পাকিস্তানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং অপরাধ দমনের নামে এমন এক পুলিশি চর্চায় পরিণত হচ্ছে, যা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা আড়াল করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের আইনি বৈধতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সম্প্রতি ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে দুটি আলোচিত মামলার দুই আসামি পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের ব্যাখ্যা প্রায় একই—আসামিদের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল, আর সেই গুলিতেই প্রাণ গেছে হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের। অথচ পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি, আর কথিত হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
ইসলামাবাদে শিক্ষার্থী লাইবা এজাজের আত্মহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযুক্ত মুহাম্মদ নওমানকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আলামত উদ্ধারে নেওয়ার সময় তাঁর সহযোগীদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়। এর পরদিন মুলতানে এতিম কিশোর ওয়াসিম আব্বাসকে হত্যার মামলার প্রধান সন্দেহভাজন তাওকির নাজির বাহাওয়ালপুরের কাছে কাউন্টার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের (সিসিডি) অভিযানে নিহত হন। চার দিনের পুলিশি রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মুলতানের একটি থানার হেফাজত থেকে পালিয়ে তিনি কীভাবে বাহাওয়ালপুরে পৌঁছালেন, তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে এগুলোকে অপরাধ দমনের অভিযানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু একই ধরনের ব্যাখ্যা যখন বারবার দেওয়া হয়, তখন তা আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। বরং প্রশ্ন ওঠে, পুলিশি অভিযানের বিবরণ কি সত্যিই ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করছে, নাকি একটি নির্দিষ্ট পরিণতিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলছে?
পরিসংখ্যান যে প্রশ্ন এড়াতে দেয় না

পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের (এইচআরসিপি) তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে সিসিডির নেতৃত্বে অন্তত ৬৭০টি কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৯২৪ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। বিপরীতে নিহত হয়েছেন মাত্র দুজন পুলিশ সদস্য। ২০২৪ সালে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ মিলিয়ে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৪১।
এমন ব্যবধান স্বাভাবিকভাবেই তদন্তের দাবি রাখে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসলামাবাদে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমি বিভাগের পরিচালক এহসান ইলাহি হত্যা মামলার দুই সন্দেহভাজনের মৃত্যুর পরও প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। বারবার যদি একই ঘটনা ঘটে—পুলিশকে ঘিরে ফেলা হয়, গুলি চলে, হেফাজতে থাকা আসামি নিজের সহযোগীদের গুলিতে মারা যান এবং পুলিশ অক্ষত থাকে—তাহলে প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়।
এই প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, পাকিস্তানের অপরাধ তদন্তব্যবস্থার দুর্বলতা। ফরেনসিক সক্ষমতা সীমিত, সাক্ষীরা ভয়ভীতি ও চাপের মুখে থাকেন, তদন্তের ঘাটতি পূরণে প্রসিকিউশন যথেষ্ট সম্পদ পায় না এবং বিচারপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলে। ফলে অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ও আদালতে অপরাধ প্রমাণের কঠিন পথ এড়িয়ে বন্দুকযুদ্ধ যেন দ্রুত সমাধানের বিকল্প হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সমর্থন। ২০২৫ সালে পুলিশ অর্ডার ২০০২ সংশোধন করে অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঞ্জাবে সিসিডি গঠন করা হয়। প্রাদেশিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানটিকে নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছে। রানা সানাউল্লাহও নিহত ব্যক্তিদের ঘোষিত অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করে এবং তাঁদের আইনের প্রতি অবাধ্যতার যুক্তিতে এ ধরনের অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়ে অভিযানের ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন পুলিশও বুঝতে পারে, কোন ধরনের সাফল্য তাদের কাছে প্রত্যাশিত।
তৃতীয় কারণ জনরোষের রাজনীতি। লাইবা এজাজের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ইসলামাবাদের পুলিশপ্রধানকে দ্রুত গ্রেপ্তার নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ওয়াসিম আব্বাসকে গাড়িচাপা দেওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জনসাধারণের ক্ষোভ প্রশমনের সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায় অভিযুক্তের মৃত্যু। কিন্তু দ্রুত ফল দেখানোর রাজনৈতিক চাপ কখনোই তদন্ত ও বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
অপরাধীর পরিচয় বদলালে বদলে যায় ন্যায়বিচারের মানদণ্ড
