ক্যানসার যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সুযোগ তত বেশি—এই ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুদিনের। আর সেই লক্ষ্যেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কিছু রক্ত পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যেগুলো শরীরে একাধিক ধরনের ক্যানসারের সম্ভাব্য উপস্থিতি খুঁজে দেখার দাবি করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘গ্যালেরি’ পরীক্ষা। তবে এই পরীক্ষা নিয়ে যতটা আশার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবতা ততটাই জটিল।
সিএনএনের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে নিউরোসার্জন ড. সঞ্জয় গুপ্ত নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই পরীক্ষার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। তিনি নিজেও সম্প্রতি গ্যালেরি পরীক্ষা করিয়েছেন। পরীক্ষার ফলাফল ছিল নেগেটিভ। কিন্তু সেই ফল তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়েছে—রক্ত পরীক্ষায় ক্যানসারের কোনো সংকেত না পাওয়া মানেই শরীরে ক্যানসার নেই, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
গ্যালেরি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্রেইল। এটি ‘মাল্টিক্যানসার আর্লি ডিটেকশন’ বা একাধিক ক্যানসার আগেভাগে শনাক্ত করার পরীক্ষার একটি উদাহরণ। অনেক সময় এ ধরনের পরীক্ষাকে ‘লিকুইড বায়োপসি’ও বলা হয়।
ধারণাটি বেশ সরল। শরীরে কোনো টিউমার তৈরি হলে অনেক ক্ষেত্রে সেটি থেকে ডিএনএর ক্ষুদ্র অংশ রক্তপ্রবাহে চলে আসে। রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে সেই ডিএনএর পরিবর্তিত অংশ শনাক্ত করার চেষ্টা করে এই প্রযুক্তি। পরীক্ষাটির নির্মাতাদের দাবি, একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ৫০টিরও বেশি ধরনের ক্যানসারের সম্ভাব্য সংকেত শনাক্ত করা যেতে পারে।
তবে ক্যানসার শনাক্তের এই নতুন পদ্ধতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং এর মাধ্যমে সত্যিই কত মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব?

বন্ধুর ক্যানসার ধরা পড়ার পর বদলে গেল দৃষ্টিভঙ্গি
সঞ্জয় গুপ্তের এক সহকর্মী ও বন্ধু ক্যাটরিনা ফিরলিকও একজন নিউরোসার্জন। প্রায় একই বয়সী এই চিকিৎসক কোনো উপসর্গ ছাড়াই কৌতূহল থেকে গ্যালেরি পরীক্ষা করিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থই মনে করতেন।
কিন্তু পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে।
পরবর্তী সময়ে করা পিইটি স্ক্যানে তার বুকের ভেতর একটি ছোট টিউমার ধরা পড়ে। পরে জানা যায়, সেটি হজকিন লিম্ফোমা। টিউমারটি এত ছোট অবস্থায় শনাক্ত হয়েছিল যে তার চিকিৎসকও বিষয়টিকে বিরল সৌভাগ্য হিসেবে দেখেছিলেন।
ক্যাটরিনা নিজেই ভাবছিলেন, তিনি যদি পরীক্ষাটি না করাতেন, তাহলে কবে তার ক্যানসার ধরা পড়ত? হয়তো ৫০ বছর বয়সে দীর্ঘস্থায়ী কাশি দেখা দেওয়ার পর, কিংবা ৬০ বছর বয়সে হাঁটার সময় শ্বাসকষ্ট শুরু হলে। কিন্তু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসারটি এমন পর্যায়ে শনাক্ত হয়, যখন এটি তাকে কোনো উপসর্গ দেওয়ার সুযোগই পায়নি।
এই অভিজ্ঞতাই সঞ্জয় গুপ্তকে নিজের পরীক্ষা করানোর বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে বড় অগ্রগতি হলেও সীমাবদ্ধতা আছে
ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করার গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে আনুমানিক ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ক্যানসারজনিত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এই সুবিধার প্রায় পুরোটাই এসেছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা থেকে—স্তন, জরায়ুমুখ, কোলোরেক্টাল, ফুসফুস ও প্রোস্টেট ক্যানসারের স্ক্রিনিং।
