বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা মোকাবিলায় গত দুই দশকে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এখন উল্টো পথে হাঁটছে। এর পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য উৎপাদনে বিঘ্ন, অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাত। তবে এই সংকটের পেছনে এমন দুটি যুদ্ধের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলোর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর ছড়িয়ে পড়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তাকে নতুন করে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পরিবর্তে যুদ্ধের মাধ্যমে সংকট বাড়ায়, তখন তার পরিণতি শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দরিদ্র দেশগুলোর আমদানি সক্ষমতা কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সংঘাত শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও আঘাত হানে। যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয় তাদের, যাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সামর্থ্যই সবচেয়ে সীমিত।
ক্ষুধা মোকাবিলায় দুই দশকের অগ্রগতি থমকে গেছে

বিশ্ব খাদ্য দিবসের আগে প্রকাশিত নতুন বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক পরিস্থিতির অবনতির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। অপুষ্টি, শিশুদের বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতি হয়ে যাওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত কম ওজন—ক্ষুধার এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অগ্রগতির দীর্ঘ প্রবণতা থেমে গেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২২টি দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি এ সূচক দেখায়, বিশ্ব এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যার সমাধান আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালেই বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। এই হিসাবের মধ্যে ২০২৬ সালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধের পরবর্তী প্রভাব অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে আগামী বছরগুলোতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রকৃত মাত্রা এখনই নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে যুদ্ধের কারণে কৃষি উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
বিশ্বে ক্ষুধা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু এসব চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান বিস্তার। সুইডেনভিত্তিক উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের হিসাবে, ২০২৫ সালে রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল ৬৫—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
যুদ্ধ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় সরাসরি গোলাবর্ষণ ও সহিংসতার মাধ্যমে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারব্যবস্থা এবং ত্রাণ সরবরাহ ভেঙে দিয়েও তা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। সুদান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও গাজায় এই বাস্তবতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্যসংকট মূল্যায়নব্যবস্থা চালুর পর প্রথমবারের মতো একই বছরে দুটি স্থানে—সুদান ও গাজায়—বিপর্যয়কর দুর্ভিক্ষের ঘোষণা দেওয়া হয়।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার মাইল দূরেও ক্ষুধার বিস্তার
সব যুদ্ধের প্রভাব অবশ্য একই ভৌগোলিক সীমায় আটকে থাকে না। কোনো কোনো সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলকে বিপর্যস্ত করে এমন দেশগুলোকেও খাদ্যসংকটে ফেলে, যাদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এর একটি বড় উদাহরণ। যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলে বিশ্বের মোট গম রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ করত। ২০২২ সালে কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর ওপর, যাদের অনেকেই আমদানিনির্ভর খাদ্যব্যবস্থার কারণে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে পারেনি।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধও একই ধরনের ধাক্কা তৈরি করেছে, তবে এর প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সার সরবরাহে বিঘ্ন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সার রপ্তানি হতো। এর মধ্যে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, ফসফেট ও সালফারের মতো কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রয়েছে। যুদ্ধের কারণে এসব পণ্যের পরিবহন একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়; পরে সরবরাহ কিছুটা ফিরলেও তা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইউরিয়ার দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুদ্ধ নতুন করে তীব্র না হলে ২০২৭ সালে দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাজারের এই সম্ভাব্য স্থিতিশীলতা কৃষকদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষত দরিদ্র দেশগুলোর কৃষকেরা বাড়তি দামে সার কেনার সামর্থ্য হারালে তাঁদের উৎপাদন কমাতে হবে। কেউ কেউ জমিতে সার ব্যবহার কমাবেন, কেউ চাষের পরিমাণ হ্রাস করবেন, আবার কেউ পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনই করতে পারবেন না।
এর অর্থ, যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। ধনী দেশগুলোর ভোক্তারা পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির বাড়তি দাম দিয়ে এর তাৎক্ষণিক চাপ অনুভব করতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র দেশের কৃষক ও ভোক্তাদের জন্য সংকট আরও গভীর। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে খাদ্যের সরবরাহ কমতে পারে, দাম বাড়তে পারে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য আরও সংকুচিত হতে পারে।
শিশুদের শরীরে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত
কৃষি ও খাদ্যবাজারের সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যুদ্ধ থেমে গেলেও এর মানবিক প্রভাব দ্রুত শেষ হয় না। কৃষিতে উৎপাদনের নির্দিষ্ট সময়সূচি রয়েছে। যুদ্ধের কারণে কোনো কৃষক যদি বীজ বপন বা ফসল কাটার মৌসুম হারান, তবে পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয় না। সার, বীজ ও অর্থের অভাবে পরবর্তী মৌসুমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও শিশুদের স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহারের সঙ্গে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো যখন খাবারের ব্যয় সামলাতে পারে না, তখন সাধারণত পুষ্টিকর ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল খাবার কেনা কমিয়ে দেয়। এর ফলে শিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়, যার প্রভাব তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় ইন্দোনেশিয়ার দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে করা পর্যবেক্ষণেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই প্রজন্মের মানুষ পরবর্তী সময়ে অন্য বয়সগোষ্ঠীর তুলনায় গড়ে খাটো এবং স্থূলতায় বেশি আক্রান্ত বলে দেখা গেছে। অর্থনৈতিক সংকটের সময় পুষ্টির ঘাটতি কীভাবে বহু বছর পরও মানুষের শরীরে ছাপ রেখে যেতে পারে, এটি তার একটি উদাহরণ।
ইরান যুদ্ধের কারণে কৃষি উপকরণের সংকট ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু শিশুর শারীরিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের বর্তমান দুর্ভোগ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উৎপাদনক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্ষুধা ও সংঘাতের দুষ্টচক্র
আফ্রিকার বহু দেশ এই সংকটের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের ইথিওয়াভিত্তিক গবেষক মোজেস ক্রিসপাস ওকেলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধজনিত খাদ্যসংকট এমন সময়ে আঘাত হানছে, যখন আফ্রিকার অনেক দেশ ঋণের চাপে জর্জরিত, আর্থিক সম্পদে সীমিত এবং শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় ব্যস্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খরা ও কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা। ফলে নতুন করে খাদ্য ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে এসব দেশের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে।
ক্ষুধা ও যুদ্ধের সম্পর্কও একমুখী নয়। যুদ্ধ খাদ্যসংকট তৈরি করে, আবার খাদ্যসংকট নতুন সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সাহেল অঞ্চলে খরা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা পার্মানেন্ট ইন্টার-স্টেট কমিটি ফর ড্রট কন্ট্রোলের আবদুলায়ে মোহামাদু এই সম্পর্ককে একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
যুদ্ধ কৃষিজমিতে মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করে, পশুপালকদের চলাচল বাধাগ্রস্ত করে এবং বাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের অভাব যখন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তখন খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়। এই পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতা ও সংঘাতকে নতুন করে উসকে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষুধা আবার যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায়।
এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু খাদ্য সহায়তা পাঠানো যথেষ্ট নয়। কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংঘাত প্রশমনের উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন যখন সবচেয়ে বেশি, তখন সেই সহযোগিতার অর্থায়নই কমে যাচ্ছে।
মানবিক সহায়তা কমিয়ে সংকট আরও বাড়ানো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতি এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে গেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন খরা ও কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আফ্রিকায় সহিংসতা ও সংঘাত বৃদ্ধির সঙ্গেও সহায়তা কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়নও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত ইয়েমেন, সুদান ও হাইতির কিছু প্রকল্প বন্ধ করার নির্দেশও দিয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের পরিণতি হলো, দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্য পৌঁছানোর সক্ষমতা কমে যাওয়া। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর মূল্য প্রাণহানির মধ্য দিয়ে দিতে হতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক অসংগতি রয়েছে। একদিকে যুদ্ধ ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে খাদ্যসংকট বাড়ছে, অন্যদিকে সেই সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা কমানো হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু একটি চলমান সংকটের প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ হচ্ছে না; সংকটের পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

২০৩০ সালের ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য কতটা বাস্তব?
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং মানবিক সহায়তা হ্রাস—সব মিলিয়ে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তিই দুর্বল হচ্ছে।
এ অবস্থায় ব্যর্থতার দায় কেবল জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার পূর্ণ মূল্যায়ন হবে না। এসব সংস্থার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্ন এবং মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার মতো নীতিগত পদক্ষেপের দায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোকেও নিতে হবে।
বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে যুদ্ধের অর্থ অনেক সময় গোলাবর্ষণের শব্দ নয়, বরং বাজারে চাল, গম বা পুষ্টিকর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়া; কৃষকের কাছে সারের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া; কিংবা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতে না পারা। এই বাস্তবতা যুদ্ধের মানবিক মূল্যায়নকে আরও বিস্তৃত করে।
ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের মতো সংঘাতের পরিণতি তাই শুধু ভূখণ্ড, সামরিক শক্তি কিংবা কূটনৈতিক প্রভাবের হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে সেই কোটি কোটি মানুষের জীবনে, যাঁরা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেননি, অথচ তার কারণে খাদ্য ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের লক্ষ্য অর্জনে যুদ্ধ বন্ধ করা, কৃষি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং মানবিক সহায়তার অর্থায়ন নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধ যদি ক্ষুধা বাড়ায় আর ক্ষুধা যদি নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়, তবে সেই চক্র ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। অন্যথায় ২০৩০ সালের ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের প্রতিশ্রুতি কাগজে থেকে যাবে, আর তার ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় মাশুল দেবে দরিদ্র দেশের শিশুরা।












