বিবর্তন কী? সহজ কথায়, বংশপরম্পরায় জীবের বৈশিষ্ট্যে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন আসে, তাকেই বিবর্তন (Evolution) বলে। এই পরিবর্তন এক প্রজন্মে চোখে পড়ে না। অনেক প্রজন্ম ধরে জমতে জমতে একসময় নতুন প্রজাতির জন্ম হয়।
এক নজরে
- বিবর্তন মানে বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মে ঘটে।
- বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর সব প্রাণ একই পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে।
- বিবর্তনের চারটি প্রধান প্রক্রিয়া হলো মিউটেশন, জিন প্রবাহ, জেনেটিক ড্রিফট ও প্রাকৃতিক নির্বাচন।
- প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণা ১৮৫৮ সালের ১ জুলাই লন্ডনের লিনিয়ান সোসাইটিতে ডারউইন ও ওয়ালেসের লেখা একসঙ্গে পড়ে শোনানো হয়।
- চার্লস ডারউইনের বই “অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস” প্রকাশ পায় ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর।
- প্রমাণ আসে জীবাশ্ম, দেহের গঠনের মিল, ভ্রূণের বিকাশ, প্রাণীর ভৌগোলিক বণ্টন ও ডিএনএ থেকে।
- শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়া বা শীতে গাছের পাতা ঝরা বিবর্তন নয়।
বিবর্তন কী এবং কী নয়
অনেকে ভাবেন, বিবর্তন মানে কোনো একটি প্রাণী নিজের জীবনকালে বদলে যাওয়া। কিন্তু এটি ঠিক নয়। বদলায় পুরো জনগোষ্ঠী, আর সেই বদল ধরা পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
জীববিজ্ঞানে বিবর্তনের সংজ্ঞা হলো “উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পরিবর্তনসহ বংশধারা”। এখানে মূল কথা হলো উত্তরাধিকার। যে পরিবর্তন সন্তানের কাছে পৌঁছায় না, সেটি বিবর্তন নয়।
একটি শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে ওঠে। কিন্তু এটি একই প্রাণীর জীবনচক্র, বংশধারার পরিবর্তন নয়। শীতে গাছ পাতা ঝরায়, আবার নতুন পাতা গজায়। পাহাড় ক্ষয় হয়, আবার উঁচুও হয়। এসব পরিবর্তন, কিন্তু বিবর্তন নয়।
বিবর্তন দুই স্তরে দেখা যায়। ছোট স্তরে এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো বৈশিষ্ট্য কতটা বেশি বা কম, তা প্রজন্মে প্রজন্মে বদলায়। বড় স্তরে একটি পুরোনো প্রজাতি থেকে একাধিক নতুন প্রজাতি তৈরি হয়।
বিবর্তন কীভাবে ঘটে
বিজ্ঞানীরা চারটি প্রধান প্রক্রিয়ার কথা বলেন। চারটিই জীবের জিনের সঙ্গে জড়িত। জিন হলো সেই নির্দেশমালা, যা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের কাছে যায়।
মিউটেশন বা পরিবর্তন। ডিএনএর গঠনে হঠাৎ কোনো বদল ঘটলে তাকে মিউটেশন বলে। এটি ঘটে এলোমেলোভাবে। নতুন বৈশিষ্ট্যের মূল উৎস এই মিউটেশনই।
জিন প্রবাহ। একটি দলের প্রাণী অন্য দলে গিয়ে বংশবিস্তার করলে জিনও সেখানে পৌঁছায়। এতে সেই দলে এমন বৈশিষ্ট্য আসতে পারে, যা আগে ছিল না।
জেনেটিক ড্রিফট। কখনো কখনো নিছক ভাগ্যের জোরে কিছু প্রাণী বেশি সন্তান রেখে যায়। তখন পরের প্রজন্মে তাদের জিনই বেশি দেখা যায়, যদিও সেগুলো যে “ভালো” তা নয়।
