যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে বিপুল উৎপাদনক্ষমতা দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন এক আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে তিনি অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুত, বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানি, সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের হাতে তৈরি হয়েছিল শক্তিশালী এক ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার। ট্রাম্পের ধারণা ছিল, জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা শুধু দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে না, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বাড়াবে।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সেই ধারণার মৌলিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দিয়েছে। জ্বালানি উৎপাদনে শীর্ষে থাকা আর জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হলেও যুদ্ধ, পরিবহনপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন থেকে একটি দেশ পুরোপুরি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। ট্রাম্পের জ্বালানি আধিপত্যের নীতি তাই এখন সাফল্যের প্রতিশ্রুতির চেয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের উদাহরণ হিসেবেই বেশি দৃশ্যমান।
উৎপাদনক্ষমতা থেকে পররাষ্ট্রনীতির অস্ত্র
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি শক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর অনেক আগেই। শেল গ্যাস ও তেল উত্তোলনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেশটিকে ২০০৯ সালে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক এবং ২০১৮ সালে বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান রপ্তানিকারকেও পরিণত হয়।

বর্তমানে দেশটির দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই অবস্থান ওয়াশিংটনকে শুধু জ্বালানি বাজারে নয়, বাণিজ্য ও কূটনীতিতেও বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রথম দিনেই জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তেল, গ্যাস, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে তুলনামূলকভাবে পেছনে সরিয়ে রাখেন। ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ স্লোগানের মাধ্যমে তাঁর প্রশাসন বেশি উৎপাদনকে মূল্যস্ফীতি কমানো, অর্থনৈতিক উদ্বেগ প্রশমিত করা এবং জাতীয় শক্তি বাড়ানোর সমাধান হিসেবে তুলে ধরে।
এই নীতি দ্রুত অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সীমা ছাড়িয়ে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে জ্বালানি চুক্তি, বাণিজ্য আলোচনায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি এবং আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের সম্পদকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ, সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি শক্তি পররাষ্ট্রনীতির অংশ হয়ে ওঠে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশটির তেল রপ্তানি ও রাজস্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং তেল খাতে আইনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলোর অবস্থান দুর্বল করার ঘটনাও এই কৌশলের অংশ ছিল। ওয়াশিংটনের কাছে তখন মনে হচ্ছিল, বিপুল জ্বালানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা তৈরি করা সম্ভব।
ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় ভেঙে পড়ল হিসাব
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হলে সেই ধারণা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। তাঁর যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন এবং ভেনেজুয়েলার তেলের নাগাল পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও মার্কিন অর্থনীতি বড় ধাক্কা সামলে নিতে পারবে।
কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদক দেশগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, রপ্তানির বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে এবং এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলো জ্বালানি ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেয়।
সংঘাতের প্রথম দুই মাসে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। মার্চে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে ওঠে। ২০০৮ সালের ১৪৫ ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়ে না গেলেও এই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতি ও ভোক্তাদের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে। চীনের আমদানি কমে যাওয়া, পর্যাপ্ত মজুত এবং বাজারের অভিযোজনক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ হওয়া থেকে কিছুটা ঠেকিয়েছে। তবু যুদ্ধের ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্য এখনো বাজারে রয়ে গেছে; মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহের বড় অংশ পুনরুদ্ধার হলেও ব্রেন্টের দাম প্রায় ১১০ ডলারের কাছাকাছি।
সংঘাতের বিস্তার উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও দুর্বল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের একাধিক প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে বাজারের আস্থা কমেছে, প্রচলিত পরিবহনপথে অনিশ্চয়তা বেড়েছে এবং জাহাজ চলাচলের ব্যয় দ্রুত বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও রেহাই পায়নি
এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি উৎপাদনকারীরা বড় মুনাফা করেছে। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে দেশটির আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। নিজস্ব উৎপাদন থাকায় মার্কিন ভোক্তারা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কিছুটা সুরক্ষাও পেয়েছেন।
কিন্তু সেই সুরক্ষা ছিল সীমিত। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ৬০ সেন্ট ছাড়িয়ে যায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বরে ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ৫০ সেন্টে উঠে রেকর্ড গড়ে। আন্তর্জাতিক পরিশোধন সক্ষমতার সংকট এই মূল্যবৃদ্ধিকে আরও তীব্র করে।
জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে, তখন জ্বালানির দাম ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় দায় হয়ে দাঁড়ায়। সরকার জৈব জ্বালানির সঙ্গে মিশ্রণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। সবচেয়ে বিতর্কিত উদ্যোগ ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তি। দেশীয় বাজারে দাম কমাতে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় এসেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, এমন নিষেধাজ্ঞা সাময়িক স্বস্তি দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ায় মাঝারি মেয়াদে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারত।
এই অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক পার্থক্য সামনে আনে: সরবরাহের ওপর কর্তৃত্ব থাকা মানেই দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকা নয়। তেল, গ্যাস ও পরিশোধিত জ্বালানি আন্তর্জাতিক পণ্য। উৎপাদকরা সাধারণত বিশ্ববাজারের চাহিদা ও সরবরাহ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করেন; নিজ দেশের ভোক্তাদের জন্য আলাদা করে কম দাম নিশ্চিত করেন না।
জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন অর্থ
ইরান যুদ্ধ জ্বালানি নিরাপত্তার ধারণাকেও বদলে দিয়েছে। বিশেষত এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো বুঝতে পেরেছে, দূরবর্তী সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ এবং সীমিত বৈশ্বিক পরিশোধন সক্ষমতা বড় দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা, যেখানে সম্ভব দেশীয় জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং পরিবহনে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে এগোতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারের শীর্ষ অবস্থান রাতারাতি শেষ হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে অনেক দেশের কাছে তেল ও গ্যাসের আকর্ষণ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে, শিল্প উৎপাদন থেকে এআইয়ের অবকাঠামো চালানো পর্যন্ত অর্থনীতির নানা ক্ষেত্র এর ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্প সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে এমন এক সুরক্ষা হিসেবে দেখেছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানকে আগের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত জ্বালানি উৎপাদন থাকলেও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে অর্থনীতি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকা যায় না। জ্বালানি আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তি দিয়েছে, কিন্তু সেই শক্তির সীমা ভুলে যাওয়াই ট্রাম্পের কৌশলকে রাজনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
রন বুসোর আরও লেখা
তেলের নতুন সংকট: সরবরাহ নয়, এখন বড় বাধা পরিবহন
জ্বালানির নতুন ভূরাজনীতি: লোহিত সাগরের সংকট কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দেবে?
নতুন তেলের যুগের সূচনা: হরমুজ সংকট কি জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্যে ফাটল ধরাল?
হরমুজ-পরবর্তী বাস্তবতা: উপসাগরীয় জ্বালানি মানচিত্র কি নতুন করে আঁকা হচ্ছে?