বিচারবহির্ভূত হত্যার আরেকটি গুরুতর দিক হলো, এর প্রয়োগে শ্রেণিগত বৈষম্যের অভিযোগ। যাঁদের অর্থ, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা প্রভাবশালী পারিবারিক পরিচয় নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযানের চূড়ান্ত পরিণতি প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়। বিপরীতে, প্রভাবশালী অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে আইনি সমঝোতা বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় মুক্তির পথ তৈরি হতে দেখা যায়।
করাচির কারসাজ সড়ক দুর্ঘটনা-সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের বাইরে সমঝোতার পর খালাস পেয়েছিলেন। একইভাবে, শাহজেব খান হত্যা মামলায় ২০২৩ সালে শাহরুখ জাটয়ির খালাসের ঘটনাও বিচারব্যবস্থায় প্রভাব ও সমঝোতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ ধরনের দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের মনে বিপজ্জনক ধারণা প্রতিষ্ঠা করে: দরিদ্র ও অসহায় অভিযুক্তের ভাগ্যে জুটতে পারে গুলিতে মৃত্যু, আর প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনি সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তি পেতে পারেন। আইনের সামনে সমতার নীতি এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। অপরাধী চক্রের চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এমন বৈষম্যমূলক আচরণ দীর্ঘ মেয়াদে আরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তিনি অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়ে যান না। অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি হোক, তার সত্যতা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের সুযোগও নষ্ট হয়।
নওমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, লাইবা তাঁকে ২১ লাখ পাকিস্তানি রুপি দিয়েছিলেন। পুলিশের সূত্রের দাবি, লাইবা তাঁর বাবার জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং সৎমায়ের গয়না তাঁকে দিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, নওমান অন্য নারীদেরও প্রতারণার শিকার করে থাকতে পারেন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা, প্রতারণার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না তা বের করা এবং সম্ভাব্য অন্য ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ ও অর্থ ফেরতের ব্যবস্থাও হতে পারত। লাইবার পরিবার একদিকে মেয়েকে হারিয়েছে, অন্যদিকে হারিয়েছে সঞ্চিত সম্পদ। অভিযুক্তের মৃত্যু সেই অর্থ উদ্ধারের আইনি সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করেছে। নওমান দোষী হলেও প্রতারণার অভিযোগের বিচার হওয়ার কথা আদালতে; শাস্তি নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশের নয়।
রাষ্ট্রের শক্তি নয়, আইনের অধীন ক্ষমতাই বৈধতা দেয়
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের রাষ্ট্রতত্ত্বে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো বৈধ বলপ্রয়োগের ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব। কিন্তু সেই কর্তৃত্বের বৈধতা নির্ভর করে আইন, জবাবদিহি ও বিচারিক নিয়ন্ত্রণের ওপর। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি নিজেই নির্ধারণ করতে শুরু করে কে বাঁচবে আর কে মরবে, তাহলে তার বলপ্রয়োগ আর আইনের শাসনের অধীন থাকে না। রাষ্ট্র তখন আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান না হয়ে অস্ত্রের জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া একটি শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিচারবহির্ভূত হত্যার সামাজিক ক্ষতিও সুদূরপ্রসারী। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আইন ক্ষমতাবানদের রক্ষা করে, আর বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ উপায় বলপ্রয়োগ, তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। তরুণদের কাছে সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, অনানুষ্ঠানিক বিচার কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের পরিচালিত সালিশের মতো ব্যবস্থাও তখন নতুন বৈধতা পেতে পারে।
পুলিশের হাতে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা থাকলে তা ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এইচআরসিপি এমন একটি পরিবারের বক্তব্য নথিভুক্ত করেছে, যেখানে স্বজনের মৃত্যুর পর দ্রুত দাফনের জন্য পুলিশের চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারটি মামলা চালিয়ে গেলে অন্য স্বজনদেরও হত্যা করা হতে পারে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ অপরাধের শিকার হলেও থানায় যেতে ভয় পায়, সাক্ষীরা সহযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান এবং অপরাধের তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্ত দুর্বল হলে পুলিশ আবারও দ্রুত সমাধানের নামে প্রাণঘাতী অভিযানের ওপর নির্ভর করতে পারে। এভাবে জবাবদিহির অভাব অপরাধ তদন্তের সক্ষমতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাওকির নাজিরের মৃত্যুর ঘটনাটি এ সংকটের আরেকটি দিক সামনে আনে। তিনি আদালতের নির্দেশে পুলিশি রিমান্ডে ছিলেন। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই তাঁর অবস্থান নির্ধারিত ছিল। সেই হেফাজতে থাকা ব্যক্তির মৃত্যু বিচারিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

অপরাধ কমার দাবি কি বন্দুকযুদ্ধের সাফল্য প্রমাণ করে?
