মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনের গড় হিসাবে প্রতিদিন ১ কোটি ৪২ লাখ ব্যারেল তেল এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশ। তারপরও ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে। এই বৈপরীত্যই বর্তমান বৈশ্বিক তেলবাজারের নতুন বাস্তবতাকে সামনে আনছে।
সমস্যা এখন শুধু তেলের সরবরাহে নয়; বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই তেল পরিবহনের সক্ষমতা ও ব্যয়।
যুদ্ধ বদলে দিয়েছে তেল পরিবহনের কাঠামো
দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক তেলশিল্প এমন একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি দীর্ঘ দূরত্বে তুলনামূলক কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের সংঘাত সেই ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
জাহাজভাড়া ও বীমা ব্যয় বেড়েছে, বিকল্প পরিবহনপথের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বিশ্ববাজারে তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছে।

হরমুজকে ঘিরে যুদ্ধের শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রপ্তানিপথ ব্যবহার করে। ক্রেতারাও দূরবর্তী অঞ্চল থেকে তেল সংগ্রহ করতে শুরু করে। বিভিন্ন সরকার কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ নেয়।
সৌদি আরব এক পর্যায়ে তার রপ্তানির একটি বড় অংশ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠায়। এ পথে একসময় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পরিবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলায় পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সৌদি আরবকে আবার হরমুজের দিকে রপ্তানি ঘুরিয়ে দিতে হয়।
এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। হামলার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হরমুজ দিয়ে বড় পরিমাণ তেল পরিবহন করা সম্ভব। ফলে এই নৌপথকে কেন্দ্র করে ইরানের যে কৌশলগত প্রভাবের ধারণা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার কিছু সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছে।
সরবরাহ ঘাটতি কমলেও দাম কমছে না
বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি অবশ্য আগের তুলনায় কমেছে। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের হিসাবে, বর্তমানে বাজারে প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল ঘাটতি রয়েছে। মে মাসের সংকটের চূড়ায় এই ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সরবরাহের এমন উন্নতি তেলের দাম কমানোর জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু ব্রেন্ট এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে। যুদ্ধের আগের তুলনায় দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি উঁচু।
যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অবশ্যই দামের ওপর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। কিন্তু ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি পুরো চিত্রের একটি অংশ মাত্র।

তেলের দামে জাহাজভাড়ার বড় প্রভাব
তেল পরিবহন ও বীমার ব্যয় এখন সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মূল্যনির্ধারক হয়ে উঠেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল পরিবহনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে একাধিক জাহাজ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের পর উপসাগরীয় ওমান সাগর এলাকায় কার্গো ছোট জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এরপর তা এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ দীর্ঘ সময় পরিবহন ব্যবস্থায় আটকে থাকছে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ট্যাংকারের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে এশিয়ার ক্রেতারা আটলান্টিক অববাহিকা থেকে তেল কিনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তা এশিয়ায় নিয়ে আসছে। এতে ট্যাংকারের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
জাহাজভাড়ার সাম্প্রতিক হিসাব পরিস্থিতির মাত্রা স্পষ্ট করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে তেল পরিবহনের দৈনিক ভাড়া সম্প্রতি ১২ লাখ ডলারের বেশি হয়েছে। জানুয়ারিতে এই ভাড়া ছিল প্রায় ৩০ হাজার ডলার। ফলে তেলের চূড়ান্ত দামে পরিবহন ব্যয়ের অংশ একসময় যেখানে প্রায় ৩ শতাংশ ছিল, এখন তা প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই ব্যয় দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও কম। বরং হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহ আরও বাড়লে নিরাপদ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল জাহাজ চলাচলব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
পরিশোধনাগারের ঘাটতি বাড়াচ্ছে চাপ
তেল পরিবহনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিশোধন সক্ষমতার সংকট। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার বেশ কিছু পরিশোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক পরিশোধনাগার বিপর্যস্ত হওয়ায় বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহে চাপ বেড়েছে।
এর ফলে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, কারণ আধুনিক শিল্প, কৃষি ও উৎপাদনব্যবস্থার বড় অংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
জি৭-এর কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিশোধন সক্ষমতা ফিরে আসবে না। ফলে বাজারের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না।

বরং আরেকটি চাপ তৈরি হয়েছে। ডিজেল উৎপাদনে তুলনামূলক বেশি কার্যকর মাঝারি মানের সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বেড়েছে। এই ধরনের তেলের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে আসে—অর্থাৎ যেসব অঞ্চলেই সরবরাহ সংকট সবচেয়ে বেশি।
সংকট থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট
এভাবে তেলের বাজারে একটি পারস্পরিক চাপের চক্র তৈরি হয়েছে। পরিশোধন সক্ষমতা কমে ডিজেলের দাম বাড়ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় ডিজেল উৎপাদনে বেশি কার্যকর অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বাড়ছে। আবার ওই তেলের সরবরাহ সীমিত থাকায় অপরিশোধিত তেলের দামও উঁচু থাকছে।
এই বাস্তবতায় তেলের দাম এখন আর শুধু উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাবের ফল নয়। তেল কোথায় উৎপাদিত হচ্ছে, সেটির পাশাপাশি তা কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, কত খরচে জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে, বীমার ব্যয় কত এবং কতটা পরিশোধন সক্ষমতা অবশিষ্ট আছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই হরমুজ দিয়ে তেলের প্রবাহ বাড়লেই বিশ্ববাজারে দ্রুত স্বস্তি ফিরবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরবরাহ সংকট কিছুটা কমলেও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকলে এবং পরিশোধনাগারের সক্ষমতা সংকুচিত থাকলে ভোক্তার জ্বালানি ব্যয় দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে।
বৈশ্বিক তেলবাজারে তাই নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু পৃথিবীতে পর্যাপ্ত তেল আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—সেই তেল নিরাপদে পরিবহন করা যাচ্ছে কি না এবং শেষ পর্যন্ত তাকে প্রয়োজনীয় জ্বালানিতে রূপান্তর করার মতো পরিশোধন সক্ষমতা আছে কি না।












