পানি ঘোলা হলে সাধারণত মাছের জন্য একে অপরকে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দলবদ্ধ মাছগুলো ছড়িয়ে পড়বে—এমনটাই স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তত তিন-কাঁটাওয়ালা স্টিকলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উল্টো। পানি কিছুটা ঘোলা হয়ে গেলে তারা একে অপরের আরও কাছে চলে আসে, দলকে আরও শক্তভাবে গুছিয়ে নেয় এবং পরস্পরের গতিবিধিতে দ্রুত সাড়া দেয়। এই পরিবর্তিত আচরণ তাদের খাবার খুঁজে পেতে কিছুটা সহায়তা করে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের আচরণগত প্রতিবেশবিদ্যার অধ্যাপক ক্রিস্টোস ইওয়ানুর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা অগভীর একটি ট্যাংকে ৭২টি মাছ নিয়ে পরীক্ষা চালান। পানির ঘোলাভাব এমন মাত্রায় রাখা হয়েছিল, যা ঝড়ের পর কোনো নদীর পানি বাদামি হয়ে যাওয়ার মতো তীব্র ছিল না।
গবেষণায় দেখা যায়, পানিতে হঠাৎ খাবার দেওয়া হলে স্বচ্ছ পানির তুলনায় ঘোলা পানিতে মাছের তা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগে। এটি প্রত্যাশিতও ছিল। কারণ পানির ঘোলাভাব বাড়লে মাছের দৃষ্টিসীমা কমে যায়। তখন খাবার, দলসঙ্গী কিংবা শিকারি—কোনোটিই আগের মতো দূর থেকে দেখা সম্ভব হয় না।
তবে গবেষকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল, মাছগুলো এই সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের দলবদ্ধ চলাফেরার ধরন বদলে ফেলে।
অধ্যাপক ইওয়ানু বলেন, পানির ঘোলাভাব বাড়লে খাবার খুঁজে পেতে মাছের বেশি সময় লাগে—এটি আগে বিভিন্ন জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। কিন্তু স্টিকলব্যাক মাছ এই সমস্যার মোকাবিলায় তাদের দলবদ্ধ থাকার আচরণ পরিবর্তন করতে পারে, বিষয়টি গবেষকদের বিশেষভাবে আগ্রহী করেছে।
ঘোলা পানির সঙ্গে বদলে যায় মাছের জগৎ

কাদামাটি, পলি কিংবা পানিতে ভাসমান শৈবালসহ অতি সূক্ষ্ম কণা পানিতে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকলে পানি ঘোলা হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্যকে ‘টার্বিডিটি’ বা পানির ঘোলাভাব হিসেবে উল্লেখ করেন।
কৃষিকাজ, পাথর উত্তোলন, নির্মাণকাজসহ নানা কর্মকাণ্ডের কারণে নদী ও অন্যান্য জলাভূমিতে অতিরিক্ত পলি প্রবেশ করায় বিশ্বের বিভিন্ন মিঠাপানি ও উপকূলীয় অঞ্চলে পানির ঘোলাভাব বাড়ছে।
দৃষ্টিনির্ভর মাছের জন্য এটি বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন। পানি ঘোলা হলে একটি মাছ কত দূর থেকে খাবার, নিজের দলের অন্য সদস্য কিংবা সম্ভাব্য শিকারিকে দেখতে পারবে, সেই দূরত্ব কমে যায়।
আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পানির ঘোলাভাব খুব বেশি হলে মাছের দল ভেঙে ছোট ছোট অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম ঘোলাভাবের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেক সময় মাছের দল আগের মতোই একসঙ্গে থাকে, এমনকি স্বচ্ছ পানির তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরাও করে।
তিন-কাঁটাওয়ালা স্টিকলব্যাক মাছের জীবনে এই ধরনের পরিবেশ খুবই পরিচিত। উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন পুকুর ও জলধারায় পাওয়া এই ছোট কাঁটাযুক্ত মাছ কখনো স্বচ্ছ, কখনো সাময়িকভাবে কর্দমাক্ত এবং কখনো স্থায়ীভাবে ঘোলা পানিতে বসবাস করে।
কীভাবে চালানো হলো পরীক্ষা
