ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সাম্প্রতিক রাশিয়া সফরকে শুধু মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে দেখলে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বড় একটি দিক আড়ালে থেকে যায়। গত দুই বছরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রাবোওর পাঁচবার সাক্ষাৎ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন ইন্দোনেশিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যে রাশিয়ার অংশ ১ শতাংশেরও কম। এই বৈপরীত্যই ইঙ্গিত দেয়, জাকার্তার লক্ষ্য সম্ভবত কোনো নতুন সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যাওয়া নয়; বরং বৈদেশিক সম্পর্কের পরিসর আরও বিস্তৃত করা।
ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের ‘মুক্ত ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতি বা ‘বেবাস-অ্যাকটিফ’-এর মূল দর্শন হলো বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো এক পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া। কিন্তু গত এক দশকে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক এতটাই গভীর হয়েছে যে সেই ভারসাম্য অনেকাংশে দুর্বল হয়েছে।
চীন এখন ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটি ইন্দোনেশিয়ার আমদানির প্রধান উৎস, নিকেল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বড় বিনিয়োগকারী এবং জাকার্তা-বান্দুং উচ্চগতির রেল প্রকল্পের নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকল্প তৈরি করা জাকার্তার জন্য কেবল কূটনৈতিক নয়, কৌশলগত বিষয়ও হয়ে উঠেছে।
রাশিয়াকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে যুক্ত করার চেষ্টা
প্রাবোওর ভ্লাদিভস্তক সফর এই বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে অর্থনীতি, খাদ্য, জ্বালানি, শিল্প ও পারমাণবিক প্রযুক্তি—সবকটিকেই সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে জাকার্তা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়া ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে প্রায় ১২ হাজার পণ্যের শুল্ক কাঠামো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যের বাণিজ্য এতে আওতাভুক্ত। চুক্তিটি কার্যকর হলে ইন্দোনেশিয়ার জন্য চীনকেন্দ্রিক বাজারের বাইরে ইউরেশীয় অঞ্চলে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৪৮০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে এই বাণিজ্য দ্বিগুণ করার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। মোট অর্থনীতির তুলনায় অঙ্কটি বড় না হলেও কৌশলগতভাবে এর গুরুত্ব ভিন্ন।
খাদ্য ও শিল্পের নতুন সরবরাহব্যবস্থা
রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র সার ও খাদ্য। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় সার কোম্পানি পুপুক ইন্দোনেশিয়া রুশ অংশীদারদের সঙ্গে ভ্লাদিভস্তকে ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে যৌথ সমীক্ষা শুরু করেছে।
রাশিয়ার বিপুল গ্যাসসম্পদ এবং ভ্লাদিভস্তকের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার কাছে এই প্রকল্পকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। একইভাবে বিশ্বের অন্যতম বড় গম রপ্তানিকারক রাশিয়া ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রেও অস্ট্রেলিয়া ও ইউক্রেনের বাইরে আরেকটি উৎস হতে পারে।
অ্যালুমিনিয়াম শিল্পেও মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতার আলোচনা এগোচ্ছে। রুশ প্রতিষ্ঠান রুসাল ইন্দোনেশিয়ায় বড় পরিসরে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। পশ্চিম কালিমান্তানে বক্সাইট থেকে অ্যালুমিনা তৈরির প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পুরোনো প্রকল্পটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়া বক্সাইট রপ্তানি বন্ধ করার পর দেশে খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানোর যে নীতি নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে এই প্রকল্প সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র পারমাণবিক জ্বালানি
জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পশ্চিম কালিমান্তানে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ২৪ হাজার টন ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটি ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বিবেচনা করছে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে রাশিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুত এগিয়েছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে সমঝোতা হয়। রুশ রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটম বড় আকারের পারমাণবিক চুল্লির পাশাপাশি ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও প্রস্তাব দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিটি পাল-এর সঙ্গে এ নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া রুশ কোম্পানিগুলোকে ১৩৮টি তেল ও গ্যাস ব্লকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। ভ্লাদিভস্তক থেকে সরাসরি ইন্দোনেশিয়ায় সমুদ্রপথ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যাতে চীন ও সিঙ্গাপুরের মধ্যবর্তী পরিবহনকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
সামরিক ক্ষেত্রেও একই নীতি
ইন্দোনেশিয়ার সামরিক কূটনীতিতেও এই বহুমুখীকরণের ছাপ স্পষ্ট। ২০২৪ সালে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুপার গারুডা শিল্ড মহড়ায় অংশ নেয়। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কেরিস উমেরা, চীনের সঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় সামরিক মহড়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে প্রথম নৌ মহড়া ওরুদা অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়লেও এর অর্থ এই নয় যে জাকার্তা ওয়াশিংটন বা বেইজিং থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত বিকল্প বাড়ানোই এখানে প্রধান প্রবণতা।
এই নীতির সঙ্গে ব্রিকসেও ইন্দোনেশিয়ার যোগদানের বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়া পূর্ণ সদস্য হিসেবে ব্রিকসে যোগ দেয়। রাশিয়ার সভাপতিত্বের সময় এই সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছিল। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ডলারের বিকল্প লেনদেন কাঠামো নিয়ে আলোচনার সুযোগ পেয়েছে।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মূল্যও আছে
এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। অতীতে রুশ অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইনের সম্ভাব্য প্রভাব ইন্দোনেশিয়াকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা বাতিল করে ফরাসি রাফাল ও মার্কিন এফ-১৫এক্সের দিকে যাওয়ার ঘটনাটি তার একটি উদাহরণ।
এখন জ্বালানি, অ্যালুমিনিয়াম ও পারমাণবিক প্রকল্পে রুশ অংশীদারিত্ব বাড়লে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পশ্চিমা ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও পরিবহন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে অনাগ্রহী হতে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কূটনৈতিক বার্তায়। পুতিনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও রাশিয়ার সঙ্গে বড় বড় অর্থনৈতিক প্রকল্পের আলোচনা বাইরে থেকে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের ধারণা তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ইন্দোনেশিয়ার মধ্যস্থতাকারী ও তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ানের কিছু দেশের সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে।
বেবাস-অ্যাকটিফের আসল পরীক্ষা
ইন্দোনেশিয়ার সামনে তাই মূল প্রশ্ন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো উচিত কি না—তা নয়। বরং এই সম্পর্ক কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতায় রূপ নেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
যৌথ সমীক্ষা, সমঝোতা ও রাজনৈতিক বৈঠককে বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত করতে না পারলে বহুমুখীকরণের কৌশল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে পরিবেশগত ও নিরাপত্তা মানদণ্ড প্রযোজ্য, রুশ প্রকল্পেও তা সমানভাবে কার্যকর হওয়া জরুরি।
প্রাবোওর রাশিয়া নীতি শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার কৌশল নয়; বরং পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন কমানোর চেষ্টা। চীন ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি অংশীদার, আর রাশিয়া এখন নতুন সরবরাহ ও বিনিয়োগের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে সামনে আসছে।
ইন্দোনেশিয়ার ‘মুক্ত ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতির আধুনিক সংস্করণের সাফল্য নির্ভর করবে এখানেই—বড় শক্তিগুলোর মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণায় নয়, বরং এত বেশি কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে পারায়, যাতে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।












