চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঘরের বাজার ধরে রাখতে নতুন কৌশল নিয়েছে জাপানের সুজুকি মোটর। প্রতিষ্ঠানটি জাপানের বাজারে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম দামের জাপানি বৈদ্যুতিক গাড়ি হিসেবে নতুন ‘ই-স্কাই’ ক্ষুদ্র গাড়ি উন্মোচন করেছে। তবে এই গাড়ির সাফল্যের আড়ালেই জাপানের গাড়ি শিল্পের একটি বড় দুর্বলতা সামনে এসেছে—বৈদ্যুতিক গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ব্যাটারিতে চীনের ওপর নির্ভরতা।
সুজুকি মঙ্গলবার টোকিওতে তাদের প্রথম যাত্রীবাহী ‘কেই’ বৈদ্যুতিক গাড়ি ই-স্কাই উন্মোচন করে। গাড়িটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ লাখ ২০ হাজার ইয়েন, যা প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ ডলারের সমান। জাপানে জুলাই থেকে বিক্রি হওয়া চীনের বিওয়াইডির ‘র্যাকো’ ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় ই-স্কাইয়ের দাম সামান্য কম।
জাপানের গাড়ির বাজারে ‘কেই’ গাড়ির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ছোট আকার, কম খরচ এবং সরু রাস্তায় সহজে চলাচলের সুবিধার কারণে দেশটির নতুন গাড়ি বিক্রির প্রায় ৪০ শতাংশই এই শ্রেণির গাড়ি। কম জ্বালানি খরচও এসব গাড়ির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
ই-স্কাই একবার চার্জে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার চলতে পারে। বিওয়াইডির র্যাকোর পাল্লা ৩২০ কিলোমিটার। তবে শক্তি ব্যবহারের দক্ষতায় এগিয়ে সুজুকির নতুন গাড়ি। প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ১২ কিলোমিটার চলতে পারে এটি, যা ছোট বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা।
সুজুকি প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে ই-অ্যাক্সেল ড্রাইভ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কেই বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য আলাদা নতুন প্ল্যাটফর্মও তৈরি করেছে। কিন্তু গাড়িটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসেছে চীন থেকে। ই-স্কাইয়ের ব্যাটারি তৈরি করছে বিওয়াইডির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
এটাই জাপানের গাড়ি শিল্পের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই ব্যাটারি প্যাকের পেছনে যায়। ফলে গাড়ির দাম কমিয়ে চীনা নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গেলে ব্যাটারির খরচ বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ইতোচু রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সানশিরো ফুকাওয়ের মতে, ব্যাটারি প্রযুক্তিতে চীনা নির্মাতারা জাপানি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, চীনের ব্যাটারি ব্যবহার করেই যদি জাপানি নির্মাতারা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করে, তাহলে ব্যয়ের দিক থেকে বিওয়াইডিকে ছাড়িয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে।
চীনা ব্যাটারি নির্মাতাদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো উৎপাদন খরচ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের হিসাবে, কিছু চীনা ব্যাটারি নির্মাতা বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম খরচে ব্যাটারি তৈরি করতে পারে। বিওয়াইডি বিশেষভাবে এলএফপি বা লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট ব্যাটারির ওপর জোর দিয়েছে। তুলনামূলক কম খরচের কারণে এই প্রযুক্তি বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম কম রাখতে সহায়ক।
জাপানের গাড়ি শিল্পের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কেই গাড়ির ক্ষেত্রে। এসব গাড়ির মূল শক্তিই হলো কম দাম। কয়েক দশক ধরে জাপানি নির্মাতারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সামান্যতম খরচও কমানোর চেষ্টা করে আসছে। সুজুকির প্রয়াত কর্ণধার ওসামু সুজুকি প্রকৌশলীদের প্রতিটি যন্ত্রাংশ থেকে ‘এক গ্রাম ও এক ইয়েন’ কমানোর লক্ষ্য দিয়েছিলেন বলে পরিচিত ছিলেন।
এতদিন সুজুকি এবং টয়োটার মালিকানাধীন দাইহাতসু—জাপানের দুই বড় কেই গাড়ি নির্মাতা—যাত্রীবাহী কেই বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে খুব একটা সক্রিয় হয়নি। তারা মূলত বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক ভ্যানের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

এর পেছনে একটি বাস্তব কারণও রয়েছে। ছোট বৈদ্যুতিক যাত্রীবাহী গাড়ির সীমিত চলাচলক্ষমতা ক্রেতাদের জন্য সমস্যা হতে পারে। অন্যদিকে কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত বাণিজ্যিক ভ্যান সাধারণত নির্দিষ্ট রুট ও দূরত্বে চলে। ফলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারির ক্ষমতা নির্ধারণ করা তুলনামূলক সহজ।
কিন্তু জাপানের বাজারে বিওয়াইডির প্রবেশ সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। জুলাইয়ে র্যাকো নিয়ে বাজারে আসার পর চীনা কোম্পানিটি জাপানের ছোট বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে সরাসরি চাপ তৈরি করেছে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় র্যাকো ভালো সাড়া পেয়েছে এবং এর দামও আক্রমণাত্মকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জাপানের শিল্পসংশ্লিষ্টদের একজন জানিয়েছেন।
বিওয়াইডির পরিকল্পনা শুধু জাপানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি নতুন ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক গাড়িটি ম্যাকাও ও শ্রীলঙ্কাতেও বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। মিজুহো ব্যাংকের গবেষক জিন তাংয়ের মতে, এশিয়ার শহরগুলো ছোট বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে। তুলনামূলক কম দাম ও বেশি সুবিধাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক গাড়ির সমন্বয় শহুরে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারে।
সুজুকিও ভবিষ্যতে ই-স্কাই ইউরোপে রপ্তানির সম্ভাবনা দেখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছর জাপানের কেই গাড়ি ব্যবস্থার আদলে বৈদ্যুতিক গাড়ি জনপ্রিয় করতে নতুন একটি গাড়ি শ্রেণি চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। রেনল্ট ও ফক্সভাগেন ইতোমধ্যে ওই শ্রেণির আওতায় পড়বে এমন মডেল তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সুজুকি এখনই বড় পরিসরে বিদেশে যাওয়ার পথে হাঁটছে না। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট তোশিহিরো সুজুকি জানিয়েছেন, বিদেশি বাজারের সুযোগ ধাপে ধাপে বিবেচনা করা হবে। প্রথমে জাপানের বাজারে গাড়িটি পরীক্ষা করে আরও উন্নত করাই তাদের লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, কেই গাড়ির বাজার জাপানের গাড়ি শিল্পের জন্য শুধু একটি ছোট গাড়ির বাজার নয়, বরং দেশটির দীর্ঘদিনের উৎপাদন দক্ষতার প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানি নির্মাতারা কম দামে উন্নত মানের গাড়ি তৈরি করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছিল। এখন চীনা নির্মাতারা কম দামে উন্নত মানের গাড়ি তৈরি করতে পারায় সেই পুরোনো প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাচ্ছে।
ফলে জাপানি নির্মাতাদের জন্য শুধু দাম কমানোই যথেষ্ট নাও হতে পারে। বরং তাদের নিজেদের ছোট গাড়ির বিশেষত্ব নতুন করে খুঁজে বের করতে হবে এবং কেন ক্রেতারা চীনা গাড়ির বদলে জাপানি গাড়ি বেছে নেবেন, তার নতুন উত্তর দিতে হবে। সুজুকির ই-স্কাই সেই পরিবর্তিত প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।