ব্রিস্টলের স্কুল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসের গবেষকরা দুই, ছয় এবং ১০টি মাছ নিয়ে আলাদা আলাদা দল তৈরি করেন।
পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত সাদা প্লাস্টিকের ট্যাংকটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৩৬ সেন্টিমিটার। এতে মাত্র ৮ সেন্টিমিটার গভীর পানি রাখা হয়। প্রতিটি মাছের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার।
ঘোলা পানির পরিস্থিতি তৈরি করতে গবেষকরা পানিতে ১ দশমিক ২ গ্রাম কাওলিন নামের এক ধরনের সাদা কাদামাটি মেশান। এতে পানির ঘোলাভাব মাঝারি মাত্রায় পৌঁছায়। আগের গবেষণায় যে মাত্রার ঘোলাভাব মাছের দলকে ভেঙে দিতে পারে, নতুন পরীক্ষার ঘোলাভাব ছিল তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
এরপর মাছগুলোর সামনে খাবার দেওয়ার একটি অভিনব ব্যবস্থা করা হয়।
ট্যাংকের এক কোণে ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে লাল টেপে মোড়ানো একটি পাইপেট ঢোকানো হতো। মাছটি যখন ওই লাল অংশটির দুই দেহ-দৈর্ঘ্যের মধ্যে চলে আসত, তখন পাইপেট থেকে একটি ব্লাডওয়ার্ম—মাছের পছন্দের খাবার—ছিটিয়ে দেওয়া হতো।
অর্থাৎ খাবারের উপস্থিতি বোঝার জন্য মাছকে গন্ধ বা পানির ঢেউয়ের ওপর নির্ভর করার সুযোগ ছিল না। প্রথমে তাকে চোখে দেখতে হতো লাল প্রান্তটি।
প্রতিটি মাছের দলকে এভাবে ছয়বার খাবারের মুখোমুখি করা হয়। ট্যাংকের ওপর থেকে প্রতি সেকেন্ডে ২৫টি ছবি ধারণ করতে সক্ষম ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি রেকর্ড করা হয়।
সব মিলিয়ে ১২০টি পরীক্ষায় ৬৯৯টি ব্যবহারযোগ্য পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়।
বড় দল কেন দ্রুত খাবার খুঁজে পেল
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বচ্ছ ও ঘোলা—দুই ধরনের পানিতেই বড় দলের মাছ খাবার দ্রুত খুঁজে পায়। এটি আগের বহু গবেষণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দলে মাছের সংখ্যা বেশি হলে একসঙ্গে বেশি চোখ পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বস্তু শনাক্ত করার সুযোগও বাড়ে।
তবে পানির ঘোলাভাব সেই সুবিধাকে পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। বড় দলগুলোর খাবার খুঁজে পাওয়ার যে সুবিধা ছিল, ঘোলা পানিতে সেটি খুব বেশি কমেও যায়নি, আবার বাড়েওনি।
অর্থাৎ বেশি মাছ একসঙ্গে থাকা ঘোলাভাবের কারণে তৈরি দৃষ্টিগত সমস্যাকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
তারপরও মাছগুলোর দলবদ্ধ আচরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। ঘোলা পানিতে তারা একে অপরের কাছাকাছি সাঁতার কাটে, দলকে আরও ঘন করে এবং সঙ্গীদের গতিবিধিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়।
গবেষণাটি তাই দেখাচ্ছে, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাণীর আচরণও অত্যন্ত দ্রুত বদলাতে পারে। পানি ঘোলা হয়ে গেলে শুধু দৃষ্টিশক্তির ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়াই নয়, একে অপরের কাছাকাছি থাকা এবং দ্রুত পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেও মাছগুলো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এই আচরণ খাবার খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে পানির ঘোলাভাব বাড়তে থাকলে জলজ প্রাণীদের সামাজিক আচরণ, খাদ্য অনুসন্ধান এবং শিকারি শনাক্ত করার ক্ষমতা কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও গবেষণাটি নতুন একটি দিক সামনে আনছে।












