ফ্রান্সে সাম্প্রতিক ছাত্রবিক্ষোভ দেশটির উগ্র বামপন্থী রাজনীতির জন্য একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ফ্রান্স আনবোওয়েড দলের নেতা জ্যঁ-লুক মেলেনশঁ তরুণদের আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক হয়ে উঠেছেন। আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই আন্দোলন তাকে রাজনৈতিকভাবে আরও দৃশ্যমান করে তুললেও বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় তার মূলধারার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে।
ছাত্রদের পাশে মেলেনশঁ
মঙ্গলবার প্যারিসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশাল সমাবেশে অংশ নেন ৭৫ বছর বয়সী মেলেনশঁ। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে করমর্দন করেন, ছবি তোলেন, বিক্ষোভের প্ল্যাকার্ড হাতে নেন এবং তাদের সঙ্গে মিছিলেও অংশ নেন। তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এবং তৃণমূলভিত্তিক প্রতিবাদনির্ভর রাজনীতির কারণে এই আন্দোলন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে বিক্ষোভের কিছু অংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোয় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। মেলেনশঁ সাধারণত কঠোর ভাষায় কথা বললেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সহিংসতা এড়ানোর বিষয়ে সতর্ক হয়েছেন। এক সমাবেশে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কেবল অহিংস পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলেন।
সরকারের অভিযোগ, আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বামপন্থীরা
ফরাসি সরকার অবশ্য মেলেনশঁর ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন অবস্থানে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, ফ্রান্স আনবোওয়েড ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
মেলেনশঁ ও তার দলের নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, পুলিশের কঠোর পদক্ষেপই সংঘর্ষের অন্যতম কারণ। দলের নেত্রী মাথিল্দ পানোর অভিযোগ, সরকার তরুণদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন তারা সামরিক প্রতিপক্ষ।
তবে আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে দলটির অবস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তারা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো সমর্থন করছে এবং রাস্তায় নামার অধিকারকে জোরালোভাবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের সহিংস অংশ থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টাও করছে।
সহিংসতার প্রশ্নে দ্বৈত চাপ
ফ্রান্স আনবোওয়েডের আরেক উদীয়মান নেতা ও প্যারিসের উত্তরের শ্রমজীবী এলাকা সাঁ-দেনির মেয়র বালি বাগায়োকোও আন্দোলনস্থলে সক্রিয় রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, বিরোধ মেটানো এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার পাশাপাশি তিনি বিক্ষোভস্থলে ছোটখাটো আগুন নেভানোর ঘটনাতেও যুক্ত হয়েছেন।
তবে সহিংসতা নিয়ে তার একটি মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি বলেছিলেন, কোনো কোনো পরিস্থিতিতে সহিংসতা বৈধ হতে পারে। পরে অবশ্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সহিংসতা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়ার কথা জানান।
নির্বাচনের হিসাবেও মেলেনশঁর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ
ছাত্রবিক্ষোভের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে মেলেনশঁকে মধ্য-ডানপন্থী নেতা এদুয়ার ফিলিপের ঠিক পেছনে অবস্থান করতে দেখা যাচ্ছে। তবে ডানপন্থী মেরিন ল্য পেন এখনো দুজনের চেয়ে দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে।
ফলে প্রথম দফায় শক্ত অবস্থান তৈরি করে দ্বিতীয় দফায় যাওয়ার সম্ভাবনা মেলেনশঁর আগের তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশি বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনী সম্ভাবনার পাশাপাশি তার দলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গভীর। অর্থনৈতিক নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মধ্যপন্থীদের আপত্তি রয়েছে। মেলেনশঁসহ দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহিংসতার প্রশ্ন।
প্যারিসের জঁ জোরেস ফাউন্ডেশনের জনমত পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিচালক অঁতোয়ান ব্রিস্তিয়েলের মতে, প্রায় ৭০ শতাংশ ফরাসি নাগরিক মনে করেন ফ্রান্স আনবোওয়েড সহিংসতা উসকে দেয়। এই প্রবণতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলটির জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
মেলেনশঁ তাই এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে ছাত্রবিক্ষোভ তাকে তরুণ ভোটারদের কাছে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে, আবার আন্দোলনে সহিংসতার উপস্থিতি তার মূলধারার গ্রহণযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।












