ফ্রান্সে অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি বাজেট নিয়ে টানাপোড়েন এবং সামাজিক অস্থিরতা দেশটির রাজনীতিকে নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর মধ্যেই ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন লা পেনের সম্ভাব্য নির্বাচনী জয় নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থনীতি ও রাজনীতির এই সমীকরণ দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু কর বাড়ানো এবং আবাসন সহায়তা ও পারিবারিক ভাতার মতো সামাজিক কর্মসূচির ব্যয় স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকারের লক্ষ্য হলো সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এনে বাজেট ঘাটতি আরও বেড়ে যাওয়া ঠেকানো।
তবে বাজেট পাস করা সহজ হবে না। এ নিয়ে সংসদে দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষি হতে পারে। প্রয়োজনে সরকার বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতাও ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ন্যাশনাল র্যালি। ফ্রান্সের ৫৭৭ আসনের জাতীয় পরিষদে দলটির ১১৮টি আসন রয়েছে, যা অন্য যেকোনো একক দলের চেয়ে বেশি। ফলে বাজেট আটকে দেওয়া বা পাস হতে দেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই দলটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, লা পেন তাঁর দলের আইনপ্রণেতাদের বাজেটের ওপর ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে পারেন। এতে বাজেট পাসের পথ কিছুটা সহজ হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তিনি নিজে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে একটি ভয়াবহ আর্থিক বিশৃঙ্খলার দায়িত্ব নেওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
মঙ্গলবার লা পেন তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বহুল প্রত্যাশিত বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা চলছে, ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় ন্যাশনাল র্যালি অর্থনৈতিক বিষয়ে কতটা বাস্তববাদী হয়েছে।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় লা পেনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। তাঁর নীতিকে অনেকেই বাস্তবসম্মত নয় এবং অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এবার তিনি সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিষয়ে তাঁর অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লা পেন এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে পারেন।
লা পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ অবদান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণেই কেউ কেউ আগামী ফরাসি নির্বাচনকে যুক্তরাজ্যের ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের সঙ্গে তুলনা করছেন।
ইউরোপের রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক মুজতাবা রহমানের মতে, এটি শুধু ফ্রান্সের ঋণ বা বন্ডবাজারের সংকট নয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটও যুক্ত হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক চাপ, বাজারের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি যে প্রেসিডেন্টই নির্বাচিত হন, তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
তবে লা পেনের জয় এখনো নিশ্চিত নয়। আর্থিক দুর্নীতির মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দলের সভাপতি জর্দান বারদেলাকেও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তিনিও তা অস্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে কোনো মধ্যপন্থী প্রার্থীর মুখোমুখি হলে লা পেন পরাজিত হতে পারেন বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। কিন্তু পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিলে চিত্র বদলে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সামাজিক অস্থিরতা যদি আরও বাড়ে, তাহলে ফ্রান্সের রাজনীতিতে ডান ও বাম—দুই দিকের কট্টরপন্থী শক্তিই লাভবান হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় ধাপে লা পেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কোনো কট্টর বামপন্থী প্রার্থী উঠে এলে তাঁর জয় তুলনামূলক সহজ হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনের ফল যাই হোক, এবারের রাজনৈতিক সংকট ফ্রান্সকে আরও মৌলিক একটি প্রশ্নের মুখোমুখি করছে—দেশটি কি আগের মতো বড় পরিসরে তার সামাজিক কল্যাণব্যবস্থা চালিয়ে যেতে পারবে?
ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন সহায়তা, পারিবারিক ভাতা ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সরকারি অর্থের ওপর বাড়তে থাকা চাপ সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
ফরাসি লেখক ও ব্যবসায়ী মিশেল দ্য রোজাঁর ভাষায়, এই সামাজিক কল্যাণব্যবস্থাই দেশটির গভীরতম অসন্তোষের অন্যতম উৎস। তাঁর মতে, ফ্রান্স এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে দেশটি আর আগের মতো নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারছে না।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের সামনে এখন শুধু একটি বাজেট সংকট নয়, বরং অর্থনীতি, সামাজিক কল্যাণব্যবস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে একসঙ্গে মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, ফ্রান্স কোন পথে এগোবে—সেই প্রশ্নেরও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।