পাঞ্জাব পুলিশ ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় অপরাধ কমার দাবি করেছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডাকাতি ও ছিনতাই ৭১ শতাংশ, ডাকাতির সময় হত্যা ৭৩ শতাংশ এবং সামগ্রিক হত্যাকাণ্ড ২৩ শতাংশ কমেছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের পক্ষে স্বাধীন নিরীক্ষা বা অপরাধের শিকার মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিচালিত কোনো জরিপের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি করা মোটরসাইকেল চুরি ২০২৫ সালেও বেড়েছে; ওই বছর ৭৫ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নিবন্ধিত অপরাধের মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের অনুপাতও বেড়েছে।
তাই কয়েকটি অপরাধের হার কমার দাবি দিয়ে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করা যায় না। একইভাবে, বন্দুকযুদ্ধের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে অপরাধ কমার প্রবণতা একসঙ্গে দেখা গেলেই একটিকে অন্যটির কারণ বলা যায় না। অধিক টহল, দ্রুত পুলিশি সাড়া এবং উন্নত নজরদারিও অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণায় সাধারণভাবে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে অপরাধ করে ধরা পড়ার সম্ভাবনার নিশ্চয়তাকে বেশি কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জবাবদিহি ও তদন্তেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রবণতা থামাতে প্রথমেই প্রয়োজন প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যু ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় বাধ্যতামূলক, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচারিক তদন্ত। ফৌজদারি কার্যবিধির প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে, যাতে পুলিশি বয়ানই ঘটনার একমাত্র স্বীকৃত বিবরণ হয়ে না থাকে।

আসামি স্থানান্তরের প্রতিটি ধাপও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পুলিশি যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকিং, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের বডি ক্যামেরা, যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করা এবং রাতের বেলায় আলামত উদ্ধারের অভিযান সীমিত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পুলিশি হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে কী ঘটেছিল, তা ব্যাখ্যা ও প্রমাণ করার দায়িত্বও পুলিশের ওপর কার্যকরভাবে আরোপ করতে হবে।
তদন্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এইচআরসিপি ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির মাধ্যমে তদন্ত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তত্ত্বাবধান, একটি বেসামরিক নজরদারি কমিশন এবং নিহতদের পরিবারের জন্য বাধ্যতামূলক ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রাদেশিক আইনসভায় নিয়মিত প্রতিবেদন পেশ এবং প্রতি তিন মাসে কথিত বন্দুকযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও জরুরি। অপরাধপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও নিরাপদ নগর নকশা, কমিউনিটি পুলিশিং, তরুণদের কর্মসংস্থান, মাদকাসক্তির চিকিৎসা এবং কারাগার সংস্কারের মতো উদ্যোগ অপরাধের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে লাহোরের বাইরেও আধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন, বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট গঠন, প্রসিকিউশন শক্তিশালী করা এবং সাক্ষী সুরক্ষা কার্যকর করা দরকার।
সাম্প্রতিক দুই মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ হয়তো দুই সন্দেহভাজনকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে অপরাধের পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটনের সুযোগও শেষ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হারিয়েছে আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা, অপরাধের অর্থ উদ্ধার এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথও অনিশ্চিত হয়েছে।
অভিযুক্তকে হত্যা করা আর অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সন্দেহভাজনকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তদন্তের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করে আদালতের রায় কার্যকর করা। এই পার্থক্য মুছে গেলে বন্দুকের মুখে সাময়িক সন্তুষ্টি মিলতে পারে, কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর যে রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতাকে আইনের কাছে জবাবদিহি করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের দাবিও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।












