আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব মুদ্রা টাকার ব্যবহার বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনার আওতায় বাংলাদেশের বিদেশি বাণিজ্যিক অংশীদার ব্যাংকগুলো কোনো প্রাথমিক জমা ছাড়াই বাংলাদেশে ‘টাকা ভস্ট্রো হিসাব’ খুলতে ও পরিচালনা করতে পারবে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানির চুক্তি ডলার বা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রায় হলেও চূড়ান্ত লেনদেন টাকায় নিষ্পত্তির সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট শর্তে এসব হিসাবে জমা থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগেও ব্যবহার করা যাবে।
চুক্তি ডলারে, নিষ্পত্তি টাকায়
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ বুধবার এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। সার্কুলারে স্বাক্ষর করেছেন বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু বকর সিদ্দিক।
নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রতিটি লেনদেনের নিষ্পত্তিতে মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানো।
নির্দেশনা অনুযায়ী, আমদানি ও রপ্তানির ঋণপত্র বা এলসি, চুক্তি এবং চালান বা ইনভয়েস আগের মতোই মার্কিন ডলার কিংবা অন্য কোনো অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় করা যাবে। তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সময় সংশ্লিষ্ট অর্থ প্রচলিত বিনিময় হারে টাকায় রূপান্তর করা যাবে।
অর্থাৎ কোনো বাংলাদেশি আমদানিকারক ও বিদেশি রপ্তানিকারকের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি ডলারে হলেও অর্থ পরিশোধের চূড়ান্ত ধাপে তা বাংলাদেশি টাকায় নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। একইভাবে রপ্তানি বাণিজ্য থেকেও টাকায় লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
বিদেশি ব্যাংকের জন্য টাকা ভস্ট্রো হিসাব
‘ভস্ট্রো হিসাব’ হলো কোনো স্থানীয় ব্যাংকের কাছে বিদেশি ব্যাংকের নামে পরিচালিত একটি হিসাব। নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি বাণিজ্যিক অংশীদার ব্যাংকগুলো বাংলাদেশে কোনো প্রাথমিক জমা ছাড়াই টাকা ভস্ট্রো হিসাব খুলতে পারবে।
এই হিসাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ টাকায় জমা রাখা ও নিষ্পত্তি করা যাবে। ফলে বাংলাদেশের ব্যাংক ও বিদেশি অংশীদার ব্যাংকের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য একটি নির্দিষ্ট আর্থিক চ্যানেল তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে বিদেশি অংশীদার ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকিং নথি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিরাপদ, দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছে।
আমদানিকারকদের স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেল বা সংশ্লিষ্ট ভস্ট্রো হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে এসব হিসাবের বিপরীতে ওভারড্রাফট সুবিধাও দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগেও ব্যবহার
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভস্ট্রো হিসাবে জমা থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ শুধু আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তির কাজে আটকে থাকবে না। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাংলাদেশে ওই অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব হিসাবে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই, পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
এর ফলে বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় জমা হওয়া অর্থ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যেই বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ টাকায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির পাশাপাশি স্থানীয় আর্থিক বাজারেও এর সম্ভাব্য প্রভাব তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে ভস্ট্রো হিসাবে থাকা অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা পরিশোধ করা অথবা বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পাঠানোর সুযোগও থাকবে।
ফলে নতুন হিসাব ব্যবস্থাকে শুধু আমদানি-রপ্তানি বিল পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি বিস্তৃত কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
ডলারের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিষ্পত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা তৈরি হওয়ায় বাজারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
টাকায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়লে কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই ব্যবস্থার বাস্তব সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ ও বিদেশি ব্যাংকগুলো কতটা আগ্রহের সঙ্গে টাকায় লেনদেন গ্রহণ করে এবং দুই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় তৈরি হয়, তার ওপর।
বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় থাকবে নজরদারি
টাকার ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিবিধান শিথিল করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। বরং নতুন ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমদানি ও রপ্তানি লেনদেনে যথাক্রমে আইএমপি ও এক্সপি ফরমসংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
গ্রাহকের পরিচয় ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ‘আপনার গ্রাহককে জানুন’ বা কেওয়াইসি নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়লেও অর্থপাচার, অবৈধ অর্থ স্থানান্তর বা সন্দেহজনক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
রূপান্তরযোগ্য নয় এমন মুদ্রার দেশেও কাঠামো
যেসব দেশের স্থানীয় মুদ্রা আন্তর্জাতিকভাবে অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়, তাদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনায় একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে স্থানীয় ব্যাংকগুলো এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য বিদেশে নস্ট্রো হিসাব পরিচালনা করতে পারবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন মুদ্রার দেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টাকার ব্যবহার বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে বাণিজ্যিক চুক্তি ও লেনদেনের কাঠামো আগের মতো বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর থাকলেও চূড়ান্ত অর্থ নিষ্পত্তিতে টাকার ব্যবহার বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি ব্যাংক, স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বিস্তৃত হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।