প্রাকৃতিক নির্বাচন। এটি সবচেয়ে বিখ্যাত প্রক্রিয়া। নিচে আলাদা করে বিস্তারিত বলা হলো।
প্রাকৃতিক নির্বাচন কীভাবে কাজ করে
প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করতে তিনটি শর্ত লাগে। প্রথমত, একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, কেউ বেশি সন্তান রেখে যাবে, কেউ কম। তৃতীয়ত, সেই বৈশিষ্ট্য সন্তানের কাছে যেতে হবে।
একটি কাল্পনিক উদাহরণ ভাবা যাক। এক জমির পোকাদের মধ্যে কিছু সবুজ, কিছু বাদামি। পাখিরা সহজে দেখতে পায় বাদামি পোকাদের, তাই তারা বেশি ধরা পড়ে। সবুজ পোকারা বেশি বাঁচে এবং বেশি ডিম পাড়ে। কয়েক প্রজন্ম পরে সেই জমিতে সবুজ পোকাই বেশি দেখা যাবে।
এখানে কেউ আগে থেকে ঠিক করে দেয়নি যে সবুজ রং ভালো। যে বৈশিষ্ট্য আগে থেকেই ছিল এবং পরিবেশে কাজে লেগেছে, সেটিই টিকে গেছে। নতুন পরিবেশ এলে আবার অন্য বৈশিষ্ট্য টিকে যেতে পারে।
নতুন প্রজাতি কীভাবে তৈরি হয়
একটি প্রজাতি থেকে নতুন প্রজাতি তৈরির প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় স্পিসিয়েশন বলে। এর একটি পরিচিত পথ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। কোনো নদী, সাগর বা পাহাড় যদি একটি দলকে দুই ভাগ করে দেয়, তাহলে দুই ভাগের মধ্যে আর দেখা-সাক্ষাৎ হয় না।
দুই দল তখন আলাদা পরিবেশে বাস করে। প্রতিটি দলে আলাদা মিউটেশন জমে, আলাদা বৈশিষ্ট্য টিকে যায়। অনেক প্রজন্ম পরে দুই দল এতটা আলাদা হয়ে যেতে পারে যে তারা আর একে অপরের সঙ্গে বংশবিস্তার করতে পারে না। তখন তাদের দুটি আলাদা প্রজাতি বলা হয়।
বিবর্তনের প্রমাণ কী কী
বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন একটি প্রমাণ দেখে নয়, অনেক ধরনের প্রমাণ মিলিয়ে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রধান।
প্রথম প্রমাণ জীবাশ্ম। পাথরে পাওয়া প্রাচীন প্রাণীর দেহাবশেষ দেখায়, অতীতের জীব আজকের জীব থেকে আলাদা ছিল। স্তরে স্তরে সাজানো জীবাশ্ম থেকে বোঝা যায়, জীবজগৎ কীভাবে বদলেছে। মানুষের ক্ষেত্রেও এমন অনেক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। সেই গল্প পড়তে পারেন মানব বিবর্তনের ইতিহাস লেখায়।
দ্বিতীয় প্রমাণ দেহের গঠনের মিল। বিভিন্ন প্রাণীর অঙ্গের মূল কাঠামোয় মিল দেখা যায়, যদিও কাজ আলাদা। তৃতীয় প্রমাণ ভ্রূণের বিকাশ ও অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ, যা সাধারণ পূর্বপুরুষের ইঙ্গিত দেয়।
চতুর্থ প্রমাণ প্রাণীর ভৌগোলিক বণ্টন। কোন প্রাণী পৃথিবীর কোথায় বাস করে, সেই ধরন বিবর্তনের সঙ্গে মেলে। পঞ্চম প্রমাণ আণবিক জীববিজ্ঞান। বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ তুলনা করলে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ধরা পড়ে।
ডারউইন কীভাবে বিবর্তনের ধারণা দিলেন
