮০ বছর ধরে যত্ন করে বড় করা হয়। ফলে একটি গাছ নষ্ট হওয়া মানে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়; কখনও কখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের পরিচর্যার ফল হারিয়ে যাওয়া।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপানের কাঠশিল্পের শ্রমিক সংকট। সুৎসুমির মতে, শ্রমিকের ঘাটতিতে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা এই শিল্প ভালুকের কারণে আরও সমস্যায় পড়ছে। এসব পরিস্থিতি ভালুক নিধনের দাবি ও প্রাণীটির বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন।
সুৎসুমি বলেন, জাপানের টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালুক নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই ‘বিপদ’ ও ‘নিধন’-এর বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু তার উদ্যোগের লক্ষ্য হলো প্রশ্নটি অন্যভাবে তোলা—ভালুক মেরে ফেলা উচিত কি না, শুধু সেই প্রশ্ন না করে মানুষ ও ভালুক কীভাবে একই পরিবেশে সহাবস্থান করতে পারে, তা নিয়ে ভাবা।
এই চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে তিনি শুরু করেন ‘বিয়ার্স উড প্রজেক্ট’। প্রকল্পটির মূল ধারণা খুবই সরল—দশকের পর দশক ধরে বেড়ে ওঠা, ভালুকের আঁচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাছকে কাঠের টুকরোয় পরিণত হওয়ার আগে উদ্ধার করা এবং উরুশির সাহায্যে সেগুলোকে নতুন মূল্য দেওয়া।
উরুশি জাপানের প্রাচীন প্রাকৃতিক বার্নিশ। বহু স্তরে এটি কাঠের ওপর প্রয়োগ করলে কাঠে উজ্জ্বল ও মসৃণ আবরণ তৈরি হয়। সুৎসুমি মনে করেন, এই প্রক্রিয়া ভালুকের ক্ষতকে লুকিয়ে ফেলার বদলে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। অসম পৃষ্ঠ, বেঁকে যাওয়া কাঠের শিরা কিংবা বিবর্ণতার মতো বৈশিষ্ট্যই তখন পণ্যের স্বাতন্ত্র্য হয়ে ওঠে।
তার ভাষায়, কাঠ যত বেশি অনিয়মিত হয়, দক্ষ কারিগরের কাজের মাধ্যমে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তত বেশি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বনজ পরিবেশের জীববৈচিত্র্য। পিকিও ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক লিয়াম অ্যাডককের মতে, মৃত ও পচনশীল গাছ বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো পোকামাকড়, ছত্রাক ও বিভিন্ন জীবের আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে। পরে গাছ মাটিতে পড়ে পচে যাওয়ার সময়ও বনভূমির কাঠামো ও মাটির পরিবেশে ভূমিকা রাখে।
ক্ষতিগ্রস্ত পুরোনো গাছের মধ্যে সময়ের সঙ্গে ফাঁপা অংশও তৈরি হতে পারে। এসব গাছের গর্ত অনেক বন্যপ্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় ও বাসা তৈরির জায়গা। জাপানের কিছু বিশেষায়িত প্রজাতি এমন পুরোনো গাছের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল।
এর একটি উদাহরণ হলো বিপন্ন ব্ল্যাকিস্টনের ফিশ আউল। বড়, পরিণত গাছের গর্তে বাসা বাঁধার সঙ্গে এই পাখিটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জাপানে এই প্রজাতির মাত্র প্রায় ১৫০টি পাখি অবশিষ্ট রয়েছে বলে অ্যাডকক জানান।
সুৎসুমির উদ্যোগে ভালুকের আঁচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ এখন তাই শুধু একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ’ কাঁচামাল নয়। সেই কাঠ থেকে তৈরি হচ্ছে সার্ফবোর্ড, স্কেটবোর্ড, বোল্ডারিংয়ের জন্য দেয়ালে ব্যবহৃত গ্রিপ, ট্যাটু স্টুডিওর সাইনবোর্ড, চেয়ার এবং ঘর সংস্কারের বিভিন্ন উপকরণ। ভালুকের ছোঁয়া পাওয়া কাঠ নতুন ব্যবহার পাচ্ছে, একই সঙ্গে তৈরি করছে আলাদা ধরনের আগ্রহও।
কিয়োটোয় তাদের দোকানে এসব পণ্য বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষের জন্য কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা জাপানের এশীয় কালো ভালুক সম্পর্কে জানতে পারেন এবং একটি কাঠের টুকরো থেকেও কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভাবা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রকল্প শুরুর পর এ ধরনের এক ডজনের বেশি কর্মশালা হয়েছে।
সুৎসুমির লক্ষ্য, মানুষ যেন বন ও কাঠকে শুধু পণ্য হিসেবে না দেখে। তার মতে, একটি কাঠের টুকরোর সঙ্গে ভালুক, মানুষ, বন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ক মানুষকে প্রকৃতির প্রতি আরও যত্নশীল করে তুলতে পারে।
তার উদ্যোগে তৈরি পণ্য যারা কিনছেন, তাদের অনেকেই শুধু ভালুকের আঁচড়ে কাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে আকৃষ্ট হচ্ছেন না। বরং তারা প্রকল্পটির ধারণার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছেন—যেখানে বন রক্ষা, মানুষের জীবন ও ভালুকের অস্তিত্বকে একে অপরের বিপরীত না ভেবে একই পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।