অন্যদিকে মস্তিষ্ক, অগ্ন্যাশয়, ডিম্বাশয় এবং অনেক ধরনের রক্তের ক্যানসারসহ অসংখ্য ক্যানসারের জন্য সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যবহারের মতো সুপারিশকৃত স্ক্রিনিং পরীক্ষা নেই। এসব ক্যানসার অনেক সময় তখনই ধরা পড়ে, যখন রোগীর কোনো উপসর্গ দেখা দেয় বা ব্যথা শুরু হয়। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় ক্যানসার অনেকটা এগিয়ে যেতে পারে।
এই জায়গাতেই মাল্টিক্যানসার রক্ত পরীক্ষার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করছে।
কিন্তু একটি পরীক্ষা কেবল ক্যানসারের সংকেত খুঁজে পেলেই কার্যকর হয়ে যায় না। একই সঙ্গে জানতে হয়, পরীক্ষাটি যখন কিছু শনাক্ত করতে পারছে না, তখন সেই নেগেটিভ ফল কতটা নির্ভরযোগ্য।
নেগেটিভ ফলই বড় প্রশ্ন
সঞ্জয় গুপ্ত কথা বলেন অ্যারিজোনার ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ড. ভারশালি শুক্লার সঙ্গে। তিনি এমন অগ্নিনির্বাপকদের নিয়ে কাজ করেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের সংস্পর্শে থাকায় তুলনামূলক বেশি ক্যানসারঝুঁকিতে থাকেন।
গত পাঁচ বছরে তার কর্মসূচিতে প্রায় ১০ হাজার লিকুইড বায়োপসি করা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া ক্যানসারের সংখ্যা ছিল এক ডজনেরও কম।

একবার একই দিনে প্রায় ৫০০ অগ্নিনির্বাপকের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাদের সবার ফল নেগেটিভ আসে। বাইরে থেকে দেখলে এটি দারুণ খবর মনে হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি শুরু হয় এরপর।
নেগেটিভ ফল পাওয়ার পর অনেকেই নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে আর যেতে চাইছিলেন না। তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এমন একটি ধারণা যে রক্ত পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যায়নি, তাই সম্ভবত তারা নিরাপদ।
চিকিৎসকদের প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল তাদের আবার নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ে ফিরিয়ে আনতে। শেষ পর্যন্ত তারা যখন প্রচলিত স্ক্রিনিং করান, তখন ১৫ জনের ক্যানসার শনাক্ত হয়।
এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কোনো রক্ত পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসার অর্থ এই নয় যে শরীরে কোনো ক্যানসার নেই। এর অর্থ হলো—সেদিন নেওয়া ওই নির্দিষ্ট নমুনায় ওই নির্দিষ্ট পরীক্ষাটি ক্যানসারের কোনো সংকেত শনাক্ত করতে পারেনি।
অতএব, গ্যালেরি বা এ ধরনের কোনো পরীক্ষার নেগেটিভ ফলকে কোলনোস্কপি, ম্যামোগ্রাম বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প হিসেবে দেখা বিপজ্জনক হতে পারে।
গ্রেইলও জানিয়েছে, রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য তাদের দেওয়া তথ্যপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে গ্যালেরি নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়; বরং প্রয়োজন হলে প্রচলিত স্ক্রিনিংয়ের পাশাপাশি এটি ব্যবহার করার কথা।
পজিটিভ ফলও সবসময় সহজ সমাধান নয়
অন্যদিকে পরীক্ষার ফল পজিটিভ এলেই যে পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক, সেটিও নয়।
কারণ সব ক্যানসার একই গতিতে বাড়ে না। কিছু টিউমার এত ধীরে বাড়ে যে মানুষের জীবদ্দশায় সেটি কখনো বড় ধরনের সমস্যা তৈরি নাও করতে পারে। এমন কোনো টিউমার আগেভাগে শনাক্ত হলে রোগী ও চিকিৎসককে এরপর একাধিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
শুরু হতে পারে আরও স্ক্যান, বায়োপসি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা। রোগীর মধ্যে তৈরি হতে পারে ভয় ও অনিশ্চয়তা—শরীরে ক্যানসারের সংকেত পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটি আদৌ ভবিষ্যতে ক্ষতিকর হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে কখনো কখনো ‘ক্যাসকেড অব কেয়ার’ বলা হয়। একটি পরীক্ষার ফলের পর আরও পরীক্ষা, আরও চিকিৎসা সিদ্ধান্ত এবং আরও মানসিক চাপের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা
মাল্টিক্যানসার প্রাথমিক শনাক্তকরণ পরীক্ষাগুলোর প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি—এসব পরীক্ষা ব্যবহার করলে কি সত্যিই মানুষের জীবন বেশি বাঁচে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বড় পরিসরে, দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত গবেষণা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এমন বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সম্পন্ন হয়নি, যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারে যে এ ধরনের পরীক্ষা সামগ্রিকভাবে ক্যানসারে মৃত্যুহার কমায়।
কারণ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের কোনো পদ্ধতির প্রকৃত উপকার বুঝতে শুধু রোগ আগে শনাক্ত হয়েছে কি না, তা দেখলেই হয় না। দেখতে হয় আগে শনাক্ত করার ফলে মানুষ সত্যিই বেশি দিন বাঁচল কি না এবং অতিরিক্ত পরীক্ষা বা চিকিৎসার ক্ষতির তুলনায় লাভ কতটা।
তাহলে কারা করবেন এই পরীক্ষা?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, মাল্টিক্যানসার রক্ত পরীক্ষাকে সবার জন্য নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিং হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বিশেষ করে নেগেটিভ ফলের কারণে কেউ যেন প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিনিং বাদ না দেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরাসরি ভোক্তাদের জন্য পাওয়া যায় এমন মাল্টিক্যানসার পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে গ্রেইলের গ্যালেরি, অ্যাবটের ক্যানসারগার্ড এবং ক্যারিস লাইফ সায়েন্সেসের ক্যারিস ডিটেক্ট। এসব পরীক্ষার নির্মাতারা ৫০টিরও বেশি ক্যানসার শনাক্ত করার সক্ষমতার কথা বলে থাকেন।
তবে এগুলো সাধারণত স্বাস্থ্যবিমার আওতায় পড়ে না এবং পরীক্ষাভেদে নিজের পকেট থেকে প্রায় ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের উপদেষ্টারা গ্যালেরি পরীক্ষাকে নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং এর সম্ভাব্য সুবিধা ঝুঁকির তুলনায় বেশি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যদি এফডিএ পরীক্ষাটিকে অনুমোদন দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় এটি আসার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পুরোনো স্ক্রিনিংয়ের মূল্যও কম নয়
সঞ্জয় গুপ্ত শেষ পর্যন্ত নিজের পরীক্ষাটি করিয়েছিলেন। ফলাফল নেগেটিভ আসে। কিন্তু তিনি এটিকে নিজের জন্য ‘সব ঠিক আছে’ ধরনের ছাড়পত্র হিসেবে দেখেননি।
তার নির্ধারিত নিয়মিত ক্যানসার স্ক্রিনিং তিনি চালিয়ে যাবেন। এমনকি নিজের জন্মদিনের কাছাকাছি সময়েই তার কোলনোস্কপি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা তাকে একটি বিষয় নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে—নতুন প্রযুক্তি যতই আকর্ষণীয় হোক, কোনো পরীক্ষার মূল্যায়নে শুধু তার সম্ভাবনা নয়, বাস্তবে সেটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারছে কি না, সেটিও দেখতে হয়।
ক্যানসার শনাক্তের নতুন রক্ত পরীক্ষা ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই একাধিক ক্যানসারের সম্ভাব্য সংকেত খুঁজে পাওয়ার ধারণাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটিকে প্রচলিত স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে নিরাপদ বার্তাটি তাই আপাতত সহজ—নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে হবে, কিন্তু তার নেগেটিভ ফলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা যাবে না। কোলনোস্কপি, ম্যামোগ্রামসহ যেসব স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।