ইংরেজ প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন ১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর এইচএমএস বিগল জাহাজে চড়ে যাত্রা শুরু করেন। জাহাজটি ফেরে ১৮৩৬ সালের ২ অক্টোবর। এই সমুদ্রযাত্রায় তিনি নানা দেশের প্রাণী, উদ্ভিদ ও শিলা পর্যবেক্ষণ করেন। ১৮৩৫ সালে তিনি গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জেও যান।
দেশে ফিরে বহু বছর ধরে তিনি ভাবনাচিন্তা ও গবেষণা চালান। ১৮৫৮ সালে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের লেখাতেও একই ধারণা পাওয়া যায়। সেই বছরের ১ জুলাই লিনিয়ান সোসাইটিতে দুজনের লেখা একসঙ্গে পড়ে শোনানো হয়। এর পরের বছর, ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর, ডারউইনের বই “অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস” প্রকাশ পায়।
ডারউইনের সময়ে জিন বা ডিএনএর কথা জানা ছিল না। পরে বিজ্ঞানীরা জিনের মাধ্যমে বিবর্তনের কাজ আরও স্পষ্ট করে বুঝেছেন। তাই আজকের জীববিজ্ঞানে বিবর্তনকে মূল ভিত্তি ধরা হয়।
বাংলাদেশে বিবর্তন বোঝা কেন জরুরি
বিবর্তন শুধু বইয়ের বিষয় নয়, আমাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবাণু সময়ের সঙ্গে বদলায়। একসময় যে ওষুধে তারা মরত, পরে সেই ওষুধে আর সাড়া না-ও দিতে পারে। একে বলা হয় ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অপ্রয়োজনে বা ভুল ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া এই সমস্যা বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সিডিসি জানায়, ওষুধের মুখে বেঁচে যাওয়া জীবাণুগুলোই বংশবৃদ্ধি করে এবং তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ছড়িয়ে দেয়।
তাই সর্দি-জ্বরের মতো ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিবর্তনের নিয়ম বুঝলে এই সতর্কতার কারণও সহজে বোঝা যায়।
সাধারণ প্রশ্ন
বিবর্তন কি শুধুই একটি তত্ত্ব?
বিজ্ঞানে তত্ত্ব মানে অনেক প্রমাণে পরীক্ষিত ব্যাখ্যা, অনুমান নয়। বিবর্তন আধুনিক জীববিজ্ঞানের একটি মূল ভিত্তি।
মানুষ কি বানর থেকে এসেছে?
না। বিবর্তন বলে, মানুষ ও আজকের এপদের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল। সেই পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা আলাদা বংশধারা তৈরি হয়েছে।
বিবর্তন কি সবসময় উন্নতির দিকে যায়?
না। প্রকৃতি আগে থেকে কোনো লক্ষ্য ঠিক করে না। যে বৈশিষ্ট্য তখনকার পরিবেশে কাজে লাগে, সেটিই টিকে যায়।
বিবর্তন ঘটতে কত সময় লাগে?
এটি নির্ভর করে প্রাণীর ওপর। নতুন প্রজাতি গড়তে সাধারণত অনেক দীর্ঘ সময় লাগে। তবে ব্যাকটেরিয়ার মতো জীব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে বলে তাদের মধ্যে পরিবর্তন তাড়াতাড়ি চোখে পড়ে।
তাহলে বিবর্তন কী, তা এক লাইনে বলা যায়। জীব বদলায় না ইচ্ছামতো, বদলায় প্রজন্মে প্রজন্মে, জিনের পরিবর্তন আর পরিবেশের বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে। এই ধীর প্রক্রিয়াতেই পৃথিবীর এত বৈচিত্র্যময় প্রাণ গড়ে উঠেছে। আরও জানতে ডারউইনের জীবন ও কাজ নিয়ে লেখাটি পড়তে পারেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬












