উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অতিরিক্ত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হলে হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সোমবার বিশ্ব হৃদয় দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেট: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক ওয়েবিনারটির আয়োজন করে গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক সংগঠন প্রজ্ঞা (প্রগ্রেসের জন্য জ্ঞান)। এতে সহায়তা করে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর।
আগামী মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হৃদয় দিবস পালিত হবে। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘হৃদরোগ নীরবে লুকিয়ে থাকতে পারে: একটি স্পন্দনও উপেক্ষা করবেন না।’
তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপ
ওয়েবিনারে বক্তারা জানান, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ হৃদরোগে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। এসব মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকা উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এবং সময়ের সঙ্গে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশেও হৃদরোগে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশ হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ওয়েবিনারে জানানো হয়।
বক্তারা জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক ছিল বলে আলোচনায় উঠে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর একটি বড় অংশ অকাল মৃত্যু। বাংলাদেশ নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস (এনসিডি) স্টেপস জরিপ ২০১৮-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী মানুষের প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।
অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপকে শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তরুণ বয়সেই এর ঝুঁকি তৈরি হলে ভবিষ্যতে হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের আশঙ্কা বাড়তে পারে।

ওষুধে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়া প্রশংসনীয়।
তাঁর মতে, বাড়তি বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধে ব্যয় করা হলে দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধ সহজলভ্য করা গেলে রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং একই সঙ্গে হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও কমানো যেতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের প্রয়োজন
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সামগ্রিক জীবনযাপনের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন বলে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তরুণ বয়সে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের আহ্বান
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের উপসম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো প্রয়োজন।
তাঁর মতে, তরুণদের কাছে তথ্য পৌঁছাতে প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা দরকার। সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যঝুঁকি, প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হলে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে পারে।
অসংক্রামক রোগে বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে হলেও স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তিনি উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে, হৃদরোগ মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা এবং জনসচেতনতা—সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে আরও অংশ নেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন।
প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারটি পরিচালনা করেন সংস্থাটির প্রোগ্রাম কর্মকর্তা সামিহা বিনতে কামাল।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধির পাশাপাশি বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস সোসাইটি ও প্ল্যাটফর্ম ডক্টরস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ওয়েবিনারে অংশ নেন।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে মূলত একটি বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে—হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। আর সেই কাজে তরুণদের উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।












